জাবির দুই প্রভাবশালী শিক্ষক ফাঁসলেন ‘মি-টু’তে

স্টাফ রিপোর্টার : নারীর অসহায়ত্ব ও দুর্বলতাকে পুঁজি করে সারা বিশ্বে যৌন হয়রানি ও নারী নিগ্রহের প্রতিবাদে ‘মি টু’ আন্দোলনের হাওয়া এবার লেগেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যলয়।
জাবির সুনামধন্য অধ্যাপক ও নাট্যাচার্য পরলোকগত সেলিম আল দীনের পর এবার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতœতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান ফিজুর বিরুদ্ধে ‘মি টু’ হ্যাশট্যাগে যৌন হয়রানির অভিযোগ তুলেছেন জাবির নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাসরিন খন্দকার।

বৃহস্পতিবার রাত ১১ টায় নাসরিন খন্দকার ‘#মি টু’ হ্যাশট্যাগে তার ফেসবুকে আইডিতে এই অভিযোগ তুলেন। তিনি লিখেন, ‘১৯৯৫-১৯৯৬ সালে আমি প্রতœতত্ত্ব বিভাগে ভর্তি হয়েছিলাম। আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার থাকার বিষয়ে আমার পরিবার অনেক দুশ্চিন্তায় ছিলেন। ফলে আমার আম্মা একরকম জোর করেই আমাকে নিয়ে পুরনো পরিচয়ের সূত্র ধরে বিভাগীয় সভাপতি অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানের সাথে দেখা করালেন।
তিনি আমার আম্মাকে অতি আগ্রহের সাথে জানালেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার দেখভালের সব দায়িত্ব তার এবং তার গাড়িতে করে ক্যাম্পাস দেখালেন। তার অতি আগ্রহ আমার ভালো লাগেনি, কিন্তু আমার সরল আম্মা রীতিমত মুগ্ধ হয়ে গেলেন তার বদান্যতায়। আম্মার মাথাতেও আসেনি তার টিনএজার মেয়ের প্রতি আগ্রহ’ই মধ্যবয়স্ক এই শিক্ষকের বদান্যতার কারণ হতে পারে। খুব দ্রুতই তার এই আশালীন অতি আগ্রহ ক্লাসের সবার চোখে পরল। বিভাগেও এ নিয়ে হাসাহাসি হতো বলে শুনেছি। আমার বন্ধু লিমাকে ছাড়া আমি পারতপক্ষে বিভাগে যেতাম না, একমুহূর্তও আমাকে একা পাবার সুযোগ দিতাম না। কিন্তু প্রকাশ্যে ফিজুর অতি আগ্রহ, ক্লাসে নানা রকম আকার-ইঙ্গিত, সহপাঠীদের হাসাহাসি, আমার জীবন অতিষ্ঠ করে দিল। ফিজুর কোর্সে টিউটোরিয়ালে সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়ায় আরও বেড়ে গেল যন্ত্রণা। এরমধ্যে একদিন তার কোর্সে টিউটোরিয়াল পরীক্ষায় খাতা স্বাক্ষর করার সময় টের পেলাম তার অযাচিত নৈকট্য, ফলে পাথর হয়ে বসে থাকলাম, লিখতে পারিনি একটা অক্ষর। ফিজু সেময় রুম থেকে বের হলে সেই সুযোগে ছুটে পরীক্ষা হল থেকে বেরিয়ে আসলাম। পরে শুনেছি সে নাকি আমার চলে আসা নিয়ে হম্বিতম্বি করেছে পরীক্ষা হলে।
একদিন তার কোর্সের টিউটোরিয়ালের আগে অন্য একটা ক্লাস ছিল, বান্ধবী লিমা সেকেন্ড টাইম ভর্তি প্রস্তুতির জন্যে ক্লাস করবেনা, তাই একলাই বিভাগে গেলাম। বিভাগে গিয়ে দেখি সহপাঠীরা কেউ নাই। ক্লাসও সম্ভবত হবেনা। তবু আমি বকুল তলায় গিয়ে অপেক্ষা করছিলাম ক্লাসের খবরের জন্যে। এমন সময় পেছন থেকে সভাপতির পিওন এসে আমাকে ডাকলেন, বললেন স্যার আপনাকে ডাকছেন। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেলাম সভাপতির অফিস ঘরে। অফিসের কোন দরজা ছিল না। শুধু পর্দা দিয়ে সহকারীর বসার জায়গা আলাদা করা। তাই ভাবলাম কিছু ঘটলে দৌঁড় দেবো বা চিৎকার করবো।
তিনি আমাকে বসতে বললেন। বললেন যে আমি শিক্ষার্থী হিসেবে কতো সম্ভাবনাময়, উদ্বিগ্ন হলেন আমার উনুপস্থিতি নিয়ে। তার পর বললেন, শুধু মেধাই না, আমার আরও অনেক কিছু আছে যা দিয়ে আমি অনেক দূর যেতে পারি যদি উনি আমাকে সাহায্য করেন। আমি টেবিলের অপর প্রান্তে পাথরের মত মুখ করে বসে হাত দিয়ে ওড়নার ট্যাসেল ছিঁড়তে থাকলাম। মনে হচ্ছিল তার মুখের সামনে টেবিলটা উপড়ে দিয়ে চলে আসি।
