স্মৃতিতে কমিশনার তৌহিদ! -মতিউর রুহমান লিটু

 

যুক্তরাষ্ট্র থেকে: ৯ সেপ্টেম্বর 2018 পটুয়াখালী জেলার জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব কমিশনার তৌহিদ হৃদযন্ত্রের স্পন্দন বন্ধ হয়ে আচমকা বরিশাল শেরে বাংলা মেডিকেল হাসপাতালে সবাইকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেলেন; একই সময়ে চলে গেলেন পটুয়াখালী জেলার আরেক সাবেক  ছাত্রদল নেতা সবার প্রিয় টুটুল ভাই। (ইন্না লিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাহে রাজেউন!)

 

সংবাদটি প্রথম দেখতে পেলাম পটুয়াখালী সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র মোস্তাক আহমেদ পিনু মিয়ার ফেইজবুক পেইজে। সংবাদটি দেখেই চমকে উঠলাম! তাকে কল দিলাম, বাংলাদেশে গভীর রাত, তাকে পেলাম না. বড্ড জানতে ইচ্ছা করছিলো এই কি সেই তৌহিদ ভাই?  জানার জন্য এবার কল দিলাম সাবেক ভারপ্রাপ্ত মেয়র শ্রদ্ধেয় বড় ভাই আবু জাফর ভাইকে, তাকে না পেয়ে কল দিলাম আজাদ ভবনের মনিরুল হক রাহুল ভাইকে, তাকেও পেলাম না, কল দিলাম পটুয়াখালী যুবদলের সাবেক নেতা সেন্টু ভাইকে। এরা সবাই এখন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী, আমারই মতন ব্য়স্ত জীবনের অধিকারী!

 

কাউকে না পেয়ে একাকী বসে আছি তাদের কল ব্যাকের অপেক্ষায়! মন মানছিল না তাই আবার কল দিলাম রাহুল ভাইকে, নিউইয়র্ক পুলিশ ডিপার্টমেন্টে চাকুরী করেন তিনি. এবারে কাজের মধ্যেই কল রিসিভ করলেন, বললেন হ্যা এই সেই তৌহিদ; যিনি আজ থেকে ২৫ বছর আগে পটুয়াখালী সরকারী বিশ্ববিদ্য়ালয় কলেজ ছাত্রদলের রাজনীতিতে বড় ভাইয়ের মতো আগলে রাখতেন আমাকে! রাহুল ভাইয়ের মুখে কনফার্ম হয়ে নিজেকে সামলাতে পারলাম না, দু চোখ বেয়ে পানি বেরিয়ে এলো, কিছু না বলেই রাহুলভাইয়ের লাইনটা কেটে দিলাম. একটা অব্যক্ত কষ্ট অনুভব করতে লাগলাম!

জানিনা শেষ অবদি আমার কথা তৌহিদ ভাইয়ের মনে ছিল কিনা| কিন্তু আমি কখনোই ভুলি নাই, পঁচিশ বছর আগের স্মৃতি হলেও  ভুলতে পারি নাই! ছাত্রদলের রাজনীতিতে তৌহিদ ভাই আর ইলিয়াস বাচ্চু ছাড়া তেমন কেওতো আমাকে ব্যাকিং দেয়নি! ছাত্রনেতা মশিউর ভাই, শাহীন ভাইয়েরাতো সিনিয়র হয়ে গিয়েছিলেন, ছাত্র সংসদ ভেঙে দেয়া হয়েছিল তাই নির্বাচিত ছাত্রনেতারা খুব একটা ক্যাম্পাসে আসতেন না. ছাত্রদল বলতে ক্যাম্পাসে তখন ইলিয়াস বাচ্চু আর তৌহিদ ভাইয়ের নেতৃত্বকেই বুঝাতো! আমরাতো তাদের হাতে গড়া কর্মী ছিলাম মাত্র-

 

কলেজে ছাত্র সংসদের মেয়াদ উর্তীর্ণ হওয়ায় প্রশাসনিক কাজে ছাত্রদের রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসাবে আমাকে ডাকা হতো।  আমি ছিলাম তখন শহীদ জিয়া ছাত্রাবাসের হোষ্টেল মনিটর। বড় কোন ছাত্রনেতা নয় তবে একজন সাচ্চা ছাত্রদল কর্মী। সাংস্কৃতিক অঙ্গনে জড়িত থাকার কারণে তৌহিদ ভাই প্রচন্ড ভালোবাসতেন আমাকে। ইলিয়াস বাচ্চু ছোট ভাইয়ের মতন আগলে রাখতেন, এদের কথা খুব মনে পরে– ইলিয়াস বাচ্চু ভাই কোথায় আছেন কেমন আছেন তাও জানিনা! প্রবাস জীবনে সবাইকে ভালবাসা যায় কিন্তু কাছে পাওয়া যায় না!

