ক্যান্সার ও হৃদরোগসহ বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধে পেঁয়াজের চাঞ্চল্যকর কার্যকরিতা

: Liliaceae বৃক্ষ গোত্রের অন্যতম সদস্য হচ্ছে পেঁয়াজ, যেটি রসুন এবং এ জাতীয় অন্যান্য সবজির মতই জনপ্রিয়। এই ধরনের সবজিতে সাধারণত সালফারের যৌগ থাকে (cysteine sulfoxides) যেটি বিভিন্ন রোগের বিরুদ্ধে কার্যকরী তেল হিসাবে কাজ করে থাকে। সালফারের আরেকটি গুণ হচ্ছে এটি এধরনের সবজিতে সুগন্ধ এবং স্বাদ নিয়ে আসে।

পেঁয়াজ হচ্ছে সেই সকল গোত্রভুক্ত সবজি যেগুলো মানবদেহের জন্য খুবই উপকারী বলে বিবেচিত হয় এবং এ ধরনের সবজিতে অন্যরকম একটা স্বাদ পাওয়া যায়। আপনারা হয়ত বিভিন্ন মুদি দোকানে এ ধরনের ভিন্ন ভিন্ন রংয়ের সবজি দেখতে পান যেগুলো হয়ত সাদা, লাল, হলুদ ইত্যাদি বিভিন্ন রকমের হয়ে থাকে। এগুলো পুষ্টিগুণে এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্টস (antioxidants) এ ঠাসা থাকে। পেঁয়াজ আমাদের রক্তের সুগার নিয়ন্ত্রণে সহয়তা করে, হাড়ের গঠন দৃঢ় করে এবং সাথে সাথে এর রয়েছে প্রদাহ জনিত রোগের বিরুদ্ধে কাজ করার ক্ষমতা।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে,পেঁয়াজ ক্যান্সার এবং হৃদ রোগের বিরুদ্ধে কাজ করে। এটি মানবদেহে এজমা, ডায়াবেটিস এবং মস্তিষ্কের বিভিন্ন রোগ সংক্রামণের বিরুদ্ধেও কাজ করে থাকে।

পেঁয়াজ এ কিউরচিটিন (Quercetin) নামে একটি উপাদান পাওয়া যায় যেটি একটি অ্যান্টিহিস্টামিন হিসাবে কাজ করে। ফলে এটি শরীরে হিস্টামিনের মাত্রা কমায় এবং এতে এন্থোচায়ানিনস নামের আরেকটি উপাদান রয়েছে যার ফলে কিছু কিছু পেঁয়াজকে লাল রংয়ের দেখায়।

যখন পেঁয়াজ কাটা হয় তখন হয়ত অনেকেরই চোখ দিয়ে পানি পড়ে, এটি ঘটে এ জন্য যে কারণ এতে ‘ACSO’s’ নামের একটি উপাদান থাকে যেটাকে Alkenyl Cystenine Sulphoxidesও বলা হয়ে থাকে। পেঁয়াজে সাধারণত শরীরের পক্ষে উপকারী বিভিন্ন ধরনের উপাদান থাকে এসব উপাদান ক্যান্সার, এজমা প্রতিরোধী হিসাবে কাজ করে এবং এর জীবানু প্রতিরোধী কার্যক্ষমতা রয়েছে।

এক কাপ পেঁয়াজের রসে ৬৪ ক্যালরি শক্তি পাওয়া যায়, এতে রয়েছে ২ গ্রাম প্রোটিন, ২ গ্রাম ফাইবার, ৭ গ্রাম চিনি, ৮ গ্রাম ভিটামিন সি, ০.২ মিলিগ্রাম ভিটামিন বি-৬, ০.২ গ্রাম ম্যাগনেসিয়াম, ২৩৪ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম, ৪৬ মিলিগ্রাম ফসফরাস এবং ০.০৭ মিলিগ্রাম থায়ামিন।

নিচে আরটিএনএনের পাঠকদের জন্য পেঁয়াজের কিছু উপকারীতার বর্ণনা দেয়া হলঃ

১। ক্যান্সার প্রতিরোধী
পেঁয়াজ মানব শরীরে ক্লোন ক্যান্সার, ওভারিন ক্যান্সার এবং মুখের ক্যান্সারের বিরুদ্ধে কাজ করে। পেঁয়াজে থাকা অ্যান্টিওক্সিডেন্ট শরীরের কোষকে ধ্বংস হওয়া থেকে রক্ষা করে। পেঁয়াজে থাকা সালফার মানব শরীরে টিউমার এবং ক্যান্সারের জীবানু বিস্তার প্রতিরোধ করে।

এমনকি সপ্তাহে কয়েকবার পেঁয়াজ খেলে শরীরে ক্যান্সার জীবানু বাসা বাঁধতে পারে না। তবে অবশ্যই আপনি যত বেশি পেঁয়াজ খাবেন আপনার শরীরে ক্যান্সারের জীবানু বেড়ে ওঠার পরিমাণ তত কমে যাবে।

দক্ষিণ ইউরোপে করা একটি গবেষণা, যেটি আমেরিকান জার্নাল অফ ক্লিনিকাল নিউট্রিশনে প্রকাশিত হয়েছিল তাতে দেখা যায়, পেঁয়াজ এবং এধরনের অন্যান্য সবজিতে ক্যান্সার প্রতিরোধী উপাদান রয়েছে।

