সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারে সংশোধন হচ্ছে আরপিও

 জাতীয় নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোটগ্রহণের বিধান চালু করতে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধন করতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে বৃহস্পতিবার (৩০ আগস্ট) বৈঠকে বসছে কমিশন। ইভিএম অন্তর্ভুক্তির বিধান যুক্ত করে আরপিও সংশোধনীর বিষয়টি কমিশনে অনুমোদন হলে অন্যান্য প্রক্রিয়া শেষ করে এটিকে আইনি কাঠামোয় রূপ  দেবে ইসি।

কমিশন সূত্রে জানা গেছে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের পরিকল্পনায় শেষ সময় এসে তড়িগড়ি করে আরপিও সংশোধনীর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আইন সংশোধনের উদ্যোগের পাশাপাশি দেড়লাখ ইভিএম কেনার প্রকল্পও কমিশন ইতোমধ্যে হাতে নেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশন থেকে সম্মতি পেলে তারা এই ক্রয়-প্রক্রিয়া শুরু করবে।

এদিকে আরপিওতে ইভিএম অন্তর্ভুক্তির বিরুদ্ধে না হলেও একাদশ সংসদ নির্বাচনে এর ব্যবহারে ঘোর বিরোধী একাধিক কমিশনার। বৃহস্পতিবারের বৈঠকে একাদশে ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত এলে নোট অব ডিসেন্ট নিয়ে তার আপত্তি জানানোরও প্রস্তুতি নিয়েছেন। ইভিএম নিয়ে রাজনৈতিক দলের মধ্যেও রয়েছে পরস্পর বিরোধী অবস্থান। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ইভিএমকে স্বাগত জানালেও বিএনপি এটাকে দুরভিসন্ধি বলে আখ্যায়িত করেছে। নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সংলাপের সময়ও দল দু’টি জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম বিষয়ে পক্ষে-বিপক্ষে প্রস্তাব দিয়েছিল।

প্রসঙ্গত, আগামী ৩১ অক্টোবর থেকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ক্ষণগণনা শুরু হবে। ইসির পরিকল্পনা অনুযায়ী নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে তফসিল ও ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

কমিশন সূত্রে জানা গেছে, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপে আরপিও-এর বেশ কয়েকটি বিধান সংস্কারে রাজনৈতিকসহ বিভিন্ন অংশীজনের থেকে সুপারিশ এলেও তার সবকিছু বাদ দিয়ে কেবল ইভিএম ব্যবহারের বিষয়টিতে জোর দিয়েছে কমিশন। কার্যত কেবল ইভিএম যুক্ত করতেই আরপিওতে এই সংশোধনী আনা হচ্ছে বলে কমিশনের একাধিক কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন। এর বাইরে দুেই-একটি সাচিবিক পরিবর্তন ছাড়া আরপিওতে খুব একটা সংশোধনী হবে না বলে জানান তারা।

এর আগে ইসির আইন ও বিধিমালা সংস্কার কমিটি আরপিওর ৩৫টি ধারায় সংশোধনী আনার প্রস্তাব করলেও গত এপ্রিলে নির্বাচন কমিশন এ প্রস্তাব আরও পর্যালোচনার জন্য ফেরত পাঠায়। ওই সভা থেকেই ইসি আরপিও সংস্কারের সিদ্ধান্ত থেকে পুরোপুরি সরে আসে। যা জুলাইয়ের মাঝামাঝিতে ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ প্রকাশও করেন। ওই সময় তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আরপিও সংশোধনের একটা উদ্যোগ আগে নেওয়া হয়েছিল। তবে সেটা এখন আর হচ্ছে না। মাসখানেকের মাথায় কমিশন আবার আরপিও সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে। এ নিয়ে ২৬ আগস্ট একটি বৈঠক করে ইসি। যার মুলতবি ৩০ আগস্ট হতে যাচ্ছে। জানা গেছে, আইন ও বিধিমালা সংস্কার কমিটি যে ৩৫টি সংশোধনী প্রস্তাব করেছিল, তার মধ্যে বাকিগুলো বাদ রেখে এখন কেবল ইভিএমে ভোট নেওয়ার বিষয়টি আরপিওতে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করার চিন্তা করছে।