 

আজ তৌহিদ ভাইয়ের মৃত্যু সংবাদ শুনে খুব ভেঙে পরেছি, কিছুক্ষন আগে পটুয়াখালী সিটি কর্পোরেশনের সাবেক ভারপ্রাপ্ত মেয়র আবু জাফর ভাইও কল করে প্রায় কান্না বিজড়িত কণ্ঠে উনাদের মৃত্যুতে দুঃখ প্রকাশ করে রুহের মাগফেরাত কামনা করলেন।

 

কে ছিলেন সকলের প্রিয় এই তৌহিদ ভাই? জেনে নেই সাব্বির নূরের লেখনী থেকেঃ

 

প্রত্যেক শহরেই একজন -দুই জন করে নায়ক থাকে, থাকে মিস্টি হাসির রাজপুত্র। আমার শহরেও তেমনি নায়ক, রাজপু্ত্রের মত সুন্দর ছিলেন মিস্টি হাসির তৌহিদ ভাই।

আমার শহরের সর্ব কালের সেরা স্মার্ট, হ্যান্ডসাম, সবচেয়ে ফ্যাশন সচেতন ছিলেন তৌহিদ ভাই। আমি যখন ক্লাস সিক্স এ পড়ি তখন থেকেই তৌহিদ ভাই এর ভক্ত হয়ে পরি। ঔ সময় ই তৌহিদ ভাই কে দেখতাম বিখ্যাত সিলসিলা কোয়ালিটির শার্ট পরা অবস্থায়।  তৌহিদ ভাই দারুন গান গাইতেন, পটুয়াখালির স্পন্দন শিল্পী গোস্ঠীর মূল ভোকাল ছিলেন তৌহিদ ভাই।

অসাধারণ কংগো বাজাতেন। তৌহিদ ভাই এর কন্ঠে ” প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ ” সেই অমর গান টি শুনতে অসাধারণ লাগত।

“তোকে পুতুলের মত করে সাজিয়ে, সারাটা জিবন ধরে রাখবো” গানটিও খুব চমতকার গাইতেন।

 

[ ] বহু গুনের অধিকারী তৌহিদ ভাই ঘুড়ি ওড়াতে ও খুব ওস্তাদ ছিলেন। আমরা আমাদের স্কুল জীবনে তৌহিদ ভাই এর সাথে ঘুড়ি কাটা কাটি খেলতাম। আমরা ঘুড়ি ওড়াতাম লতীফ স্কুলের মাঠে, তৌহিদ ভাই ঘুড়ি ওড়াতেন লেক রোডে তার বাসার সামনে। ‘৮৪-৮৫ সালের কথা বলছি।

 

[ ] শ্লোগান মাস্টার তৌহিদ ভাইঃ স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের অকুতভয় সৈনিক ছিলেন তৌহিদ ভাই। জাতীয়তাবাদী ছাত্র দলের এই নেতা র শ্লোগানে প্রকম্পিত হত কলেজ, শহরের রাজপথ। আমরা তৌহিদ ভাইকে কাছ থেকে দেখেছি ১৯৮৮-৯০ এ যখন আমরা উচ্চ মাধ্যমিক পড়ি।

 

তৌহিদ ভাই সুযোগ পেলে হতে পারতেন বাংলা সিনেমার নায়ক। বাংলা সিনেমার নায়ক হতে না পারলেও শহরের সব মানুষের হ্রদয়ের নায়ক ছিলেন তিনি।

 

দুই দুই বার কমিশনার নির্বাচিত হন এবং বর্তমান কমিশনার ছিলেন। ছিলেন জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল পটুয়াখালি জেলার ভূতপূর্ব সভাপতি এবং বর্তমান জেলা বিএনপির স্বেচ্ছাসেবক বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন।

 

সদা হাস্যময়ী তৌহিদ ভাই আজ দুপূর ১২.৩০ মিনিটে  করে বরিশাল মেডিকেলে না ফেরার দেশে চলে গেলেন সবাইকে কাদিয়ে। বিএনপি হারালো এক ত্যাগী নেতা কে, শহর বাসি হারালো তাদের হ্রদয়ের মহা নায়ক এক রাজপুত্র কে। আর মিস্টি হাসিতে বলবেনা সাব্বির কেমন আছ?

 

পরপারে আপনি ভাল থাকুন প্রীয় তৌহিদ ভাই। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আপনাকে জান্নাত বাসি করুন এবং আপনার স্ত্রী-সন্তান দের হেফাজত করুন। আমিন।