মন্ত্রণালয়ের নির্দেশেও বন্ধ হচ্ছে না অবৈধ এমএলএম ব্যবসা

স্টাফ রিপোর্টার : রাতারাতি ধনী বনে যাওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষদের আকৃষ্ট করে আসছে মাল্টি-লেভেল মার্কেটিং-এমএলএম কোম্পানিগুলো। এতে গেল দুই যুগ ধরে প্রতারণার স্বীকার হয়েছে লাখ লাখ মানুষ। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দেশের সর্ববৃহৎ এমএলএম কোম্পানি ডেসটিনি-২০০০ বন্ধ করে দেয় সরকার।

তবে গেল কয়েকবছরে এক ডেসটিনি ভেঙে গড়ে উঠেছে শতাধিক এমএলএম কোম্পানি। এসব কোম্পানির প্রলোভন থেকে সাধারণ মানুষদের বাঁচাতে ‘মাল্টি-লেভেল মার্কেটিং কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৩’ নামে একটি আইন করে সরকার।

এ আইনে পরিষ্কার বলা হয়েছে, ‘পিরামিড সদৃশ বিক্রয় কার্যক্রম পরিচালনা করা যাইবে না। পিরামিড সদৃশ বিক্রয় কার্যক্রম অর্থাৎ এইরূপ বিপণন ব্যবস্থা বা প্রক্রিয়া যাহাতে জ্যামিতিক হারে অধিক সংখ্যক ক্রেতা সংযুক্তির শর্তে নির্দিষ্ট লভ্যাংশ বা কমিশনপ্রাপ্তির বা প্রদানের প্রত্যাশায় বা প্রতিশ্রুতিতে অগ্রিম ফি প্রদানপূর্বক অংশগ্রহণ করিতে হয় এমন কোনো ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করা যাইবে না।’

এ আইনকে সামনে রেখে এমএলএম কোম্পনিগুলো বন্ধে উদ্যোগ নেয় সরকার। কিন্তু আইনের বেড়াজাল থেকে বাঁচতে কোম্পানিগুলো সুকৌশলে অনলাইন মার্কেটিং পদ্ধতির সঙ্গে মিলিয়ে পণ্য বিক্রয় করতে শুরু করে।

তবে তারা দাবি করে, এটা এমএলএম কোম্পানি নয়। অথচ তারা পণ্যের ডিরেক্ট সেলিং পদ্ধতি অনুসরণ করলেও তা প্রত্যক্ষভাবে পিরামিড আকৃতির বিক্রয় কার্যক্রমেই পরিচালিত হচ্ছে। পরবর্তীতে বিষয়টি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নজরে আসলে কোম্পানিগুলোকে আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এ ব্যবসা বন্ধের নির্দেশনা দিয়ে দফায় দফায় চিঠি দেয়।

পরবর্তীতে কোম্পানিগুলো আদালতে রিট করলেও আদালত এ সংক্রান্ত ব্যবসার অনুমোদন দেয়ার বিষয়ে কোন নির্দেশনা দেয়নি। অথচ দেদারসে এসব এমএলএম কোম্পানি তাদের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।

রাজধানীসহ সারাদেশে এ ধরনের ব্যবসার নামে প্রতারণামূলক কাজে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে এমএলএম কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ আইন অনুসারে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য দেশের সকল জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার বরাবর নির্দেশনাপত্র প্রেরণ করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মিরাজুল ইসলাম উকিল স্বাক্ষরিত এ চিঠিতে এমন এমএলএম ব্যবসার নামে কেউ কোনো প্রতারণামূলক কাজ করলে বা প্রণীত আইনে কোনো অপরাধ করলে তাদের বিরুদ্ধে মাল্টি লেভেল মার্কেটিং কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ আইন অনুসারে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে কয়েকদফা অনুরোধ করা হয়। অর্থাৎ এ ধরনের নির্দেশনা দিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় একাধিক চিঠি দেয়।

এরপরও খোদ রাজধানীতে সরেজমিন দেখা গেছে, নয়াপল্টনে নোভেরা প্রডাক্ট লিমিডেট, মতিঝিলে আমার বাজার ডটকম, বিজয়নগরে ভিশন ২১, স্বাধীন অনলাইন পাবলিক লিমিটেড, এমএক্সএন মর্ডান হারবাল ফুড লিমিটেড, লাক্সার গ্লোবাল নেটওয়ার্কিং লিমিটেড, ড্রিম টুগেদার লিমিটেড, ইনফিনিটি নেটওয়ার্কিং লিমিডেট, দি ক্লাসিক লাইভ বিডি প্রাইভেট লিমিডেট নামে অসংখ্য কোম্পানি সরাসরি কোনো প্রকার অনুমোদন ছাড়াই অবৈধভাবে এ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। এভাবে ঢাকাসহ সারাদেশে অশংখ্য এমএলএম কোম্পানি এ ধরনের ব্যবসা করছে বলে জানা গেছে।

এসব কোম্পানি থেকে কেউ নির্দিষ্ট অংকের টাকার একটি পণ্য-প্যাকেজ ক্রয় করলে তাকে বানানো হচ্ছে কোম্পানির একজন ‘অংশীদার’। একজন নতুন ক্রেতা সংগ্রহ করলে তিনি পাবেন নির্দিষ্ট অংকের টাকা কমিশন। তিনি আবার দু’জনকে কনভিন্স করতে পারলে সেখানেও মিলবে কমিশন। এরপর প্রতি ধাপে পণ্য বিক্রয়ের ওপর মিলবে কমিশন।