এদিকে আরপিও সংশোধনীর আগেই ৩ হাজার ৮২৯ কোটি টাকায় দেড় লাখ ইভিএম কেনার প্রকল্প হাতে নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। তড়িঘড়ি করে নেওয়া এই প্রকল্প প্রস্তাবের সম্ভাব্যতাও যাচাই করা হয়নি। যে কারণে পরিকল্পনা কমিশন অভিমত দিয়ে তা ফেরত পাঠিয়েছে।

এদিকে ইভিএম বিষয়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ‘নির্বাচন কমিশন জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) নামে এক বিতর্কিত মাধ্যম ব্যবহারের চিন্তা করছে। আরপিও সংশোধনের মাধ্যমে ইভিএম ব্যবহারের উদ্যোগ ও নানা ষড়যন্ত্রের কথা শোনা যাচ্ছে।’

জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, ‘সিটি করপোরেশন নির্বাচনের কয়েকটি কেন্দ্রে ইভিএম ব্যবহার করে এর অপরিহার্যতা বোঝানো হয়েছে। ইভিএম প্রযুক্তির লেটেস্ট উদ্ভাবন। প্রতিবেশী দেশ ভারতেও বেশ কয়েকটি নির্বাচন ইভিএমের মাধ্যমে হয়েছে। পৃথিবীর উন্নত দেশে ইভিএম ব্যবহৃত হচ্ছে। এখানেও তা হবে।’

ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ বলেছেন, ‘সব পক্ষ একমত হলে জাতীয় সংসদেও ইভিএম ব্যবহার করার পরিকল্পনা আছে। এ জন্য এখন থেকে প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে। আরপিও সংশোধন করে ৩০ আগস্ট ইসির সভায় ইভিএম ব্যবহারের বিষয়টি আরপিওতে সংযোজন করা হতে পারে। আর ভোট গ্রহণ কর্মকর্তা ও ভোটারদের প্রশিক্ষণ, প্রকল্প বাস্তবায়নসহ অনেক বিষয় আছে। সবকিছু ঠিকঠাক হলে কত আসনে ইভিএম ব্যবহার করা হবে, তখন কমিশন সিদ্ধান্ত নেবে।’

আরপিও সংশোধন করে জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারে ইসির উদ্যোগ বিষয়ে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ছহুল হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নির্বাচনে প্রযুক্তির ব্যবহার ভালো সিদ্ধান্ত। ভবিষ্যতে হয়তো সেদিকেই যেতে হবে। কিন্তু নির্বাচনের মাত্র ৪ মাস বাকি থাকতে হঠাৎ করে কমিশনের ইভিএম ব্যবহারের তাড়াহুড়ায় সবাই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে।’ তিনি বলেন, ‘ইভিএম ব্যবহারে দক্ষ জনবল তৈরি, ভোটারদের সচেতন, জনমত গঠনসহ রাজনৈতিক দলের মধ্যে সম্মতির ব্যাপার রয়েছে। আমার মনে হয় না, এত অল্প সময়ে তা সম্ভব হবে।’

সাবেক এই  নির্বাচন কমিশনার আরও বলেন, ‘নির্বাচন শুধু অনুষ্ঠান করলেই হবে না। তা সবার কাছে গ্রহণযোগ্যও হতে হবে। ইভিএম ব্যবহার করতে গিয়ে যদি নির্বাচন অগ্রহণযোগ্য হয়, তাহলে সেই ইভিএম ব্যবহারের কোনও অর্থ হয় না। কমিশনের উচিত এর পেছনে সময় ব্যয় না করে নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করার জন্য করণীয় কাজগুলোর ওপর মনোযোগ দেওয়া।’ ভারতসহ বিশ্বের অনেক দেশ ইভিএম বর্জন করা শুরু করছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘হ্যাকিংসহ নানা জটিলতার কারণে ইলেকট্রনিক ডিভাইস এখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ কারণে বিশ্বের অনেক দেশ ইভিএম বর্জন করছে।