ভেঙে ফেলা হবে শাহবাগ ও প্রেস ক্লাব ফুটওভার ব্রিজ

মেট্রোরেল নির্মাণ কাজের জন্য রাজধানীর শাহবাগ ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনের রাস্তার ফুটওভার ব্রিজ ভেঙে ফেলা হবে। আগামী মঙ্গলবারের (২০ নভেম্বর) মধ্যে এগুলো ভেঙে ফেলা হবে বলে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) সূত্রে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ফুটওভার ব্রিজ ভেঙে ফেলার বিষয়ে ডিএমটিসিএলের পক্ষ থেকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। সেই সঙ্গে ফুটওভার ব্রিজের ওপর থাকা সব কেবল সংযোগ সরিয়ে নেয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

বাংলায় লেখা বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে, মেট্রোরেল নির্মাণকাজ দ্রুততার সঙ্গে এগিয়ে চলছে। এই কাজের স্বার্থে ২০ নভেম্বরের মধ্যে শাহবাগ ফুটওভার ব্রিজ ও প্রেস ক্লাব ফুটওভার ব্রিজ ভেঙে ফেলা হবে। এমতাবস্থায় এই ব্রিজের ওপর বিদ্যমান সব কেবল সংযোগ অতিসত্বর সরিয়ে ফেলতে নির্দেশ দেয়া হলো। এ ব্যাপারে আপনাদের সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রশংসনীয়।

এদিকে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট বা মেট্রোরেল প্রকল্পের দৈর্ঘ্য হবে উত্তরার দিয়াবাড়ি থেকে মতিঝিল পর্যন্ত, ২০ দশমিক ১ কিলোমিটার।

এ প্রকল্পে ২৪ সেট ট্রেন চলাচল করবে। প্রত্যেকটি ট্রেনে থাকবে ৬টি করে কার। এ ট্রেন ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার বেগে যাত্রী নিয়ে ছুটবে। উভয় দিক থেকে ঘণ্টায় ৬০ হাজার যাত্রী পরিবহন বহনে সক্ষমতা থাকবে মেট্রোরেলের।

প্রায় ২০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে সময় লাগবে ৪০ মিনিট। ২০১৯ সালের মধ্যে এ প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। প্রকল্প চালু হলে প্রতি ৪ মিনিট পরপর ১ হাজার ৮০০ যাত্রী নিয়ে চলবে মেট্রোরেল।

এ বিষয়ে সম্প্রতি সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, গুলশানের হলি আর্টিসানে সন্ত্রাসী হামলায় মেট্রোরেলের সাত জাপানি পরামর্শক নিহত হয়েছিলেন।

মর্মান্তিক ওই ঘটনায় প্রকল্পের কাজ ছয় মাস পিছিয়ে যায়। দ্রুত কাজ করে ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া সম্ভব হয়েছে। ২০১৯ সালের মধ্যে দিয়াবাড়ি থেকে আগারগাঁও এবং ২০২০ সালের মধ্যে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেলের কাজ শেষ হবে। জাপান মানসম্পন্ন কাজ করছে।

তাই নির্ধারিত সময়ের আগেই কাজ শেষ হবে। প্রকল্পের উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত ১১ দশমিক ৭ কিলোমিটারে ৯টি স্টেশন থাকবে।

metro-rail

এ প্রকল্প ছাড়া আরও দু’টি মেট্রোরেল বাস্তবায়নের স্বপ্ন দেখাচ্ছে সরকার। একটি হবে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার পাশ দিয়ে বাড্ডা-রামপুরা হয়ে কমলাপুর পর্যন্ত।

এ লাইনের একটি অংশ বসুন্ধরার পাশ দিয়ে পূর্বাচল টার্মিনাল পর্যন্ত চলে যাবে, যা পুরোটাই হবে এলিভেটেড। কমলাপুর পর্যন্ত যে লাইন যাবে তার ১৬ কিলোমিটার হবে পাতাল রেল ফরম্যাটে। অর্থাৎ রেল চলবে মাটির নিচ দিয়ে।

