‘অডিট হয়রানি’ আয়কর বৃদ্ধিতে বড় প্রতিবন্ধকতা

মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) বিপরীতে বাংলাদেশে কর আদায় একেবারে কম। জিডিপির অনুপাতে মাত্র ৯ শতাংশ কর আদায় হয়। দক্ষিণ এশিয়াতে এটিই সর্বনিম্ন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে ব্যক্তি খাতের করহার বৃদ্ধিতে বড় বাধা আয়কর সংক্রান্ত আইনি জটিলতা ও অডিটের নামে হয়রানি।

বেশির ভাগ মানুষই মনে করেন, কর-ব্যবস্থা অত্যন্ত জটিল। এছাড়া কর প্রদানের পর অডিটের নামে নানা হয়রানির অভিজ্ঞতার কথা শুনে অনেকে ভয়ে আয়কর দিতে যান না।

বর্তমানে আয়কর প্রদানে সার্বজনীন স্ব-নির্ধারণী পদ্ধতি চালু রয়েছে। কিন্তু এটি চালু থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে অডিটের নামে হয়রানি কমেনি বলে অভিযোগ করদাতাদের। ভুক্তভোগীরা বলছেন, রিটার্নের সঙ্গে আয় ও সম্পদের সঠিক কাগজপত্র দেয়া হলেও ‘ঘুষ’ আদায়ে নানা হয়রানি করেন কর্মকর্তারা। এতে রাজস্ব হারানোর পাশাপাশি নিরুৎসাহিত হচ্ছেন তারা।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্র জানায়, সার্বজনীন স্ব-নির্ধারাণী পদ্ধতিতে একজন করদাতা নিজেই কর নির্ধারণ ও অগ্রিম কর দিতে পারেন। এক্ষেত্রে কোনো শুনানিতে অংশ নিতে হয় না। ঝামেলা এড়াতে চাকুরীজীবী ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষরা এ পদ্ধতিতে কর প্রদান করে থাকেন। কিন্তু আয়কর অধ্যাদেশ-৯৩ ও ১২০ ধরা মোতাবেক নিজস্ব ক্ষমতা বলে সঠিকভাবে সম্পদ ও আয়কর নিধার্রণ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন আয়কর কর্মকর্তারা।

এনবিআর সূত্র আরও জানায়, দেশে মোট করদাতার সংখ্যা ৩৩ লাখ। এর মধ্যে কর দেন ১৬ লাখ। মোট করদাতার প্রায় সবাই স্ব-নির্ধারণী পদ্ধতিতে কর দিয়ে থাকেন। যারা ফরম পূরণ করতে না পারেন তারা আইনজীবী দিয়ে পূরণ করে জমা দেন।

আয়কর রিটার্ন না দেয়ার ক্ষেত্রে আরও বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে স্ব-নির্ধারণী পদ্ধতিতে আয়কর দিতে হিসাবায়ন নিয়ে অস্পষ্টতা। এনবিআর ওয়েবসাইটে এ সংক্রান্ত একটি ক্যালকুলেটর ছিল একসময়, এখন সেটা নেই। এছাড়া আয়কর জমা দেয়ার ক্ষেত্রে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে হয়। কারণ অনলাইন পেমেন্ট সিস্টেম বন্ধ রয়েছে। এর চেয়েও বড় সমস্যা হলো অডিট হয়রানি। ছোট-বড় সব শ্রেণির করদাতারা অডিটের হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

সার্কেল অফিসের কর্মকর্তারা ইচ্ছা করলেই যে কাউকে এ বিষয়ে তদন্তের জন্য ডাকতে পারেন। এতে অনেকেই বিরক্ত হয়ে অন্যকে কর না দিতে উৎসাহিত করেন। এসব রিটার্ন সাধারণত দুই পদ্ধতিতে অডিট করা হয়। এক. দ্বৈবচয়ন পদ্ধতি, দুই. বিশেষ অডিট। দ্বৈবচয়ন হলো- একটি কর অফিসে যদি ১০০ কর ফাইল জমা পড়ে তাহলে দ্বৈবচয়নের ভিত্তিতে যাচাই-বাছাই করে ৩০-৫০টি ফাইল অডিটের জন্য নির্বাচন করা। পরবর্তীতে এসব করদাতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ফাইলের তথ্য সংক্রান্ত বিষয়ের সত্যতা জানতে চাওয়া।

জানা গেছে, বিশেষ অডিটের নামে সার্কেল অফিসের আয়কর কর্মকর্তা স্ব-প্রণোদিত হয়ে যেকোনো করফাইল নিয়ে অডিট করতে পারেন। গত অর্থবছরে মোট করদাতার মধ্যে ২৭ হাজার করফাইল অডিট করা হয়েছে বলে জানায় এনবিআর সূত্র।

