বউ বেচাকিনির হাট

 আফ্রিকার দেশ নাইজেরিয়ায় এখনও এক জঘন্য বিয়ের প্রথা চালু আছে। যাকে অনায়াসেই বউ বেচাকিনির হাট বলে উল্লেখ করা যায়। কেননা এখানে অর্থশালীরা চাইলেই দরিদ্র মেয়েদের টাকা দিয়ে ক্রয় করতে পারেন। এই পুরনো প্রথার নাম ‘মানি ম্যারিজ’ বা টাকার বিনিময়ে বিয়ে।

নাইজেরিয়ায় এই প্রথার অধীনে টাকার বিনিময়ে কিশোরী এমনকি ৫ বছরেরে একটি মেয়েশিশুকে পর্যন্ত একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের হাতে তুলে দেয়ার নজির রয়েছে। যদিও ২৫ বছরেরও বেশি সময় আগে এই ধরনের বিয়ে নিষিদ্ধ করেছে নাইজেরিয়া সরকার। তারপরও সেখানকার সমাজে বহাল তবিয়তে বিরাজমান এই বিয়ে, বিশেষ করে প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে।

মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেই এরকম মানি ম্যারিজের শিকার হয়েছে পাঁচ বছরের শিশু মিরাকল। এখন সে এক খ্রিস্টান মিশনারির জিম্মায় আছে। তাকে বিয়ে নামের জঘন্য অনাচার থেকে উদ্ধার করেছেন ওই মিশনারি। তিনি বলেন, মিরাকলের ঘটনা প্রমাণ করে দেশে এখনও এ ধরনের বিয়ের প্রচলন রয়েছে।

এর আগে মিরকলের কিশোরী বোনকে একইভাবে বিয়ে করেছিল ওই ব্যক্তি। সে মারা যাওয়ার পর তার পাঁচ বছর বয়সী ছোটবোনকে বিয়ে করে তার তথাকথিত স্বামী।

সে দিক দিয়ে বিচার করতে গেলে রোসে ইনায়েতিকে ভাগ্যবতীই বলতে হয়। কেননা স্থানীয় মানবাধিকার কর্মীরা তাকে উদ্ধার করেছে দীর্ঘ ৯ বছর আগে। রোসে বলে, ‘তারা যখন আমাকে উদ্ধার করে তখন আমি ১০ বছরের শিশু। আমার ৭ বছর বয়সে বাবা মারা যান। এরপর মানি ম্যারিজের শিকার হই আমি।’ এর তিন বছর পর যখন তার বয়স ১০ বছর তখন তাকে ছাড়িয়ে আনেন মানবাধিকার কর্মীরা।

নাইজেরিয়ার কমিয়্যুনিটি লিডার ওনামাতোপে সানডে ইনচেলে এ ধরনের উদ্ধার কাজের সঙ্গে জড়িত আছেন। তিনি জানান, ‘গত শতাব্দীর ৯০ দশকেই এই বিবাহ প্রথাটি বিাতিল করা হয়েছে। এখন প্রকাশ্যে এসে তো কোনো ব্যক্তি বলেন না, আমি টাকার বিনিময়ে কোনো মেয়েকে বিয়ে করতে চাই। বরং আর্থিক অনটনে থাকা পরিবারগুলোই অর্থের বিনিময়ে তাদের মেয়েদের স্বেচ্ছায় এ ধরনের বিয়ে দিয়ে থাকেন। ধরুন, কোনো বাবা অসুস্থ হলেন কিংবা পুলিশ মামলায় জড়িয়ে পড়লেন। তখন তো তার যে কোনো মুল্যে টাকা দরকার। তখন ওই পিতা কোনো সম্পদশালীর কাছ থেকে টাকা ধার করেন। বিনিময়ে নিজের কন্যাটিকে বিয়ে দেন পাওনাদার ব্যক্তির কাছে।’

এই ধরনের বিয়ে আসলে এক ধরনের দাসপ্রথা। আর এর মাধ্যমে চরমভাবে যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে নাইজেরিয়ার মেয়েশিশু ও কিশোরীরা। এ ধরনের বিয়ের শিকার মেয়েদের বলা হয় ‘মানি ওয়াইফ’ বা টাকায় কেনা বৌ।

মিশনারি রিচার্ড আকোনাম তার গোটা জীবন ব্যয় করেছেন এসব টাকার বৌদের রক্ষা করার কাজে। গত নয় বছরে তিনি মোট ২১ জন মেয়েকে উদ্ধার করছেন। এ ধরনের বিয়ের মাধ্যমে একজন মেয়ে যে স্বামীর ঘর পায় তাকে তিনি ‘পতিতালয়’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘আইন বহির্ভূতভাবে একজন ব্যক্তি এই মানি ম্যারেজ করে থাকেন। এমনকি অনেক সময় কোনো কোনো ব্যক্তি একজন মেয়ের জন্মের আগেই তাকে নিজের জন্য বায়না করে রাখেন। এমনকি ওই মেয়েটির জন্য সে ৪০ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করে থাকেন। অনেক সময় ওই ব্যক্তি মারা গেলে তার ভাই ওই মানি ওয়াইফকে বিয়ে করেন।’

নাইজেরিয়ার এই ঘৃণ্য প্রথাটি এখনও বহাল তবিয়তে টিকে আছে। আর বিক্রি হয়ে যাওয়ার পর কেবল মাত্র অল্প সংখ্যক মেয়েকেই উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। আর এসব উদ্ধার কাজ ততটা সহজ নয়। এজন্য সেখানকার মানবাধিকার কর্মীরা সহজেই ধনী ও প্রভাবশালীদের রোষানলে পড়েন। এমনকি তাদের হুমকির মুখে অনেক মানবাধিকার কর্মী ‘মানি ওয়াইফ’ উদ্ধারের কাজ ছেড়ে দিয়েছেন, এমন ঘটনাও বিরল নয়।, বাংলাদেশ জার্নাল