বিশুদ্ধভাবে ও সঠিক পন্থায় কোরআন পাঠ

১১০. বলে দাও, তোমরা আল্লাহ বা রহমান যে নামেই ডাকো না কেন, সব সুন্দর নাম তো তাঁরই। নামাজে তোমাদের স্বর খুব উচ্চ বা অতিশয় ক্ষীণ কোরো না। বরং এ দুইয়ের মধ্যপথ অবলম্বন করো। [সুরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ১১০ (তৃতীয় পর্ব)]

তাফসির : আলোচ্য আয়াতের মূল কথা হলো, ‘রাহমান’ ও ‘রাহিম’সহ আল্লাহর আছে সুন্দর সুন্দর নাম। যেকোনো নামে তাঁকে ডাকা যায়। নামাজে কোরআন তিলাওয়াত করার সময় মধ্যপন্থা অবলম্বন করা উচিত।

এ আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার কারণ সম্পর্কে ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন যে মক্কায় রাসুল (সা.) আত্মগোপন করে থাকতেন। যখন তিনি সাহাবিদের নামাজ পড়াতেন, তখন শব্দ একটু উঁচু করতেন। মুশকিরা তিলাওয়াত শুনে কোরআন ও আল্লাহ তাআলাকে গালিগালাজ করত। তাই মহান আল্লাহ এ নির্দেশনা দিয়েছেন যে তোমার আওয়াজ এত উঁচু কোরো না যে মুশরিকরা তা শুনে গালিগালাজ করে। আর এত আস্তেও পোড়ো না যে সাহাবি তা শুনতেই না পায়। (বুখারি, নামাজ অধ্যায়)

এ বিষয়ে আরো একটি ঘটনা হাদিসের কিতাবে পাওয়া যায়। কোনো এক রাতে মহানবী (সা.) আবু বকর (রা.)-এর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি দেখলেন, আবু বকর (রা.) খুব মৃদু আওয়াজে নামাজ পড়ছেন। অতঃপর ওমর (রা.)-এর কাছে গেলেন। দেখলেন তিনি উঁচু শব্দে নামাজ পড়ছেন। তিনি তাঁদের উভয়কে এর কারণ জিজ্ঞেস করেন। আবু বকর (রা.) জবাবে বলেন, আমি যাঁর সঙ্গে মোনাজাতে ব্যস্ত ছিলাম, তিনি আমার শব্দ শুনছিলেন (তাই আমি আস্তে আস্তে তিলাওয়াত করেছি)। আর ওমর (রা.) জবাবে বলেন, আমার উদ্দেশ্য ঘুমন্তদের জাগানো এবং শয়তানকে দূরীভূত করা। উভয়ের যুক্তি শোনার পর মহানবী (সা.) আবু বকর (রা.)-কে বললেন, তুমি তোমার শব্দ একটু উঁচু করো। আর ওমর (রা.)-কে বললেন, তুমি তোমার শব্দ একটু নিচু করো। (আবু দাউদ ও তিরমিজি)

প্রত্যেক নর-নারীর ওপর কোরআন এতটুকু সহিহ-শুদ্ধভাবে পড়া ফরজে আইন, যার দ্বারা নামাজ আদায় হয়ে যায়। তাই কমপক্ষে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের জন্য যে সুরাগুলোর প্রয়োজন, সেগুলো বিশুদ্ধভাবে শিখে নেওয়া জরুরি। (মুকাদ্দামায়ে জাজারিয়া, পৃষ্ঠা ১১)

আলী (রা.) বলেছেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) তোমাদের নির্দেশ দিয়েছেন—তোমরা প্রত্যেকেই এমনভাবে কোরআন পড়ো, যেভাবে তোমাদের শেখানো হয়েছে।’ (ফাজায়েলুল কোরআন, কাসেম ইবনে সাল্লাম, পৃষ্ঠা ৩৬১)

অর্থাৎ রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবায়ে কেরামকে যেভাবে কোরআন শিক্ষা দিয়েছেন এবং পরবর্তী উম্মতকে সাহাবারা যেভাবে শিক্ষা দিয়েছেন, সেভাবেই কোরআন পড়তে হবে। তাই প্রতিটি হরফ স্বীয় উচ্চারণস্থল থেকে যথাযথভাবে উচ্চারণ করে মদ-গুন্নাহসহ আদায় করে কোরআন পড়তে হবে।

নামাজের কেরাতে অর্থ বিকৃত হয়ে যায়, এমন ভুল পড়লে নামাজ নষ্ট হয়ে যাবে। সাধারণ ভুল, যার দ্বারা অর্থ একেবারে বিগড়ে যায় না, তাতে নামাজ নষ্ট হবে না। (ফাতাওয়া কাজিখান : ১/৬৭)

কিন্তু সুরা-কেরাত ও নামাজের তাসবিহ ইত্যাদি শুদ্ধ না হওয়া পর্যন্ত নামাজ ছেড়ে দেওয়ার অনুমতি নেই। সুরা-কেরাতও শুদ্ধ করতে থাকবে এবং নামাজও আদায় করতে থাকবে, তবে এ ধরনের লোকেরা শুদ্ধ পাঠকারী ব্যক্তির ইমামতি করবে না। (হিদায়া : ১/৫৮, জাওয়াহিরুল ফিকহ : ১/৩৩৯)

গ্রন্থনা : মাওলানা কাসেম শরীফ