বারবার ‘ছোট’ হচ্ছে বাংলাদেশের ক্রিকেট

: ‘ব্যক্তিগত’, ‘পারিবারিক’ বলে এড়ানোর চেষ্টা ঢের হয়েছে। একের পর এক ঘটনার পুনরাবৃত্তিতে ব্যতিক্রমই যে নিয়ম হয়ে যাবার জোগাড়! ক্রিকেটারদের ব্যক্তিগত-পারিবারিক জীবনের কেলেঙ্কারি ক্রিকেটকেই কাঁপিয়ে দিচ্ছে বারবার।

মোসাদ্দেক হোসেনের বিপক্ষে তার স্ত্রীর নির্যাতন ও যৌতুক দাবির মামলা এ জাতীয় ঘটনার সমুদ্রে সর্বশেষ ঢেউ মাত্র। মোসাদ্দেকের বয়স মাত্র ২২ বছর।

বাংলাদেশ জাতীয় দলে খেলা শুরু করেছেন বছর দুয়েক আগে। দুই টেস্ট, ২১ ওয়ানডে ও আট টি-টোয়েন্টির একাদশে ছিলেন। জায়গাটা পাকা করতে পারেননি এখনো। অথচ এর মধ্যেই ভুল কারণে সংবাদ শিরোনামে চলে এলেন এই ব্যাটসম্যান।

তার বিরুদ্ধে ময়মনসিংহের আদালতে নির্যাতন ও ১০ লাখ টাকা যৌতুক দাবির মামলা করেছেন স্ত্রী সামিয়া শারমীন। তাতে উল্লেখ রয়েছে, ছয় বছর আগে, ২০১২ সালে তাদের বিয়ের কথা।

খালাতো বোনের সঙ্গে এই বিয়ে গোপন রাখেন মোসাদ্দেক। স্ত্রীকে ঢাকায় না এনে ময়মনসিংহেই রাখতেন। এদিকে জাতীয় দলে সুযোগ পাবার পর অন্য মেয়েদের সঙ্গে তিনি সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন বলে এই ক্রিকেটারের স্ত্রীর অভিযোগ।

ফলে তাদের মধ্যে দূরত্ব বাড়তেই থাকে, যার পরিণতিতেই এই মামলা। যদিও আত্মপক্ষ সমর্থনে মোসাদ্দেকের দাবি, বনিবনা না হওয়ায় দিন দশেক আগেই সামিয়াকে তালাক দিয়েছেন তিনি।

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)-তে তাই আবার বসেছে ‘পারিবারিক আদালত’। বিচার-সালিশের জন্য যে কাজটি তাদের করতে হচ্ছে প্রায়ই। সেই রুবেল হোসেন থেকে শুরু করে আরাফাত সানি, মোহাম্মদ শহীদ, শাহাদাত হোসেন– তালিকাটা ছোট নয় মোটেও।

এর সঙ্গে রয়েছে ক্রিকেটারদের আচরণগত নানা অভিযোগ। ফিরিস্তির পাহাড় জমে যাবার পর সেসবের সুরাহাও করতে হচ্ছে সেই বিসিবিকে। বাংলাদেশ ক্রিকেট ভাবমূর্তিতে কলঙ্কের ছোপ পড়ছে তাই বারবার।

ঘটনা পরিবারের গন্ডি পেরিয়ে মিরপুরে বিসিবির সুরম্য অট্টালিকার দেয়ালেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। এ সূত্র ধরে জাতীয় দলের প্রতিনিধিত্ব করা তিন-তিনজন ক্রিকেটারের জেল পর্যন্ত ঘুরে আসতে হয়েছে।

ভাবা যায়! কেলেঙ্কারির শুরু রুবেল হোসেনের মাধ্যমে। এই পেসারের বিপক্ষে চিত্রনায়িকা নাজনীন আক্তার হ্যাপী ২০১৪ সালের ডিসেম্বর মাসে মামলা করেন বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে তার সঙ্গে জোরপূর্বক শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের অভিযোগে। মামলার জের ধরে জেলে যেতে হয় রুবেলকে।

২০১৫ সালে অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডের বিশ্বকাপের জন্য দেশ ছাড়ার আগে নিতে হয় আদালতের অনুমতি। পরবতর্তীতে হ্যাপীর করা মামলায় নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে মুক্তি পান রুবেল।