অন্য মেট্রোরেল প্রকল্পটি হবে সাভারের হেমায়েতপুর থেকে গুলশান-নতুনবাজার-ভাটারা পর্যন্ত। এটির দৈর্ঘ্য হবে ১৯ কিলোমিটার। এ লাইনটির একাংশ হবে মাটির নিচ দিয়ে। কিছু অংশ হবে ওপর দিয়ে।

যা আছে মেট্রোরেল প্রকল্পে-

এমআরটি-৬ প্রকল্প : ২০ কিলোমিটার দূরত্বের প্রথম মেট্রোরেলটি ঢাকার উত্তরা-মিরপুর-আগারগাঁও-বিজয় সরণি-কারওয়ান বাজার-শাহবাগ-ঢাকা ইউনিভার্সিটি হয়ে মতিঝিলে গিয়ে শেষ হবে। এ মেট্রোরেল পথের নাম দেয়া হয়েছে ‘ঢাকা মাস র্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি-৬)’। এ রেলপথে ১৬টি স্টেশন রয়েছে : উত্তরা নর্থ-উত্তরা সেন্টার-উত্তরা দক্ষিণ-পল্লবী-মিরপুর-১১ (আইএসটি)-মিরপুর ১০-কাজীপাড়া (রোকেয়া সরণি)-শেওড়াপাড়া (তালতলা)-আগারগাঁও-বিজয় সরণি (খামারবাড়ী)-ফার্মগেট-কারওয়ান বাজার (হোটেল সোনারগাঁও)-শাহবাগ (জাতীয় জাদুঘর)-ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (দোয়েল চত্বর)-সচিবালয় (তোপখানা রোড) এবং মতিঝিল (জাতীয় স্টেডিয়াম ও বাংলাদেশ ব্যাংক)।

এ রেলপথের প্রথম ধাপে ছয়টি করে যাওয়া ও আসা মিলে ১২টি এবং পরবর্তী ধাপে আরও ছয়টি করে ১২টি হিসাবে যাওয়া ও আসার জন্য মোট ২৪টি ট্রেন থাকবে। ১৬টি স্টেশনের প্রথম নয়টি স্টেশন : উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত প্রকল্পটি ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য দেশীয় ঢাকা মাস ট্রান্সপোর্ট কোম্পানি লিমিটেড এবং বিদেশি কোম্পানি ইতালিয়ান-থাই ডেভেলপমেন্ট এবং সিনো হাইড্রো করপোরেশন লিমিটেডের যৌথ সহযোগিতায় কাজ হাতে নেয়া হয়েছে। বাকি স্টেশনগুলোর মধ্যে আগারগাঁও থেকে কারওয়ান বাজার এবং কারওয়ান বাজার থেকে মতিঝিল পর্যন্ত প্রকল্পের কাজ যথাক্রমে দেশীয় কোম্পানির যৌথ সহযোগিতায় টাক্কেন করপোরেশন এবং সুমিটোমো মিতসুই কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড করবে।

প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে উত্তরা থেকে মতিঝিলে আসতে সময় লাগবে মাত্র ৩৭ মিনিট। খরচও সাশ্রয় হবে। প্রতিটি ট্রেনে ৬টি কম্পার্টমেন্ট থাকবে যাতে প্রায় ১৭০০ যাত্রী বহন করা যাবে। প্রাথমিকভাবে ৬টি করে মোট ২৪টি ট্রেন থাকবে এবং পরবর্তীতে ট্রেনের সংখ্যা ছয় থেকে ৮টিতে উন্নীত করা হবে। ফলে মোট ট্রেনের সংখ্যা দাঁড়াবে ৩২টি। জাপানের আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থা জাইকার সার্বিক সহযোগিতায় এ প্রকল্পে মোট ব্যয় হবে ২২ হাজার কোটি টাকা।