একজনের মাধ্যমে সাতজন ক্রেতা যুক্ত হলে তিনি হবেন একজন ‘এক্সিকিউটিভ’।  সে সঙ্গে পাবেন ভারতসহ বিভিন্ন দেশ ভ্রমণের সুযোগ। এভাবে ধাপে ধাপে মালয়েশিয়া ভ্রমণ, ল্যাপটপ উপহার, ফ্ল্যাট ভাড়া, হজের সুযোগ, গাড়ি-বাড়ি ও কোম্পানির ভাইস প্রেসিডেন্ট পদমর্যাদাসহ অঢেল সুযোগ-সুবিধা।

শুধু তাই নয়, এভাবে কারো উদ্যোগে কোম্পানির ক্রেতা সংখ্যা বাড়তে থাকলে ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকবে আয়, যাকে বলা হচ্ছে রিয়্যালিটি ইনকাম বা স্থায়ী আয়ের ব্যবস্থা। এছাড়া কোম্পানি ভেদে বিক্রির পর আট ধাপে ছয় লাখ ৩৩ হাজার টাকা পেয়ে যাবেন ম্যাচিং সেল কমিশন হিসেবে যা চিত্রে অংকিত হলে পিরামিডের আকৃতি ধারণ করে।

পিরামিডের আকৃতির এই পদ্ধতির ব্যবসায় লোভনীয় প্রলোভনে কোম্পানিগুলোর সঙ্গে প্রতিদিন যুক্ত হচ্ছে শত শত সরলমনা মানুষ। নতুনভাবে আগতদের বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত করে দীর্ঘমেয়াদে ট্রেনিং করিয়ে মগজ ধোলাইয়ের কাজ করছে কোম্পানিগুলোর প্রোডাক্ট ট্রেনিং ডিপার্টমেন্টের কর্তাব্যক্তিরা।

কোনো ধরনের লাইসেন্স ছাড়াই এবং সরকারের নিষেধ সত্ত্বে এ ধরনের ব্যবসা কেন পরিচালনা করছেন এমন প্রশ্নের যৌক্তিক কোনো উত্তর মেলেনি নোভেরা প্রডাক্টের ম্যানেজিং ডাইরেক্টর মো. কামরুল ইসলামের কাছে।

এসব অবৈধ এমএলএম কোম্পানির কার্যক্রম ঠেকাতে কি ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সরকার- এমন প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এ বিভাগের দায়িত্বে থাকা উপ-সচিব মিরাজুল ইসলাম উকিল বলেন, আমরা এ বিষয়ে দফায় দফায় দেশের সব জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারদের চিঠি দিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশনা দিয়েছি। এছাড়াও এমন অভিযোগের প্রেক্ষিত ৩২টি কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা করেছি। সবগুলো মামলা এখন বিচারাধীন রয়েছে। ‘এছাড়াও যখন কোনো ব্যক্তির অভিযোগ পাই বা গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয় তখন সাথে সাথে সংশ্লিষ্টদের আমরা ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দেই’ যোগ করেন তিনি।

কোম্পানিগুলোতে সরেজমিনে দেখা গেছে, এখানে নিয়োজিত অধিকাংশ কর্মী আগে ডেসটিনি-২০০০ এর কর্মী হিসেবে কাজ করতো। এমএলএম বিষয়ে তাদের রয়েছে বেশ অভিজ্ঞতা। ডেসটিনির নেটওয়ার্ক ও পলিসি কাজে লাগিয়ে তারা চালাচ্ছে এ ব্যবসা।

এদিকে আমার বাজার ডটকমে অফিসে গিয়ে সাংবাদিক পরিচয় দিতেই মো. সাদেক হোসেন নামের এক ব্যক্তি পরিচয় দেন তিনি ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা। আমার বাজার নিয়ে প্রতিবেদন করে কোন কাজ হবে না বলে প্রতিবেদককে বলেন এই ব্যক্তি।

তিনি আমার বাজারে কোন পদে আছেন এমন প্রশ্নের জবাবে সাদেক হোসেন কিছু বলতে রাজি হননি। একপর্যায়ে ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ যুবলীগ সভাপতি ইসমাইল হোসেন সম্রাটের নাম উচ্চারণ করে বলেন, তিনি আমাদের নানাভাবে সহায়তা করেন।

কিন্তু পরবর্তীতে ইসমাইল হোসেন সম্রাটের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি সাফ জানিয়ে দেন, এ ধরনের কোনো কোম্পানির সঙ্গে তার কোনো ধরনের সম্পর্ক নেই।

পদক্ষেপ নেয়ার পরেও আইন মানছে না কেন- এমন প্রশ্নের জবাবে ঢাকার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. শাহিদুজ্জামান বলেন, আমরা এনিয়ে অভিযান চালিয়েছি। কিছু কোম্পানির মামলা আদালতে পেন্ডিং। আর কিছু কোম্পানি নিবন্ধনের জন্য সরকারের কাছে আবেদন করেছে।

তিনি বলেন, কোম্পানিগুলোর লোভনীয় অফারে সাধারণ মানুষ বেশি ঝুঁকে পড়ে। ফলে খুব দ্রুত এসব ব্যবসা বন্ধ করা কঠিন। তবে আমরা এটা নিয়ে নিয়মিত তদারকি করছি। আমরা জেলা পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের পরিকল্পনা নিয়েছি।