সেটি আদালতের রায়। কিন্তু জনতার রায়ে ক্রিকেট ঠিকই হয় কলুষিত। বাঁ হাতি স্পিনার আরাফাত সানীর বিপক্ষে নাসরিন সুলতানা নামে একজন মামলা করেন ২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি। মামলাটি তথ্যপ্রযুক্তি আইনে। ওই তরুণীর দাবি, ২০১৪ সালে সানির সঙ্গে তার বিয়ে হয়।

পরবর্তীতে এই ক্রিকেটার আরেকজনের সঙ্গে সংসার করেন। নাসরিনের অন্তরঙ্গ মুহূর্তের কিছু ছবি ভুয়া ফেইসবুক আইডি খুলে তাকে সানি পাঠান বলে অভিযোগ। সেসব ছবি অন্তর্জালে ছড়িয়ে দেবার হুমকিও দেন।

এসব কারণেই মামলা। সানি গ্রেপ্তার হন ওই বছরের ২২ জানুয়ারি। তথ্যপ্রযুক্তি আইনের মামলার পর যৌতুক এবং শিশু ও নারী নির্যাতনের আরো দুটি মামলা করা হয় তার বিরুদ্ধে।

৫৩ দিন কারাগারে থাকার পর ২০১৭ সালের ১৫ মার্চ অবশেষে জামিনে মুক্তি পান সানি। কিন্তু বাংলাদেশ ক্রিকেটের আরেক কালো অধ্যায় ততদিনে রচিত হয়ে গেছে।

জেলের চার দেয়ালে যাওয়া তৃতীয় ক্রিকেটার শাহাদাত হোসেন। শিশু গৃহকর্মী নির্যাতনের মামলায় এই পেসার ও তার স্ত্রী জেসমিন জাহানের বিপক্ষে মামলা হয় ২০১৫ সালের ৭ সেপ্টেম্বর। দুজন আত্মগোপনে চলে যান।

স্ত্রীকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে ৪ অক্টোবর। পরদিন, অর্থাৎ ৫ অক্টোবর শাহাদাত আদালতে আত্মসমর্পন করে জামিন চান। আদালত জামিন না দিয়ে কারাগারে পাঠিয়ে দেয়। জামিন হয় ৮ ডিসেম্বর, যার অর্থ, দুই মাসের বেশি সময় শাহাদাতকে থাকতে হয়েছে জেলে।

ওই শিশু গৃহকর্মীর পরিবারের সঙ্গে ‘সমঝোতায়’ পরবর্তীতে রক্ষা পান এ ক্রিকেটার। ২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর মামলা থেকে অব্যাহতি মেলে শাহাদাতের।

আরেক পেসার মোহাম্মদ শহীদের বিপক্ষে অভিযোগ নিয়ে বিসিবি যান তার স্ত্রী ফারজানা আক্তার। বোর্ডের কাছে লিখিত অভিযোগে জানান, ২০১১ সালে বিয়ে হওয়া এ দম্পতির দুটো সন্তান। জাতীয় দলে সুযোগ পাবার পর শহীদের আচরণ বদলে যেতে শুরু করে।

অন্য মেয়েদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠে, শুরু হয় নির্যাতন। পরে বাড়ির ছাদে নিয়ে এ পেসার ধাক্কা মেরে স্ত্রীকে ফেলে দিতে চান বলেও অভিযোগ।

এ নিয়ে বোর্ডের দেনদরবারে কাজ না হওয়ায় মামলা করবেন বলে মনস্থির করেন ফারজানা। ওই মামলার ভয়েই আবার সংসার শুরু করেন শহীদ।

শুধু বিবাহিত জীবনে নয়, এমনিতেও ‘গুরুতর শৃঙ্খলাবহির্ভূত কর্মকাণ্ড’তে ক্রিকেটারদের নাম জড়িয়েছে বারবার। যে কারণে ২০১৫ বিশ্বকাপ থেকে দেশে ফেরত পাঠানো হয় আল আমিন হোসেনকে।

২০১৬-র বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) চলার সময়ে তাকে ও সাব্বির আহমেদকে করা হয় মোটা অঙ্কের জরিমানা। চট্টগ্রামে নিজেদের হোটেল কক্ষে ‘নারী অতিথি’ নিয়ে রাত্রিযাপন করার অপরাধে।