তিনি বললেন তার প্রস্তাবের উত্তর পরে জানাতে। আমি বিদায় নিয়ে চলে আসলাম। রিকশা নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে সোজা হলের পেপার রুমে ঢুকলাম। তারপর লজ্জায়-ঘৃণায় আমি এ বিভাগে পড়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলি।
নাসরিন খন্দকার আরও লিখেন, পরের বছর তিনি নৃবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম হলে প্রতœতত্ত্ব বিভাগের সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান বিভাগ থেকে ছাড়পত্র দিচ্ছিলেন না। দশ দিন সময়ের মধ্যে ভর্তি হওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও তাকে অনকেদিন ঘুরানোর পর সভাপতি কোন ছাড়পত্র দেন নি। পরে ডীন ও প্রক্টর হয়ে তৎকালীন ভিসির বিশেষ স্বাক্ষরে বিভাগ পরিবর্তন করে নৃবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন নাসরিন খন্দকার। তিনি তার জীবনের এই ঘটনাকে পুরুষালী জগতে নারীমাংসের মানুষ হয়ে বেঁচে থাকার লড়াইয়ের ছোট্ট একটা ‘ওপেন সিক্রেট’ গল্প বলে উল্লেখ করেন।
অভিযোগের ব্যাপারে অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘নাসরিন খন্দকার নামে আমি কাউকে চিনি না। এতদিন কোথায় ছিল! ২২ বছর পর এসে লিখেছে বেয়াদব মেয়ে। আই ডোন্ট কেয়ার। আমার পদন্নোতিকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য উপন্যাস লিখছে।’ এর আগে গত মঙ্গলবার নাট্যাচার্য পরলোকগত সেলিম আল দীনের বিরুদ্ধে ‘মি টু’ হ্যাশট্যাগে মুশফিকা লাইজু নামে সাবেক শিক্ষার্থী যৌন হয়রানির অভিযোগ তোলেন। তিনি ও তার ফেসবুকে লিখেন ৩১ বছর আগে ১৯৮৭ সালে একাডেমিক কাজে সেলিম আল দীনের বাসায় গেলে তাকে জোর করে চুমা দেওয়ার চেষ্টা করেন এবং তার গায়ের কোর্টের বোতাম খোলার চেষ্টা করেন। পরে তিনি পালিয়ে বাচঁলেও পরে বিভাগের ক্লাস থেকে তাকে অকারণে বের করে দিত এবং এসাইমেন্টে দিত। ফলে এ লজ্জা ও ক্ষোভে তিনি পড়ালেখা ছেড়ে ক্যাম্পাস ত্যাগ করেন। মুশফিকা আরও দাবি করেন তার প্রতি এই যৌন হয়রাণীর কথা তৎকালীন তার বিভাগের সবাই জানত। কিন্তু সেলিম আল দ্বীনের প্রভাবের কারণে কেউ মুখ খুলেনি।
এ বিষয়ে জাবিতে চলছে তোলপাড়। জাবি সাংস্কৃকিত জোটের সেক্রেটারী শহিদুল্লাহ পাপ্পু লিখেন, ‘একজন যৌন নিপীড়কের নামে জাবির মুক্তমঞ্চ (সেলিম আলদ্বীন মুক্ত মঞ্চ) আর আমরা সেই মঞ্চেই অভিনয় করি, বিপ্লবী কবিতা পড়ি।’
এ বিষয়ে নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মির্জা তাসলিমা সুলতানা বলেন,‘একজন শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রী হয়রানির শিকার হওয়া কাঙ্খিত নয়। কোন নারী হয়রানির শিকার হলে সাথে সাথে প্রতিবাদ করতে চাইলেও পারিপার্শ্বিক নানা কারণে মুখ বন্ধ রাখে।এছাড়াও কেউ বিভাগ পরিবর্তন করতে চাইলে তাকে বিভাগ পরিবর্তনের অনুমতি দেয়ার রেওয়াজ আছে। কিন্তু অভিযুক্ত ব্যক্তি এখানে স্বেচ্ছাচারিতার আশ্রয় নিয়েছেন।
এদিকে সেলিম আল দ্বীনের বিষয়ে তিনি বলেন ‘মৃত্যুর পর আমাদের ভাল-মন্দ কর্ম দুটোই পৃথিবীতে থেকে যায়। পরলোকগত ব্যক্তির বিরুদ্ধে কিছু করা যাবে না ঠিক আছে। কিন্তুু এই সমাজে নারীর নিরাপত্তা, সচেতনতা ও সত্য উদঘাটনের জন্য বিষয়টি সবার জানার দরকার আছে। আসলে ‘মি টু’ আন্দোলন প্রমাণ করে বিদ্যমান আইন নারীর জন্য সহায়ক নয়। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারী আইনের প্রতি পুরোপুরি ভরসা পাচ্ছেন না। তাই আজ নারী বহুবছরের জমানো ক্ষোভ, হতাশা প্রকাশ করছে।’