মিরপুরের ব্যবসায়ী সোহান রহমান। বলেন, গত বছর কর দিয়েছি প্রায় সাড়ে ছয় হাজার টাকা। এখন বলা হচ্ছে, সম্পদের হিসাব ও গচ্ছিত টাকা দেখানো হয়নি বলে শুনানির জন্য ডাকা হয়েছে। এটা এক ধরনের হয়রানি ছাড়া কিছুই নয়।

একাধিক ভুক্তভোগী  কাছে অভিযোগ করেন, অডিটের জন্য শুনানি হলে কিছু টাকা দিতেই হয়। কিছু পয়সা খরচ না করলে সমস্যার শেষ হয় না। অনেক সময় এখানকার কর্মচারীদের মাধ্যমেও সহায়তা পাওয়া যায়। পয়সা দিলে তারা আর ডাকাডাকি করে না।

একশ্রেণির অসাধু কর্মচারীও যুক্ত হয় অসাধুদের তালিকায়। অডিটের জন্য কোনো ইন্সপেক্টর কল (ডাক) করলে তারা (অসাধু কর্মচারী) সেসব করদাতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এ অবস্থায় তারা করদাতাকে জানান, ইন্সপেক্টরের সঙ্গে কথা বলার দরকার নাই। আমরা ম্যানেজ করে দেবো। এজন্য একটা বড় অংকের টাকা বকশিশ দিতে হয়। এতেই শেষ নয়, ট্যাক্স ফাইল তারা অসম্পূর্ণ রেখে দেয়। কয়েক বছর পর আবার সমস্যা হয়।

আয়কর আইনজীবী এস এম মঞ্জুরুল হক এ প্রসঙ্গে জাগো নিউজকে বলেন, একটা ফাইল যদি অডিটের নামে তোলা হয়, তাহলে প্রায় ক্ষেত্রে নাজুক অবস্থা তৈরি হয়। অডিট অফিসাররা সরসরি সম্পদের হিসাবে ঠিক নাই বলে অভিযোগ করেন। এছাড়া আজগুবি কথাও বলে দিতে পারেন। এজন্য অনেকে পয়সা দিয়ে হলেও ঝামেলা থেকে বাঁচতে চান।

জানা গেছে, অডিট আপত্তি সার্কেল অফিসে মিটমাট না হলে মামলা হয়। অনেক সময় এসব মামলা নিষ্পত্তি হতে ৫ থেকে ১০ বছর সময় লেগে যায়। সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, কোনো ফাইল নিয়ে অডিট করতে চাইলে সার্কেল অফিসের কর্মকর্তা ওই করদাতাকে তলব করেন। অনেকে স্ব-শরীরে কর অফিসে এসে বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন, আবার অনেকে আয়কর আইনজীবী পাঠিয়ে দেন। তখন যদি কোনো অডিট আপত্তি থাকে তাহলে সেটা মেনে নিয়ে যদি করদাতা তা পরিশোধ করেন- তাহলে অডিট সেখানেই শেষ। আর যদি মেনে না নেন, তাহলে কর অফিস ১৫ দিনের সময় দিয়ে একটি ডিমান্ড নোটিস পাঠান। ১৫ দিন পরও ওই করদাতা দাবি করা কর পরিশোধ না করলে পরবর্তীতে অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের হয়। সেই মামলা সহসা নিষ্পত্তি হয় না। ৫ থেকে ১০ বছর সময় লেগে যায়। পুরো প্রক্রিয়াটির মাধ্যমে করদাতাদের হয়রানি করা হয়।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে এনবিআর চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, ‘আগে কী হয়েছে বলতে পারবো না। এটা সবাই জানে, রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অডিটের নামে ব্যবসায়ীদের হয়রানি করে থাকেন। এসব না করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।’

‘এখন থেকে এমন অভিযোগ পেলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। এমনকী এ বিষয়ে একটি যথাযথ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।’

এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, ২০১৪ সালের ৩০ জুন মোট ই-টিআইএনের সংখ্যা ছিল ১২ লাখ ৫০ হাজার ২৬৮। পরের বছরে চার লাখ বেড়ে ১৬ লাখ ৫৫ হাজার ৮০৮-তে উন্নীত হয়। ২০১৬ সালের ৩০ জুন তা ১৯ লাখ ৭৯ হাজার ১৮৯-এ দাঁড়ায়। ২০১৭ সালের এপ্রিলে ই-টিআইএনের সংখ্যা ২৮ লাখে উন্নীত হয়।