এমআরটি প্রকল্প-১ : এটি ২৬ দশমিক ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রথম আন্ডারগ্রাউন্ড মেট্রোরেল এবং এমআরটি-৬ এরপর দ্বিতীয় প্রকল্প। এই প্রকল্পের নাম দেয়া হয়েছে ‘ঢাকা ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি)-১’। এ প্রকল্পের প্রথম ধাপে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত ১৬ দশমিক ৪ কিলোমিটার পথটি বিমানবন্দর রুট এবং পরের ধাপে কুড়িল-বসুন্ধরা হয়ে পূর্বাচল পর্যন্ত ১০ দশমিক ২ কিলোমিটারে বিভক্ত থাকবে।

metro-rail

বিমানবন্দর রুটটি প্রায় সাড়ে ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং এখানে ১২টি স্টেশন থাকবে। স্টেশনগুলো হলো- শাহজালাল বিমানবন্দর, বিমানবন্দর টার্মিনাল ৩, খিলক্ষেত, যমুনা ফিউচার পার্ক, বারিধারা (নতুন বাজার), উত্তর বাড্ডা, গুলশান-১ (হাতিরঝিল), রামপুরা, মালিবাগ, রাজারবাগ হয়ে কমলাপুর।

নতুন বাজার-বারিধারা স্টেশনের সঙ্গে এমআরটি-৫ রুটের আন্তঃসংযোগ থাকবে। এ পথে শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে খিলক্ষেত স্টেশন পর্যন্ত এলিভেটেউ মেট্রোরেল হবে।

পরবর্তীতে খিলক্ষেত স্টেশন থেকে যমুনা ফিউচার পার্ক এবং নতুন বাজার পর্যন্ত আন্ডারগ্রাউন্ড মেট্রোরেল হবে। বারিধারা এলিভেটেড স্টেশন থেকে উত্তর বাড্ডা, গুলশান-১, রামপুরা স্টেশন পর্যন্ত এলিভেটেড রেলপথ হবে। রামপুরা এলিভেটেড স্টেশন থেকে মালিবাগ-রাজারবাগ-কমলাপুর পর্যন্ত আন্ডারগ্রাউন্ড মেট্রোরেল হবে।

পূর্বাচল রুটে ১০ দশমিক দুই কিলোমিটার পথে নয়টি স্টেশন থাকবে। পূর্বাচলগামী অংশটি বারিধারা নতুন বাজার থেকে যমুনা ফিউচার পার্ক-বসুন্ধরা (পুলিশ অফিসার্স হাউজিং সোসাইটি)-মাস্তুল-পূর্বাচল পশ্চিম-পূর্বাচল সেন্ট্রাল-পূর্বাচল টার্মিনাল (পূর্বাচল সেক্টর-৭) পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। এই পথে নতুন বাজার বারিধারা এলিভেটেড স্টেশন থেকে যমুনা ফিউচার পার্ক-বসুন্ধরা পর্যন্ত আন্ডারগ্রাউন্ড মেট্রোরেল হবে। তবে বসুন্ধরা স্টেশনটি এলিভেটেড স্টেশনে থাকবে এবং মাস্তুল-পূর্বাচল ওয়েস্ট পয়েন্ট-পূর্বাচল সেন্ট্রাল-পূর্বাচল টার্মিনাল পর্যন্ত এলিভেটেড মেট্রোরেল হবে। ফলে এ রুটে নতুন বাজার ও যমুনা ফিউচারপার্ক স্টেশন দুটো আন্ডারগ্রাউন্ডে থাকবে এবং বসুন্ধরা থেকে পূর্বাচল টার্মিনাল পর্যন্ত সাতটি স্টেশন হবে এলিভেটেড।