২। হৃদ রোগের ঝুঁকি কমায়
পেঁয়াজে থাকা Fibrinolytic উপাদানসমূহ মানবদেহে রক্ত জমাট বেঁধে যাওয়া থেকে প্রতিরক্ষা দিয়ে হৃদরোগের বিরুদ্ধে কার্যকরি ভূমিকা রাখে। অধিকন্তু LDL কোলেস্টেরোল এর বিরুদ্ধেও এটি কাজ করে। পেঁয়াজে থাকা এসব উপাদান রক্তে ক্ষতিকর জীবানুকে ধ্বংস করে এবং রক্ত চলাচল স্বাভাবিক করার মাধ্যমে মানব দেহে কার্যকরী ভূমিকা রাখে।

৩। শক্তিশালী হাঁড় গঠনে সহায়তা করে
পেঁয়াজ হাঁড়ের খনিজ উপাদানকে ঘন করতে কাজ করে যেটি হাঁড় ভেঙ্গে যাওয়া থেকে আমাদেরকে সুরক্ষা দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ক্যারোলিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের করা এক গবেষণায় এটা দেখতে পাওয়া গিয়েছিল- যেসব নারী নিয়মিত পেঁয়াজ খান তাদের হাঁড়ের ঘনত্বও বেড়ে যায়।

যেসব মহিলারা দিনে অন্তত একবার পেঁয়াজ খান সেসব মহিলাদের হাঁড়ের ঘনত্ব আর যেসব মহিলারা মাসে একবার পেঁয়াজ খান তাদের চাইতে ৫ শতাংশ বেশি হয়ে থাকে। ক্যারোলিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের করা ওই গবেষণায় দেখা যায়-যেসব মহিলারা নিয়মিত পেঁয়াজ খান তাদের হাঁড় ভেঙ্গে যাওয়ার সম্ভাবনা ২০ শতাংশ কমে যায়, সেসব মহিলাদের থেকে যারা কখনো পেঁয়াজ খান না।

পেঁয়াজের হাঁড় ভেঙ্গে যাওয়া প্রতিরোধী কার্যক্ষমতা এজন্য রয়েছে যে, এতে GPCS(Gamma-L-Glutamyl-Trans-S-1-Propenyl-L-Cysteine Sulfoxides) নামের উপাদান রয়েছে, যা হাঁড়ের ক্ষয় প্রতিরোধ করে এবং অস্টিওপ্রোসিস হওয়া থেকে বাঁচায়।

৪। ডায়াবেটিসের বিরুদ্ধে কাজ করে
কোরিয়ার বৃক্ষ সম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের করা এক গবেষণায় পাওয়া গেছে, পেঁয়াজ ডায়াবেটিসের বিরুদ্ধে কার্যকরি ভূমিকা রাখে কারণ এটি রক্তরসের গ্লুকোজের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং রক্তে চিনির পরিমাণ হ্রাসে সহায়তা করে।

তাদের গবেষণায় আরেকটি উপাদান পাওয়া গেছে আর তা হচ্ছে- Chromium নামক একটি উপাদান যা রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহয়তা করে এবং এর ফলে ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি কমে যায়।

৫। বাত এবং শ্বাসকষ্ট থেকে সুরক্ষা দেয়
পেঁয়াজ থাকা প্রদাহ প্রতিরোধী উপাদান একে একটি চমৎকার সবজিতে রূপান্তরিত করেছে। যদি আপনি প্রদাহমূলক কোনো রোগে ভোগেন যেমন বাত বা শ্বাসকষ্ট তবে পেঁয়াজ হতে পারে আপনার আরোগ্য লাভের অন্যতম ঔষধ। পেঁয়াজ থাকা Quercetin নামক উপাদান বিশেষত বাত রোগীদের জন্য ভালো কাজ করে থাকে।

৬। শ্বাসকষ্ট জনিত সমস্যার বিরুদ্ধে দারুণ কাজ করে
যদি আপনি ঠান্ডা বা শ্বাসকষ্ট জনিত রোগে ভোগে থাকেন তাহলে আপনার প্রতিদিনের খাবার তালিকায় পেঁয়াজের পরিমাণ বাড়ান, কারণ এটি এধরনের রোগের বিরুদ্ধে একটি প্রাকৃতিক ঔষধ হিসাবে কাজ করে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন পেঁয়াজ থাকা Phytonutrients নামক উপাদান শরীরের রোগ প্রতিরোধী ক্ষমতা বাড়ায়, এটি প্রদাহ জনিত রোগের বিরুদ্ধে কাজ করে এবং কফ অপসারণেও দারুণ উপযোগী।

৭। প্রজনন ক্ষমতা বাড়ায়
পেঁয়াজে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট নামক উপাদান বীর্যে ইতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে আসে, যেটি প্রজনন ক্ষমতা বাড়ানোর একটি প্রাকৃতিক উপায়। ইরানের একদল গবেষক কিছু ইদুঁরকে পেঁয়াজ খেতে দিয়ে তাদের প্রজনন ক্ষমতার সম্পর্কে একটি সমীক্ষা চালায় এবং তারা দেখতে পায় যে এতে করে ইদুঁরের টেস্টোরন হরমোন বেঁড়ে গিয়েছে। যেসব ইদুঁর ২০ দিন ধরে চলা এই গবেষণায় বেশি মাত্রায় পেঁয়াজ খেয়েছে তাদের প্রজনন ক্ষমতা তত বেশী মাত্রায় বেড়ে গিয়েছে।