আশুলিয়ায় সওজ’র জমি ভুয়া বরাদ্দ দেখিয়ে ৩ শতাধিক ব্যবসায়ীকে জিম্মি করে চাঁদাবাজি

আশুলিয়া ব্যুরো : আশুলিয়ায় বনায়নের নামে স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে সওজ’র জমি ভুয়া বরাদ্দ দেখিয়ে ৩ শতাধিক ব্যবসায়ী ও সওজ’র পাশর্^বর্তী জমির মালিকদের জিম্মি করে লাখ লাখ টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগ পাওয়া গেছে। চাঁদা দিতে অস্বীকারকারি ব্যবসায়ী ও পাশর্^বর্তী জমির মালিকদের দোকান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে উচ্ছেদের হুমকি দিয়েছে তারা। এতে ব্যবসায়ী ও এলাকাবাসীর মাঝে আতঙ্ক বিরাজসহ ব্যাপক উত্তেজনা দেখা দিয়েছে।

গতকাল সোমবার আশুলিয়ার নয়ারহাট এলাকার ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশর্^বর্তী ২৫তম ও ২৬তম কি.মি. বাগধনিয়া মৌজাস্থিত সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের ভূমিতে সরেজমিনে গেলে, নয়ারহাট এলাকার ব্যবসায়ী ও জমির মালিকরা আশুলিয়া থানা ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকলীগ নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ করেন।

চিহ্নিত ও নেতা-কর্মীরা হলো-আশুলিয়া থানা স্বেচ্ছাসেবক লীগ সহ-সভাপতি লেহাজ উদ্দিন, চাকলগ্রাম নিবাসী লোকমান হোসেন, আব্দুস সালামসহ অসংখ্য নেতা-কর্মীরা তাদের নামে সওজ’র জমি বরাদ্দ হয়েছে। তাই নয়ারহাট এলাকার যে সকল ব্যবসায়ীরা সওজ’র জমিতে দোকান নির্মাণ করে দীর্ঘদিন যাবৎ ব্যবসা করছেন তাদের প্রত্যেককে দোকানের ধরণ অনুযায়ী ৫০ হাজার টাকা থেকে ৫ লাখ টাকা এককালীন চাঁদা দিতে হবে মর্মে দোকানে দোকানে গিয়ে ব্যবসায়ীদের জানিয়েছেন।

এ ব্যাপারে নরসুন্দর (সেলুন ব্যবসায়ী) হরিপদ সাহা বলেন, বৃটিশ আমল থেকে বাপ-দাদারা এ ব্যবসা নিয়োজিত ছিলেন। তিনি প্রায় ৪০ বছর যাবৎ এ পেশায় নিয়োজিত রয়েছেন। কোনদিন কেউ চাঁদা দাবি করেনি। বর্তমানে লেহাজ গংরা ৫০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করেন। না দিলে দোকান চালাতে পারবো না বলে জানিয়েছেন তারা। গর্জন পীরসাব এর স্বজনরা জানান, তারা লেহাজ গংদের ৫০ হাজার টাকা চাঁদা দিয়েছেন। মেরু খাঁ দিয়েছেন ৫০ হাজার টাকা। খোকা মিয়া-৫০ হাজার টাকা প্রদান করেছেন।

স্যানেটারী ব্যবসায়ী জালাল আহমেদ বলেন, ১৫ বছর যাবৎ তিনি ব্যবসা পরিচালনা করছেন। মহাসড়ক থেকে ২ শ’ ফুট দক্ষিণে সওজ’র জমি। তার দোকানটি সওজ’র জমিতে। আশুলিয়া অঞ্চলের অন্যতম একটি হাট হলো-নয়ারহাট। ইদানিং স্বেচ্ছাসেবকলীগের থানা সহ-সভাপতি লেহাজ গংদের নেতৃত্বে কতিপয় চিহ্নিত লোক এসে ব্যবসায়ীদের কাছে জানান, দোকান রেখে ব্যবসা করতে হলে দোকান প্রতি ৬০ হাজার টাকা দিয়ে তাদের সদস্য হতে হবে। সদস্য ছাড়া ব্যবসা করতে দেয়া হবে না।

তিনি আরো বলেন, সওজ এর জমিতে রয়েছে একটি জয়কালি মন্দির। দীর্ঘ ১ শ’ বছর যাবৎ হিন্দু ধর্মাবলম্ভীদের হাজার হাজার লোক এসে নির্বিঘেœ পূজা-অর্চনায় মগ্ন থাকেন। মন্দিরকে ঘিরে নয়ারহাট এলাকার বেশকিছু এলাকা জুড়ে গড়ে ওঠেছে বিভিন্ন ব্যবসা। বড় বড় কাপড়ের দোকান, রড সিমেন্ট, কসমেটিক্স, ফলের আড়ৎ, কাঁচা বাজার, মিষ্টির দোকানসহ অসংখ্য ব্যবসা রয়েছে। এ ধরণের ৫ শতাধিক ব্যবসায়ীর নিকট লেহাজ গংরা চাঁদা দাবি করছে। অন্যথায় দোকান উচ্ছেদ করে সেখানে বনায়ন করা হবে। কারণ জমির মালিক এখন তারা।

