রাজধানীর শরবত কতটা নিরাপদ?

: মাথার ওপরে সূর্যের কিরণ। বাইরে বের হলেই শরীর থেকে বের হয় চিকচিকে ঘাম। কখনোবা প্রচণ্ড গরমে ওষ্ঠাগত হয় প্রাণ। এ সময় ঘর্মাক্ত ও পিপাসার্ত মানুষের তৃষ্ণা মেটাতে রাজধানীর প্রায় প্রতিটি রাস্তার পাশে, অলিতে-গলিতে দেখা মেলে বরফ শীতল লেবুর শরবত। বিভিন্ন ফলের জুস আর লাচ্ছি। কিন্তু রাজধানীতে বিক্রি হওয়া এসব পানীয় ঠিক কতটা নিরাপদ?

ঢাকার কারওয়ান বাজার এলাকায় লেবুর বরফ মেশানো শরবত বিক্রি করেন মোখলেসুর রহমান। এই বরফ কোথা থেকে আসছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এই বরফ কারওয়ান বাজার থেকে নিয়ে আসি। বরফের এক কোয়ার্টার ৪০ টাকা করে কিনি। সবাই এই শরবতই খায়। কোনো সমস্যা হয় না।

কারওয়ান বাজারের মাছ বাজারের পাশেই বেশিরভাগ বরফ কারখানার অবস্থান। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ফার্মগেট, শাহবাগ, মোহাম্মাদপুর এসব এলাকায় মাছের বরফই ব্যবহৃত হচ্ছে পানীয় তৈরিতে। যা স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ক্ষতিকর।

ক্রেতা সেজে একটি বরফ কারখানায় ঢুকে দেখা গেল এই বরফ তৈরিতে ব্যবহৃত হচ্ছে সরাসরি ওয়াসার পানি। সেই মাছের জন্য ব্যবহৃত বরফগুলোই মানুষের খাবার পানীয় তৈরিতে ব্যবহার করছেন বিক্রেতারা।

সরকারিভাবে ঢাকায় জন্য বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের একমাত্র দায়িত্বপ্রপ্ত কর্তৃপক্ষ ঢাকা ওয়াসা। কিন্তু ময়লা, দুর্গন্ধ এবং রোগজীবাণুর শঙ্কায় ওয়াসার পানি সরাসরি কল (ট্যাপ) থেকে পান করা হয় না। কিন্তু সেই ওয়াসার পানি দিয়েই বরফ তৈরি হচ্ছে। যা বিভিন্ন পানির মাধ্যমে রাজধানীবাসীর দেহে প্রবেশ করছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টি.এস.সি এলাকায় দেখা গেল, বেশ কিছু লেবুর শরবতের দোকান। সেখানে দাঁড়িয়ে পানীয় পান করছেন শিক্ষার্থীরা। রেদওয়ান নামে এক শিক্ষার্থী জানালেন, প্রচ- গরমের তাপদাহে এই শরবত তৃষ্ণা মেটায়, বাড়তি প্রশান্তি দেয়। কিন্তু এই বরফ নিরাপদ কিনা সেটা আমার জানা নাই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য ও পুষ্টি বিভাগের অধ্যাপক ড. নাজনীন শাহিন বলেন, যেসব শরবতে মাছের তৈরি বরফ ব্যবহার করা হচ্ছে, তা শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। তাছাড়া বিভিন্ন ধরনের জীবাণু থাকতে পারে।
অধ্যাপক ড. নাজমা শাহিন বলেন, অনেকেই বলেন যখন পানিকে বরফে রূপান্তর করা হয়, তখন শূন্য তাপমাত্রার কারণে এমনিতেই অনেক ব্যাকটেরিয়া মারা যায়। কিন্তু আসলে কতগুলো ব্যাকটেরিয়া আছে যেগুলো কম তাপমাত্রায়ও নিজেদের বাঁচিয়ে রাখতে পারে। তাই বরফ তৈরিতে ব্যবহৃত পানিতে যদি ব্যাকটেরিয়া থাকে তাহলে সেগুলে মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে।

তিনি আরও বলেন, যে সকল এলাকার পানিতে আর্সেনিক পাওয়া যায়, সেগুলো দিয়েও মাছের জন্য বরফ তৈরি করা হয়। মাছের জন্য সেটা কোনো বিষয় নয়। কিন্তু সমস্যাটা হলো যদি এই বরফ মানুষের বিভিন্ন পানীয় তৈরিতেও ব্যবহার করা হয়, তাহলে সেটা মানবদেহের ক্ষতি সাধন করতে পারে।

এসব পানীয় পান করলে কী ধরনের ক্ষতি হতে পারে- এমন প্রশ্নের জবাবে নাজমা শাহিন বলেন, যদি সরাসরি ওয়াসার পানি ব্যবহার করা হয়ে থাকে তাহলে সমস্যা হতে পারে। জীবাণুর কারণে টাইফয়েড, জন্ডিস হতে পারে এবং বিভিন্ন হেভি মেটালের কারণে ক্ষতির পরিমাণ বাড়তে পারে।

তিনি বলেন, খাবারের জন্য যেই বরফটা তৈরি করা হয়, সেটা অবশ্যই নিরাপদ হতে হবে। মাছের জন্য যে বরফ, সেটা খাবারে ব্যবহার করা যাবে না।