সড়ক ও সেতু বিভাগ সূত্র জানায়, প্রকল্পটির জন্য ইতোমধ্যে ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন অথরিটি (ডিটিসিএ) এবং জাইকার মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। ২০২০ সালে কাজ শুরু করে ২০২৫ সালের মধ্যে শেষ করার কথা। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৯ হাজার কোটি টাকা। প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে টাকা ও সময় উভয়ই সাশ্রয় হবে। প্রস্তাবিত এই মেট্রোরেলে প্রতিদিন প্রায় ১৪ লাখ যাত্রী পরিবহন করা যাবে। যা পরবর্তীতে ১৯ লাখে উন্নীত হবে।

এমআরটি-৫ প্রকল্প : এমআরটি-৫ হচ্ছে দ্বিতীয় আন্ডারগ্রাউন্ড মেট্রোরেল। কিন্তু মেট্রোরেল হিসেবে তৃতীয় বলা হবে। এ মেট্রোরেলের দুটি রুট। একটি রাজধানীর উত্তর দিক থেকে এবং অপরটি দক্ষিণ দিক থেকে। উত্তর দিক থেকে ২০ কিলোমিটার দূরত্বে মোট ১৪টি স্টেশন থাকবে। ১৪টি স্টেশনের মধ্যে নয়টি স্টেশন আন্ডারগ্রাউন্ডে ১৪ কিলোমিটার পথজুড়ে বিস্তৃত হবে। বাকি পাঁচটি স্টেশন এলিভেটেড অবস্থায় ছয় কিলোমিটার পথজুড়ে থাকবে।

অপরদিকে দক্ষিণ দিক থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরত্বে মোট ৮টি স্টেশন থাকবে, যার পুরোটাই আন্ডারগ্রাউন্ডে হবে। উত্তর দিকের স্টেশনগুলো হলো- হেমায়েতপুর (সাভার), বলিয়াপুর, বিলামালিয়া (মধুমতি), আমিন বাজার, গাবতলী, দারুসসালাম (টেকনিক্যাল), মিরপুর-১, মিরপুর-১০, মিরপুর-১৪, কচুক্ষেত, বনানী, গুলশান-২, নতুন বাজার হয়ে ভাটারা পর্যন্ত।

স্টেশনগুলোর মধ্যে আমিন বাজার থেকে নতুন বাজার পর্যন্ত নয়টি স্টেশন আন্ডারগ্রাউন্ডে এবং বাকি স্টেশনগুলো এলিভেটেড হবে। অন্যদিকে দক্ষিণ দিকের স্টেশনগুলো হচ্ছে গাবতলী, আদাবর, মোহাম্মদপুর, কলাবাগান, কারওয়ান বাজার, হাতিরঝিল, দক্ষিণ বাড্ডা হয়ে আফতাব নগর পর্যন্ত। সবগুলো স্টেশনই হবে আন্ডারগ্রাউন্ডে।

প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য ইতোমধ্যে জাইকা ও ঢাকা ডিটিসির মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। এ প্রকল্পের কাজ ২০২০ সালের মধ্যে শুরু হওয়ার কথা। শেষ হবে ২০২৮ সালের মধ্যে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রতিদিন প্রায় ১৫ লাখ যাত্রী পরিবহন করতে পারবে।

এমআরটি-২ প্রকল্প : ঢাকা ইপিজেড থেকে কমলাপুর আইসিডি পর্যন্ত ৪০ কিলোমিটার আন্ডারগ্রাউন্ড এমআরটি-২ প্রকল্প ২০৩৫ সালের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। স্টেশনগুলো হবে আশুলিয়া, সাভার, গাবতলী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ডিএসসিসি নগর ভবন এবং কমলাপুর পর্যন্ত।

এমআরটি-৪ প্রকল্প : কমলাপুর থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত ১৬ কিলোমিটার আন্ডারগ্রাউন্ড মেট্রোরেল প্রকল্প ২০৩৫ সালের মধ্যে করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।