ব্যাংক নিজেই খেলাপির পথে!

আমানত না আসায় অন্য প্রতিষ্ঠান থেকে টাকা ধার করে গ্রাহকদের ঋণ দিচ্ছে বেশ কয়েকটি ব্যাংক। গ্রাহক নির্ধারিত সময়ে টাকা ফেরত না দেওয়ায় খেলাপির ঝুঁকিতে পড়ছে ঋণ করে (ধার করে) চলা ব্যাংকগুলো। এমন দুরবস্থার মধ্যে গ্রাহকরা ব্যাংক থেকে আমানত তুলে নিচ্ছেন। এতে ব্যাংক খাতে আরও ঝুঁকি বাড়ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ৩০টিরও বেশি ব্যাংক এখন ধার করে (ঋণ করে) চলছে। এরমধ্যে বেশ কয়েকটি ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিআরআর (নগদ জমা) ও এসএলআর (বিধিবদ্ধ সঞ্চিতির হার) জমা রাখতে পারছে না। অনেক ব্যাংক মূলধনও ভেঙে খাচ্ছে। বেশ কয়েকটি ব্যাংক প্রয়োজনীয় মূলধন সংরক্ষণ করতে পারছে না।

সাম্প্রতিক সীমাহীন অনিয়ম, দুর্নীতি ও বেপরোয়াভাবে ঋণ বিতরণ করায় এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ‘সানেম’-এর নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক সেলিম রায়হান। তিনি  বলেন, ‘কয়েক বছর ধরেই আমরা দেশে বিনিয়োগ পরিস্থিতির কোনও উন্নতি দেখছি না।’ তিনি বলেন, ‘গত ছয়টি নির্বাচনের বছর ও এর কাছাকাছি বছরগুলোতে আমরা দেখেছি— ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি কমে যায়। অথচ এখন ব্যাংক খাতে ঋণ বেড়েই চলছে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকারি খাতের বেসিক ব্যাংক মোট আমানতের ১০৫ দশমিক ৩২ শতাংশ ঋণ বিতরণ করেছে। রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক মোট আমানতের ১০০ দশমিক ৩২ শতাংশ ঋণ দিয়েছে। এছাড়া, বেসরকারি খাতের বেশ কয়েকটি ব্যাংক মোট আমানতের ১০০ শতাংশেরও বেশি ঋণ বিতরণ করে। এরমধ্যে ফার্মার্স ব্যাংক এখনও গ্রাহকদের টাকা পরিশোধ করতে পারছে না।

এদিকে বেঁধে দেওয়া সুদহার কার্যকর করতে গিয়ে গত দুই মাসে জনতা ব্যাংকের ২ হাজার ৬১২ কোটি টাকার আমানত হ্রাস পেয়েছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিবকে দেওয়া এক চিঠিতে জনতা ব্যাংকের সিইও ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুছ ছালাম আজাদ নিজেই এই দাবি করেছেন। তিনি চিঠিতে উল্লেখ করেন, ‘অর্থমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জনতা ব্যাংক গত ১ জুলাই থেকেই আমানত ও ঋণের সুদের হার যথাক্রমে সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ ও ৯ শতাংশ বাস্তবায়ন করেছে। এতে প্রথম দিকে আমানতের ওপর বিরূপ প্রভাব পরিলক্ষিত না হলেও পরবর্তীতে ক্রমান্বয়ে আমানতের পরিমাণ হ্রাস পেতে থাকে, যার ফলে বিগত দুই মাসে ব্যাংকটির ২ হাজার ৬১২ কোটি টাকা আমানত হ্রাস পেয়েছে।’

জানা গেছে, আমানত হ্রাস পাওয়ায় অন্যান্য ব্যাংকের মতো জনতা ব্যাংকও তারল্য সংকটের সম্মুখীন হয়েছে। ফলে ব্যাংকটিকে মানি মার্কেট থেকে কল লোন এবং বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অ্যাসিউরড লিকুইডিটি সাপোর্ট (এএলএস) ও রেপোর মাধ্যমে কর্জ (ধার) করে প্রয়োজনীয় সিআরআর সংরক্ষণ করতে হচ্ছে। নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সিআরআর সংরক্ষণসহ গ্রাহকদের দৈনন্দিন চাহিদা পূরণের জন্য জনতা ব্যাংক গত ২৬ আগস্ট মানি মার্কেট থেকে ২ হাজার ১৩৬ কোটি টাকা ধার করে।

এদিকে, মানি মার্কেটের কলমানি সুদ হারও ক্রমাগতভাবে বাড়ছে। কয়েক মাস আগে এক শতাংশ সুদে টাকা পাওয়া গেলেও এখন কলমানি সুদ হার চার শতাংশের ওপরে গিয়ে ঠেকেছে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘অব্যাহতভাবে কলমানি থেকে ধার করার প্রবণতা মোটেও ভালো লক্ষণ নয়।’ তিনি উল্লেখ করেন, যেসব ব্যাংকের তহবিল ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা থাকে তারা কলমানির দিকে বেশি ঝোঁকে।

এদিকে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ব্যাংকে যে পরিমাণ আমানত আসছে, ঋণ বিতরণ হচ্ছে তারচেয়েও বেশি। গত এক বছরে ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণ করেছে ১ লাখ ৩৩ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকা। অথচ এই সময়ে ব্যাংকে আমানত এসেছে ৯০ হাজার ৪২২ কোটি টাকা। অর্থাৎ ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণ করেছে সংগৃহীত আমানতের চেয়ে ৪২ হাজার ৯২১ কোটি টাকা বেশি।

নিয়ম অনুযায়ী, সাধারণ ব্যাংকগুলো ১০০ টাকা আমানত সংগ্রহ করলে সর্বোচ্চ ৮৫ টাকা ঋণ দিতে পারে। তবে ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলো ঋণ দিতে পারে সর্বোচ্চ ৯০ টাকা পর্যন্ত। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, ব্যাংকগুলো আমানতের চেয়ে অনেক বেশি ঋণ বিতরণ করেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত দুই বছরে (২০১৬ সালের জুন থেকে ২০১৮ জুন পর্যন্ত) ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণ করেছে ২ লাখ ৪০ হাজার ২৬১ কোটি টাকা। যদিও এ সময়ে আমানত এসেছে মাত্র ১ লাখ ৭৩ হাজার ৯৫২ কোটি টাকা।

দেখা যাচ্ছে, দুই বছরে সংগৃহীত আমানতের চেয়ে ৬৬ হাজার ৩০৯ কোটি টাকা বেশি ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। অর্থাৎ এই পরিমাণ অর্থ ঋণ বা ধার করেছে ব্যাংক।

এ প্রসঙ্গে ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান  বলেন, ‘যেসব ব্যাংক সীমার চেয়ে বেশি ঋণ বিতরণ করেছে, তারা এখন নতুন করে ঋণ দিতে পারছে না। বিশেষ করে বড় অংকের ঋণ দিতে পারছে না।’