১ বলে ২৮৬ রান! সত্যি নাকি গুজব!

সম্প্রতি প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে নিউজিল্যান্ডের ব্রেট হ্যাম্পটন ও জো কার্টার এক ওভারে ৪৩ রান নিয়ে বিশ্বরেকর্ড গড়েছেন। এর আগে বাংলাদেশের পেসার আলাউদ্দীন বাবুর এক ওভারে ৩৯ রান নিয়ে রেকর্ড গড়েছিলেন এলটন চিগুম্বুরা। এছাড়া ট্রাভিস বার্ট ১ বলে ২০ রান নিয়েছিলেন। কিন্তু এক বলে সর্বোচ্চ রানের রেকর্ডটি কত? অবাক হবেন, ক্রিকেটে ১ বলে সর্বোচ্চ রান হয়েছিল ২৮৬! অর্থাৎ, দুই ব্যাটসম্যান প্রায় ৬ কিলোমিটার দৌড়েছিলেন!

১ বলে ২৮৬ রানের রেকর্ডটি হয়তো অবিশ্বাস্য। কিন্তু ক্রিকেট গৌরবজ্জ্বল ইতিহাসের খেলা। এখানে দুই স্ট্যাম্পের মাঝে অনেক কিছুই ঘটতে পারে। তবে এই রেকর্ডটির পক্ষে তেমন কোনো প্রমাণ নেই। যেহেতু এই রেকর্ডের পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই তাই কেউ কেউ মনে করেন আসলেই এটি সম্ভব হয়েছিল আবার কারো মতে এটা শুধুই একটি গুজব। যেহেতু রেকর্ডটির কোনো ভিডিও নেই তাই এটিকে আন্তর্জাতিক রেকর্ডে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। কিন্তু কিভাবে ছড়াল এটি?

১৮৯৪ সালে লন্ডনের একটি পত্রিকা ‘পলমল গেজেট’ এই রেকর্ড সম্পর্কে প্রথম খবর প্রকাশ করা হয় এবং তাতে পুরো ঘটনাটি উল্লেখ করা হয়।

পশ্চিম অস্ট্রেলিয়া বনাম ভিক্টোরিয়ার একটি প্রথম শ্রেণির ম্যাচে এ ঘটনাটি ঘটে। খেলাটি এমন একটি মাঠে হচ্ছিল যার মধ্যে একটি বড় গাছের কিছু অংশ এসে পড়েছিল। আর এ কারণেই এমন অবিশ্বাস্য ঘটনাটি ঘটেছিল বলে অভিমত ছিল পলমল গেজেটের। ম্যাচের প্রথম বলেই ভিক্টোরিয়ার ব্যাটসম্যানের শটে বল সোজা গাছে গিয়ে আশ্রয় নেয়। এ সময় পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার খেলোয়াড়েরা আম্পায়ারের কাছে বল হারিয়ে যাওয়ার কথা জানালেও আম্পায়ার তাতে রাজি হননি। কারণ গাছের ডালে আটকে থাকা বলটি খুব ভালোভাবেই চোখে পড়ছিল আম্পায়ার সাহেবের। এমন ফ্যাসাদের মধ্যেই ভিক্টোরিয়ার দুই ব্যাটসম্যান রান তোলার ম্যারাথন প্রচেষ্টায় নামেন। দুই ব্যাটসম্যান হাঁপিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত নিজেদের মধ্যে জায়গা বদল করতে থাকেন। থামার পর দেখেন তাঁরা দুজন নিজেদের মধ্যে জায়গা বদল করেছেন ২৮৬ বার।

গাছ থেকে বল নামাতে মূল দেরিটা হয়েছে কুড়াল খুঁজতে গিয়ে। বলটা দুটি ডালের মধ্যে এমন একটা জায়গায় আটকে ছিল যা বের করতে কুড়ালের প্রয়োজন দেখা দেয়। কিন্তু পশ্চিম অস্ট্রেলিয়া দলের লোকজন ঠিক ওই মুহূর্তে কুড়াল খুঁজে পাচ্ছিলেন না কোথাও। কুড়াল খুঁজে পেতে আনতে আনতেই ২৮৬ রান নেওয়া হয়ে যায় ভিক্টোরিয়ানদের।

ঘটনা এখানেই শেষ নয়। এক বলে ২৮৬ রান করার পরপরই ইনিংস ঘোষণা করে দেয় ভিক্টোরিয়া। ইনিংসে মাত্র এক বল হওয়ার এই ঘটনাও ক্রিকেটে একটা রেকর্ড। ভিক্টোরিয়া এই ম্যাচটি শেষ পর্যন্ত জিতেও ছিল।

পলমল গেজেটে প্রকাশিত এ ঘটনাটি নিয়ে কিন্তু যথেষ্ট বিতর্কও আছে। সবচেয়ে বড় বিতর্কের জন্ম দেয় এই মর্মে যে ঘটনাস্থল অস্ট্রেলিয়া হলেও এই সংবাদটি অস্ট্রেলিয়ার কোনো স্থানীয় সংবাদপত্রে কেন আগে প্রকাশিত হলো না। পার্থের একটি পত্রিকা পলমল গেজেটে সংবাদটি বের হওয়ার প্রায় দুই মাস পর এ-সংক্রান্ত একটি সংবাদ পরিবেশন করে। সেখানে বলা হয়, ‘কোনো এক রূপকথা লেখক লন্ডনে বসে গাঁজায় দম দিয়ে এ সংবাদটি তৈরি করেছে।’ পলমল গেজেট অবশ্য পার্থের ওই পত্রিকাটির বক্তব্যের প্রতিবাদ করেছিল। প্রতিবাদ যেহেতু করেছিল, এ-সংক্রান্ত প্রমাণও নিশ্চয়ই তাদের হাতে ছিল।

এত বছর পরে সেই প্রমাণ হাতে না পাওয়ায় গিনেস বুকে এ-সংক্রান্ত কোনো রেকর্ড লিপিবদ্ধ করা সম্ভব হয়নি। তবে এই মুহূর্তে ক্রিকেটে এক বলে সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড লেখা আছে—১৭। অস্ট্রেলিয়ার একটি ক্লাব ম্যাচে সংঘটিত এই ঘটনার পূর্ণ বিবরণ লেখা আছে ১৯৯২ সালের গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস সংস্করণে।

প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেট অবশ্য এক বলে সর্বোচ্চ ১০ রানকে বৈধ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়৷ অর্থাৎ, ১ বলে সর্বোচ্চ ১০ রান নেওয়া হয়েছিল বলেই প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটের সরকারী নথিপত্রে লিপিবদ্ধ আছে। ইংল্যান্ডের ফোর ম্যাগাজিনের একটি ফিচারে সামারভিল গিবনে নামের এক ক্রিকেট লেখক দাবি করে বলেছেন, ‘কোনো সন্দেহ নেই ক্রিকেটে ১ বলে সর্বোচ্চ ৯৩ রান নেওয়ার ঘটনাও আছে।’