আমদানিতেই গেলো পাঁচ লাখ কোটি টাকা!

রেকর্ড পরিমাণ আমদানি হয়েছে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে। টাকার অঙ্কে এর পরিমাণ প্রায় পাঁচ লাখ কোটি টাকা। যা পুরো অর্থবছরের বাজেটের চেয়েও এক লাখ ২৩ হাজার কোটি টাকা বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বিভিন্ন পণ্য আমদানিতে বাংলাদেশের ব্যয় হয়েছে পাঁচ হাজার ৮৮৬ কোটি ৫৩ লাখ ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় চার লাখ ৯৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি। প্রসঙ্গত, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে চার লাখ ২৬৬ কোটি টাকার জাতীয় বাজেট ঘোষণা করা হয়েছিল। পরে সংশোধিত বাজেটের আকার নামিয়ে করা হয় তিন লাখ ৭১ হাজার কোটি টাকা।

বিশ্লেষকরা বলছেন, অস্বাভাবিকভাবে আমদানি ব্যয় বাড়ায় বাংলাদেশকে বড় ধরনের চাপের মুখে পড়তে হতে পারে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে বৈদেশিক বাণিজ্যে ভারসাম্যহীন পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বিভিন্ন পণ্য আমদানিতে এলসি খোলা হয়েছে ছয় হাজার ৯৪২ কোটি ২১ লাখ ডলারের (বা পাঁচ লাখ ৮৩ হাজার কোটি টাকার)।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর মনে করেন, অস্বাভাবিকভাবে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়া ও রফতানি আয় কমে যাওয়ার কারণে বাংলাদেশকে বড় ধরনের চাপের মুখে পড়তে হবে।

 তিনি বলেন, ‘এখনই এই চাপ সহ্য করতে হচ্ছে। আগামীতে এই চাপ আরও বাড়বে। এর ফলে ক্রমে বৈদেশিক বাণিজ্যে ভারসাম্যহীন পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে।’

আহসান এইচ মনসুরের মতে, আমদানি ব্যয় মেটাতে যে পরিমাণ টাকা লাগবে, সেই টাকা থাকলে সমস্যা হবে না। কিন্তু প্রশ্ন হলো— কতদিন এভাবে চলবে? সেটাই দেখার বিষয়।

তিনি বলেন, ‘অনেক সময়ই আমরা শুনি, এক পণ্য আমদানির নামে অন্য পণ্য আমদানি হচ্ছে। অনেক সময় শূন্য কন্টেইনারও আসে। আবার ওভার ইনভয়েসের (আমদানি করা পণ্যের বেশি মূল্য দেখিয়ে) মাধ্যমে অর্থ পাচার করছেন অনেকে।’

এদিকে আমদানি ব্যয় বাড়ায় গেলো অর্থবছরে বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবে বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর পরিমাণ ৯৭৮ কোটি ডলার। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে চলতি হিসাবে মাত্র ১৩৩ কোটি ডলারের মতো ঘাটতি ছিল। অন্যদিকে, গত অর্থবছরে বহির্বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতিও বেড়েছে রেকর্ড পরিমাণ। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে যেখানে বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ৯৪৭ কোটি ডলার, সেখানে গত অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে একহাজার ৮২৫ কোটি ডলারে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বিভিন্ন পণ্য আমদানিতে ঋণপত্র (লেটার অব ক্রেডিট বা এলসি) খোলার ব্যয় বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে। গত অর্থবছরে এলসি খোলায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ৪৪ শতাংশ। ২০১৬-১৭ অর্থবছরের একই সময়ে এ প্রবৃদ্ধির হার ছিল মাত্র ১১ শতাংশের মতো। এ হিসাবে এলসি খোলায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় চার গুণ। এই সময়ে খাদ্যপণ্য, মূলধনী যন্ত্রপাতি, শিল্পের কাঁচামাল ও জ্বালানি তেলের এলসি খোলার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে খাদ্যপণ্যের এলসি খোলার হার, প্রায় ১৪৪ শতাংশ।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বিভিন্ন পণ্য আমদানিতে বাংলাদেশের ব্যয় হয়েছে পাঁচ হাজার ৮৮৬ কোটি ৫৩ লাখ ডলার। সেখানে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে আমদানি ব্যয়ের পরিমাণ ছিল চার হাজার ৩৪৯ কোটি ডলার।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বিভিন্ন পণ্য আমদানিতে এলসি খোলা হয়েছে ছয় হাজার ৯৪২ কোটি ২১ লাখ ডলার। আগের অর্থবছরে যা ছিল চার হাজার ৮১২ কোটি ৫৯ লাখ ডলার। অর্থাৎ এলসি খোলায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪৪ দশমিক ২৫ শতাংশ। অন্যদিকে, এ সময়ে বিভিন্ন পণ্য আমদানিতে ঋণপত্র নিষ্পত্তি হয়েছে পাঁচ হাজার ১৫৩ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরে ছিল চার হাজার ৪২৭ কোটি ২৭ লাখ ডলার।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সময়ে খাদ্যপণ্যের মধ্যে চাল ও গমের আমদানি ঋণপত্র খোলা হয়েছে ৩৬০ কোটি ৯১ লাখ ডলারের, যা আগের অর্থবছরে ছিল মাত্র ১৪৭ কোটি ৮৫ লাখ ডলার। সে হিসাবে খাদ্যপণ্য আমদানিতে ঋণপত্র খোলার হার বেড়েছে ১৪৪ দশমিক ১০ শতাংশ।

গেল অর্থবছরে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে ঋণপত্র খোলা হয়েছে ৬৪৭ কোটি ৩৪ লাখ ডলারের। আগের অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ৫৩০ কোটি ৮১ লাখ ডলার।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে শিল্পের কাঁচামাল আমদানি ঋণপত্র খোলা হয়েছে একহাজার ৯৮২ কোটি ৪৭ লাখ ডলারের, যা আগের অর্থবছরে ছিল একহাজার ৭৭২ কোটি ৫৮ লাখ ডলার।

অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. জায়েদ বখত বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যদি মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি বাড়ে, তাহলে সেটা অর্থনীতির জন্য অনেক ভালো খবর।’ তিনি বলেন, ‘বিনিয়োগকারীরা হয়তো এখন বিনিয়োগে মনোযোগ দিচ্ছে, পদ্মা সেতু প্রকল্পসহ বড় বড় প্রকল্প বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা এনে দিয়েছে, যা শিল্পায়নে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।’