সনাতন ধর্মের অনুসারি চরণদাসী বলেন, আমি বয়োবৃদ্ধ নারী। প্রায় ২ শত বছর পূর্ব থেকে আমার বংশের লোকেরা এখানে বসবাস করছেন। তাদের রেখে যাওয়া ভিটেতে আমরা বসবাস করছি। আমাদের জমি সরকার মহাসড়কের জন্যে অধিগ্রহণ করেছেন। আমরা নির্বিঘেœ বাড়ি থেকে বের হয়ে সড়কে উঠতে পারি। সড়ক থেকে প্রায় ২ শ’ ফুট দূরত্বে আমার বাড়ি। আমার একই দাগের সামনে জমি ব্যবহার করার আমরাই দাবিদার। সেখানে এ এলাকায় তো দূরের কথা এ মৌজায়ও যাদের বাড়ি ঘর নেই, তারা এসে লিজ নিয়েছে বলে দাবি করে চাঁদা দাবি এ কোন জনমেই দেখিনি। আমার বাসার সামনে এসে লেহাজ গংরা মেহগণি গাছের চারা রোপণ করেছে। আর আমাদের ব্যবহৃত দোকান ঘর ভেঙ্গে ফেলার হুমকি দিয়েছে।

তিনি আরো বলেন, আমার পাশের জমিটি আমরা বিক্রি করেছি। সেখানে মারিয়া আক্তার এর লোকজন থাকেন। ওই বাড়িতে জনতা ব্যাংকের নয়ারহাট শাখা বর্তমানে রয়েছে। ওই বাড়ির দেয়াল ভেঙ্গে ফেলেছে এ সকল চিহ্নিত লেহাজ গংরা। ব্যাংকের সামনের জমিতে গাছের চারা রোপণ করেছে তারা। নয়ারহাট সরলা হাউজিং সোসাইটির সভাপতি সাহাজ উদ্দিন বলেন, এ বাজারে দীর্ঘ ২৫ বছর যাবৎ তিনি সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এখানের পতিত মহাসড়কের পাশের জমিতে এবং ব্রীজ সংলগ্ন স্থানে এলাকার সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করছেন। মহাসড়কের প্রয়োজনে সওজ’র জমি তারা ব্যবহার করবেন না। ইদানিং একটি স্বার্থান্বেষী মহল বনায়নের নামে ব্যবসায়ী ও এলাকার মহাসড়কের পাশের জমির মালিকদের ওই জমি ব্যবহারের জন্য চাঁদা দিতে হবে মর্মে চাঁদা আদায়ের কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। এতে এ সকল ব্যবসায়ী ও জমির মালিকরা বিস্মিত! একটি দায়িত্বশীল দলের নেতা-কর্মীরা এধরণের কর্মকান্ড পরিচালনার ঘটনায় শত শত মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাছাড়া তার বাড়ির সামনেও গাছের চারা রোপণ করেছেন ওই সকল চিহ্নিতরা। তার বাড়ির সামনে স’মিল রয়েছে। স’মিল সরিয়ে বনায়ন করবে মর্মেও হুসিয়ারি দিয়েছে। তিনি আরো বলেন, এখানে ৬/৭টি স’মিল মহাসড়কের পাশে রয়েছে।

জানতে চাইলে, পাথালিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সাভার উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক পারভেজ দেওয়ান বলেন, নিজদলের অঙ্গসংগঠনের কতিপয় লোকেরা যে কর্মকান্ড করছে তা আদৌ ভালো কাজ নয়। এতে দলের বদনাম ছাড়া আর কিছুই হয় না। সাধারণ মানুষের রাজনীতি করলে তারা এধরনের কাজ করতে পারে না। আর সওজ বিভাগ এ ধরনের কোন অনুমতি দেয়নি বলেও তিনি জানান।

এ সংক্রান্ত বিষয়ে জানতে চাইলে নয়ারহাট সড়ক উপ-বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী, সওজ পরিচিতি নং-৬০২২৩৩ মোঃ আতিকুল্লাহ ভূঁইয়া স্বাক্ষরিত চলতি বছরের ৪ এপ্রিল প্রদেয় স্মারক নং-১৬২ একটি নোটিশ অফিস সূত্র দিয়ে বলেন, এটিই সওজ’র বক্তব্য।

নোটিশে উল্লেখ করা হয়-এতদ্বারা জনসাধারণের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে, ঢাকা-আরিচা জাতীয় মহাসড়ক ২৬ তম কি.মি. এ বাগধনিয়া মৌজাস্থিত (নয়ারহাট) এ সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের ভূমিতে সামাজিক বনায়নের জন্য কোন ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠানের নিকট সরকারি জমি কোন প্রকার ইজারা প্রদান করা হয় নাই। বনায়নের নামে উক্ত সরকারি জমিতে কোন দোকানঘর নির্মাণ কিংবা এ উদ্দেশ্যে কোন ব্যক্তির সহিত কোন প্রকার অর্থ লেনদেন থেকে বিরত থাকার জন্য সতর্ক করা হলো। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের কোন ব্যক্তি এ ধরনের অপকর্মের সহিত জড়িত নয়। অর্থ উত্তোনকারি বহিরাগত লোকদের আইনের হাতে সোপর্দ করণসহ অত্র অফিসের নিকট জানানোর জন্য অনুরোধ করা হলো।

এ ঘটনায় এলাকাবাসী, ব্যবসায়ীসহ সাধারণ মানুষ বিষয়টির আশু সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ ও সহযোগিতা কামনা করেছেন।