আশুরা ঃ দাম্ভিকতার পরাজয় ও বিশ্বাসীদের বিজয়

মুহাম্মদ আবদুল কাদের

আশুরা কি এবং কেন এই দিনটি এত গুরুত্বপূর্ণ, সেই সম্পর্কে আমাদের অনেক মুসলিম ভাইদের মাঝে সঠিক এবং স্বচ্ছ কোন ধারণা নেই। আশুরা নিয়ে পত্রিকাতে বিশেষ সংখ্যা বের করা হয় আর তাতে ঘুরে ফিরে কারবালার কাহিনীটাই প্রধান প্রতিপাদ্য বিষয় হিসেবে লক্ষ্য করা যায়। আশুরা এমন একটি দিন যেই দিনটি রাসূলও(সাঃ)গুরুত্ব দিয়েছেন কিন্তু একটি বিষয় লক্ষ্যনীয় সেই সময় কিন্তু কারবালার ঘটনাটি ঘটেনি। অর্থাৎ, কারবালার ঘটনা আশুরার সাথে সম্পৃক্ত কোন বিষয় নয়। একটা বিষয় স্পষ্ট করে নেয়ার প্রয়োজন মনে করছি। তা হলো- কারবালার নির্মম ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছে হিজরী ৬৬১ সনে। অর্থাৎ রাসূল (স) এর ওফাতের প্রায় অর্ধ শতাব্দী পরে। তাই আশুরার দিনের আমলের সাথে কারবালার প্রান্তরের কোন যোগসূত্র নেই। কারণ এ ব্যাপারে প্রতিটি মুসলিম মাত্রই অবহিত যে, রাসূল (স) এর ওফাতের পর শরীয়তে আর নতুন কোন বিধান সংযোজন বা বিয়োজনের বিন্দুমাত্র অবকাশ নেই।তাহলে প্রকৃতপক্ষে কোন ঘটনাটি আশুরার সাথে সম্পৃক্ত? তবে বিভিন্ন হাদীস ও ইতিহাসের আলোকে বুঝা যায় যে আশুরার সাথে একাধিক বিষয় জড়িত।

আশুরার আসল তাৎপর্য হলো মূসা (আ.)-এর বিজয়:

“হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সাঃ) যখন মদীনায় এলেন তখন তিনি লক্ষ্য করলেন ইহুদীরা আশুরা’র দিনে রোযা পালন করছে। তখন রাসূল (সাঃ) তাদের জিজ্ঞেস করলেনঃ এই দিনে রোযা রাখার তাৎপর্য কি? তারা বললোঃ এই দিনটির অনেক বড় তাৎপর্য রয়েছে, আল্লাহ মূসা আলাইহিস সালাম ও তাঁর অনুসারীদের বাঁচিয়ে ছিলেন এবং ফেরাউন ও তাঁর অনুসারীদের ডুবিয়ে ছিলেন এবং মূসা আলাইহিস সালাম এই ঘটনার কৃতজ্ঞতা স্বরূপ রোযা রাখতেন আর তাই আমরাও রাখি। এরপর রাসূল (সাঃ) বললেনঃ তোমাদের চেয়ে আমরা মূসা আলাইহিস সাল্লামের আরো বেশি নিকটবর্তী সুতরাং তোমাদের চেয়ে আমাদের রোযা রাখার অধিকার বেশি। রাসূল (সাঃ) আশুরা’র রোযা রাখতেন এবং অন্যদেরকে এই রোযা রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন” (মুসলিম: ২৫২০)

হাদীস থেকে যা জানা গেলো:

এই হাদীসের আলোকে আমরা একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারি আর তা হল, আশুরা’র মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হলো ফেরাউনের বিরুদ্ধে মূসা আলাইহিস সাল্লামের বিজয়। এই দিন (১০ মহররম) আল্লাহ তা’আলা নাস্তিক ফেরাউনের বিরুদ্ধে মূসা আলাইহিস সাল্লামকে বিজয় দান করেছিলেন। যে ঘটনার বিবরণ আমরা মহাগ্রন্থ আল কুরআনে পাই মহান আল্লাহ ‘’ফেরাউন বলল, হে হামান, তুমি আমার জন্যে একটি সুউচ্চ প্রাসাদ নির্মাণ কর, হয়তো আমি পৌঁছে যেতে পারব। আকাশের পথে, অতঃপর উঁকি মেরে দেখব মূসার আল্লাহকে। বস্তত্বঃ আমি তো তাকে মিথ্যাবাদীই মনে করি। এভাবেই ফেরাউনের কাছে সুশোভিত করা হয়েছিল তার মন্দ কর্মকে এবং সোজা পথ থেকে তাকে বিরত রাখা হয়েছিল। ফেরাউনের চক্রান্ত ব্যর্থ হওয়ারই ছিল।‘’(সূরা গাফের: ৩৬-৩৭) আল্লাহ আরো “ফেরাউনের সম্প্রদায় এবং তাদের পূর্ববর্তীদের ধারা অনুযায়ী তারা আমার আয়াতসমূহকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে। ফলে তাদের পাপের কারণে আল্লাহ তাদেরকে পাকড়াও করেছেন আর আল্লাহর আযাব অতি কঠিন।” (সূরা ইমরানঃ ১১)

মহান আল্লাহ অন্যত্র বলেছেন “আমি ফেরাউনকে আমার সব নিদর্শন দেখিয়ে দিয়েছি, অতঃপর সে মিথ্যা আরোপ করেছে এবং অমান্য করেছে।”(সূরা ত্বহাঃ ৫৬)“ফেরাউন সে ছিল সীমালংঘনকারীদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয়”। (সূরা দুখানঃ ৩১) ফেরাউন দাম্ভিকতার সাথে বলেছিল “ফেরাউন বলল, বিশ্বজগতের পালনকর্তা আবার কি?” (সূরা আশ শোয়ারাঃ ২৩)  যার উত্তরে মূসা আলাইহিস সাল্লাম বলেছিলেন,“মূসা (আ.) বললেন, তিনি নভোমন্ডল, ভূমন্ডল ও এতদুভয়ের মর্ধবর্তী সবকিছুর পালনকর্তা যদি তোমরা বিশ্বাসী হও” (সূরা আশ শোয়ারাঃ ২৪)

যদি তোমরা বিশ্বাসী হও- বিশ্বাস করাটা মানুষের স্বভাবজাত একটা বিষয়। বিশ্বাস ব্যতীত সে বেচেঁই থাকতে পারবে না। যেমনঃ সে মানুষকে মানুষ বলে বিশ্বাস করে, গরুকে গরু হিসেবে বিশ্বাস করে, গাড়িকে গাড়ি হিসেবে বিশ্বাস করে অর্থাৎ মানুষকে বিশ্বাস করতেই হবে যদি সে বিশ্বাস না করে তাহলে সে মানুষই নয়।

ফেরাউনও আল্লাহকে বিশ্বাস করতো:

যদিও সে দাম্ভিক, অহংকারী ছিল কিন্তু একদম ভিতরে সে আল্লাহকে অস্বীকার করতে পারেনি। যার প্রমাণ আমরা পাই নিম্নোক্ত আয়াত থেকেঃ  “আর বনী ইসরাঈলকে আমি পার করে দিয়েছি নদী। তারপর তাদের পশ্চাদ্ধাবন করেছে ফেরাউন ও তার সেনাবাহিনী, দুরাচার ও বাড়াবাড়ির উদ্দেশ্যে। এমনকি যখন তারা ডুবতে আরম্ভ করল, তখন বলল, এবার বিশ্বাস করে নিচ্ছি যে, কোন মা’বুদ নেই তাঁকে ছাড়া, যাঁর উপর ঈমান এনেছে বনী ইসরাঈলরা। বস্তুতঃ আমিও তাঁরই অনুগতদের অন্তর্ভুক্ত।” (সূরা ইউনুসঃ ৯০) দাম্ভিক, অহংকারী ফেরাউনের এই আকুতি তখন আর গ্রহণ করা হয়নি কারণ এর আগে তাকে অনেক সুযোগ দেওয়া হয়েছিল কিন্তু সে দাম্ভিকতার সাথে শুধু অস্বীকরই করেনি বরং যারা তাকে সত্যের দাওয়াত দিয়েছিল তাদের হত্যা করার জন্যও সে প্রচেষ্টা চালিয়েছিল। ফেরাউনের এই কথার জবাবে আল্লাহ তা‘আলা বলেছেনঃ “এখন একথা বলছ! অথচ তুমি ইতোপূর্বে না-ফরমানী করেছিলে এবং পথভ্রষ্টদেরই অন্তর্ভুক্ত ছিলে।” (সূরা ইউনুসঃ ৯১)

ফেরাউনের লাশ সংরক্ষণ করার কারণ:

আল্লাহ তা‘আলা ফেরাউনের মৃতদেহকে সংরক্ষণ করে রেখেছেন যাতে করে যারা আল্লাহর আয়াতসমূহকে অবিশ্বাস করে তাদের জন্য নিদর্শন হিসেবে।“আজ আমি তোমার দেহকেই বাঁচিয়ে রাখব, যাতে করে তুমি (তোমার এ দেহ) পরবর্তী (প্রজন্মের লোকদের) জন্যে একটা নিদর্শণ হয়ে থাকতে পারে,অবশ্য অধিকাংশ মানুষই আমার (এসব) নিদর্শনসমূহ থেকে সম্পূর্ণ বেখবর। (সূরা ইউনুসঃ ৯২) নিদর্শণ দেখে মানুষ বুঝতে পারে আসল ঘটনা কি। যেমনঃ একটি খোলা মাঠে গরুর গোবর দেখে একদম অশিক্ষিত মানুষও বিশ্বাস করে এই মাঠে গরু ঘাস খেতে আসে। মহান আল্লাহ তা’আলা নিদর্শণসমূহের বর্ণনা দিয়ে খুব সহজ করে মানুষকে বুঝিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলার সৃষ্টির নিদর্শন দেখে আল্লাহর অস্তিত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। ফেরাউনের বিরুদ্ধে মূসা আলাইহিস সাল্লামের বিজয়কে আল্লাহ তাআলা একটি নিদর্শন হিসেবে রেখে দিয়েছেন যাতে করে মানুষ এথেকে শিক্ষা গ্রহণ করে। অবশ্য অধিকাংশ মানুষই আমার (এসব) নিদর্শনসমূহ থেকে সম্পূর্ণ (অজ্ঞ) বেখবর।