তবে যে হারে আয়কর বাড়ার কথা ছিল সেটা হচ্ছে না। এর আরেকটি অন্যতম কারণ আইনি জটিলতা। জানা গেছে, একজন করদাতা জীবনের প্রথমবার রিটার্ন জমা দিতে গিয়েই পড়েন নানা ঝামেলায়। শুরুতে আট পৃষ্ঠার (আইটি ১১গ) একটি দীর্ঘ ফরম পূরণ করতে হয়। এ ফরমের অনেক অংশ রয়েছে, যেগুলো তার জীবনযাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আয়-ব্যয়ের হিসাব কষে কত টাকা কর দিতে হবে, সেজন্য অন্যের পরামর্শ নিতে বাধ্য করা হয়। এরপর করের টাকা জমা দিতে দাঁড়াতে হবে ব্যাংকের লম্বা লাইনে। সর্বশেষ টাকা জমার রসিদ নিয়ে সংশ্লিষ্ট সার্কেলে জমা দিতে হবে। ১৬ লাখ ব্যক্তি শ্রেণির করদাতার মধ্যে অধিকাংশই রিটার্ন জমা দেয়ার এ প্রক্রিয়া জটিল বলে মনে করেন। এ জটিলতায় অনেকে কর দিতে নিরুৎসাহিত হন।

এ বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘কর আদায়ে বড় ধরনের দুর্বলতা রয়েছে। কারণ ২০১৭ সালে নেপালের মাথাপিঁছু আয় ছিল এক হাজার ৩৩০ মার্কিন ডলার। কর আদায় জিডিপির ১০ শতাংশের কম। কিন্তু আলোচ্য সময়ে নেপালের মাথাপিঁছু আয় ছিল ৭৩০ মার্কিন ডলার। কর আদায় হয় জিডিপির ২৪ শতাংশ। অর্থাৎ কম আয় করেও তারা বেশি কর আদায় করতে পেরেছে। ফলে এখানে নজর দিতে হবে।’

‘বিশেষ করে কর আদায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।’ করনীতি ও কাঠামো পরিবর্তনের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

কর জটিলতার এ তথ্য সরকারের দায়িত্বশীলরাও অবগত। বিভিন্ন সময় তারা এ বিষয়ে কথাও বলেছেন। এরই ধারাবাহিকতায় এনবিআর গত কয়েক বছর ধরে রিটার্ন জমা ও ফরম সহজীকরণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এ সংক্রান্ত একাধিক সহজ ফরম প্রণয়ন করেছে এনবিআর। এর মধ্যে রয়েছে আইটি ১০বি, আইটি ১০বিবি ও আইটি ১১গ ২০১৬। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, এসব ফরম সচরাচর পাওয়া যায় না। এমনকী আয়কর মেলা কিংবা সার্কেল অফিসে রিটার্ন পূরণের জন্য এসব ফরম দেয়া হয় না। আট পৃষ্ঠার ফরম পূরণ করেই রিটার্ন জমা দিতে হয়।

আয়কর আইনজীবী ও আয়কর কর্মকর্তারা বলছেন, বহু চেষ্টার পর তৈরি করা হয়েছিল নতুন রিটার্ন ফরমটি (আইটি ১১গ ২০১৬), যা অনেক সহজবোধ্য। যে কেউ এটি পূরণ করতে পারতেন। পুরনো ফরমের পরিবর্তে আয়কর মেলায় নতুন ফরম দিলে অনেকেই সহজে তা পূরণ করে নিজেই আয়কর দিতে পারতেন। এটি চালুও হয়েছিল। কিন্তু এখন আর পাওয়া যায় না।

এ বিষয়ে মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া আরও বলেন, সারাদেশে এখন ই-টিআইএনের সংখ্যা ৩৫ লাখের বেশি। এর মধ্যে ২০ লাখ রিটার্ন দিচ্ছেন না। অন্যতম কারণ হলো, কর নিয়ে এক ধরনের ভয়। তাই করদাতাবান্ধব এনবিআর গড়ে তোলার চেষ্টা করছি।

তিনি বলেন, ট্যাক্সের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের আরও প্রশিক্ষিত করা, মোটিভেট করা এবং জনবল বৃদ্ধির জন্য সরকারের কাছে আবেদন করা হয়েছে। আশা করি এর সুফল পাওয়া যাবে।’

‘এনবিআরের কর্মকর্তারা আমাকে সহায়তা করছেন। কিন্তু দুর্নীতিবাজ ও ঘুষখোর মেম্বারদের একেবারে বের করে দেয়া সম্ভব হচ্ছে না’- যোগ করেন এনবিআর চেয়ারম্যান।