হযরত ইব্রাহীম (আ.)-এর বিজয় ও দাম্ভিক নমরুদের পরাজয়

সমস্ত সম্প্রদায় ও নমরুদ সম্মিলিতভাবে এই সিদ্ধান্ত নিল যে, তাকে অগ্নিকুন্ডে নিক্ষেপ করা হোক। ঐতিহাসিক রেওয়ায়েতসমূহে বর্ণিত আছে, একমাস পর্যন্ত সমগ্র শহরবাসী জ্বালানি কাঠ ইত্যাদি সংগ্রহ করতে থাকে। এরপর তাতে অগ্নি সংযোগ করে সাত দিন পর্যন্ত  প্রজ্জ্বলিত থাকে। শেষ পর্যন্ত অগ্নি শিখা আকাশচুম্বী হয়ে পড়ে। তখন তারা ইব্রাহীম (আঃ)কে এই জ্বলন্ত অগ্নিকুন্ডে নিক্ষেপ করার উদ্যোগ গ্রহণ করল। কিন্তু অগ্নিকুন্ডের নিকটে যাওয়াই সমস্যা হয়ে দাঁড়াল। অগ্নির অসহ্য তাপের কারণে তার ধারেকাছে যাওয়ার সাধ্য কারো ছিল না। শয়তান ইব্রাহীম (আঃ)কে মিনজালিকে (এক প্রকার নিক্ষেপণ যন্ত্র) রেখে নিক্ষেপ করার পদ্ধতি বাতলে দিল। যে সময় ইব্রাহীম (আঃ) মিনজালিকের মাধ্যমে অগ্নি সমুদ্রে নিক্ষিপ্ত হচ্ছিলেন। তখন ফেরেশতারা চিৎকার করে উঠল, ইয়া রব, আপনার দোস্তর একি বিপদ। আল্লাহ তাদের সবাইকে ইব্রাহীম (আঃ) এর সাহায্য করার অনুমতি দিলেন। ফেরেশতাগণ সাহায্য করার জন্য ইব্রাহীম (আঃ)কে জিজ্ঞেস করলে তিনি জবাব দিলেন, আল্লাহ তা’আয়ালাই আমার জন্য যথেষ্ট। অতঃপর আল্লাহ তাকে রক্ষা করেছেন। এই ঘটনা পবিত্র কুরআনে আল্লাহ এভাবে বর্ণনা করেছেন, “কাফেররা বলল একে (ইব্রাহীম আঃ) পুড়িয়ে দাও এবং তোমাদের উপাস্যদের সাহায্য কর, যদি তোমরা কিছু করতে চাও। আমি (আল্লাহ) বললাম, হে অগ্নি তুমি ইব্রাহীমের উপর শীতল ও নিরাপদ হয়ে যাও। তারা ইব্রাহীমের বিরুদ্ধে ফন্দি আঁটতে চাইল অতঃপর আমি তাদেরকেই সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্থ করেছিলাম। (সূরা আম্বিয়া আয়াত ৬৮-৭০)।

রেওয়ায়েতসমূহে আছে ইব্রাহীম (আঃ) এই অগ্নিকুন্ডে সাতদিন ছিলেন। তিনি বলতেন, এই সাতদিন আমি যে সুখ ভোগ করেছি, সারাজীবন তা ভোগ করিনি (মাযহারী)। আল্লাহর কাছে যে কোন বিপদের সময় সাহায্য চাইলে তিনি তার প্রিয় বান্দাদেরকে এভাবেই সাহায্য করেন। সুতরাং আমাদের কর্তব্য, আল্লাহর কোন সৃষ্টি জীবনের কাছে সাহায্য না চেয়ে সরাসরি আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থণা করা।

আশুরা হচ্ছে বিশ্বাসীদের বিজয় দিবস

আজ আমাদের দিকে লক্ষ্য করলেই একথার তাৎপর্য একদম পরিস্কার ও স্পষ্ট হয়ে উঠে। আশুরার প্রকৃত তাৎপর্য হলো আল্লাহতে অবিশ্বাসী দাম্ভিকতার পরাজয় আর আল্লাহতে বিশ্বাসীদের বিজয়ের দিন অর্থাৎ সংক্ষিপ্ত আকারে বললে বলা যায় আশুরা হচ্ছে বিশ্বাসীদের বিজয় দিবস। অথচ আশুরার এই প্রকৃত তাৎপর্য থেকে আমরা সম্পূর্ণ (অজ্ঞ ও) বেখবর হয়ে রয়েছি। আশুরার এই ঘটনা থেকে প্রায় তিন হাজার বছর পর কারবালার ঘটনা সংগঠিত হয়েছিল। কিন্তু না জানার কারণে আশুরা আসলেই আমরা কারবালার ঘটনা বিশ্লেষণ করতে থাকি। অথচ এই দিনটি যে বিশ্বাসীদের বিজয় দিবস আর দাম্ভিকতার পতন দিবস সে সম্পর্কে আমাদের কোন বোধদয়ই হয় না।

-সহকারী প্রধান শিক্ষক

স্বর্ণকলি আদর্শ বিদ্যালয়, সাভার, ঢাকা।