সিসি টিভির ফুটেজে এর অকাট্য প্রমাণ পেয়ে আল আমিনকে বিপিএল চুক্তির ৫০ শতাংশ এবং সাবি্বরকে ৩০ শতাংশ জরিমানা করা হয়, অর্থের অঙ্কে যা যথাক্রমে প্রায় ১২ লাখ ও ১৩ লাখ টাকা। বিসিবি অবশ্য দুজনের ‘অপরাধ’ প্রকাশ্যে আনেননি। তবে তা কারো জানতেও বাকি থাকেনি।

ওই ঘটনা থেকে সাব্বির শিক্ষা নিয়েছেন, তা বলা যাবে না। তাহলে গেল বছরের ডিসেম্বরে জাতীয় লিগের ম্যাচ চলাকালীন কিশোর দর্শককে পিটিয়ে আবার বোর্ডের আদালতে হাজিরা দিতে হতো না।

শাস্তি হিসেবে বিসিবির কেন্দ্রীয় চুক্তি থেকে বাদ পড়েছেন, ঘরোয়া ক্রিকেটে ছয় মাসের নিষেধাজ্ঞার খড়গ নেমে এসেছে এবং গুণতে হয়েছে ২০ লাখ টাকা জরিমানা।

বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান তখনই বলেছিলেন, সাব্বিরের এটা শেষ সুযোগ। শৃঙ্খলা পরিপন্থি কাজ আবার করলে তাকে অনির্দিষ্টকালের জন্যও নিষিদ্ধ করা হতে পারে।

কিন্তু তার মধ্যে শোধরানোর লক্ষণ কই! কিছু দিন আগে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ চলার সময়ে ফে্ইসবুকে দুই সমর্থককে অকথ্য গালিগালাজ করে আবার সমালোচনার ফুটন্ত কড়াইয়ে এই ব্যাটসম্যান। ব্যাপারটি নজরে এনেছে বিসিবিও।

এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নাসির হোসেনকে নিয়েও তোলপাড় সম্প্রতি। নিজেকে ওই ক্রিকেটারের বান্ধবী পরিচয় দেয়া এক তরুণীর সঙ্গে নাসিরের ফোন কথোপকথনের অডিও রেকর্ড হয়ে যায় ভাইরাল। এরপর সেই তরুণী ফেইসবুক লাইভে এসেও করেন নানা অভিযোগ। এসব ঘটনার রেশ কাটার আগেই মোসোদ্দেক-ইস্যুর মুখোমুখি বিসিবি।

ক্রিকেটারদের ভেতর একই রকম ঘটনার পুণরাবৃত্তিতে তিতিবিরক্ত বোর্ড। এবার কঠোর সিদ্ধান্তের পথে হাঁটছে তারা।

বিসিবি প্রধান নির্বাহী নিজাম উদ্দিন চৌধুরীর কথায় তা স্পষ্ট, ‘এটি একান্তই তাদের ব্যক্তিগত বা পারিবারিক ব্যাপার। এখন ক্রিকেটারদের অভিভাবক হিসেবে আমাদের দিক থেকে যা করণীয়, তা অবশ্যই আমরা করব। এসব ব্যাপারে বোর্ডের অবস্থান যে খুবই কঠোর হবে, এটুকু বলতে পারি। বোর্ড সভাপতি দেশের বাইরে আছেন। উনি যাবার আগেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। মোসাদ্দেকের ইস্যু আসার আগেও আরো কিছু বিষয় ছিল, যেগুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে।এসব ব্যাপারে কিছু নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে, যেগুলো শীঘ্রই জানতে পারবেন’।

আগের সিদ্ধান্তগুলোর চেয়ে তা আরো কঠোর হবে বলে দাবি তার, ‘পুরো বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। দৃশ্যমান বলতে, খেলোয়াড়দের যে শাস্তি হয়েছে, তা দেখেছেন। বড় পরিমাণে আর্থিক জরিমানা করা হয়েছে। তারপরও ব্যাপারটির উন্নতি যখন হচ্ছে না, তখন বোর্ড হয়ত আরো কঠোর সিদ্ধান্ত নেবে’।

মোসাদ্দেকের বক্তব্য শোনার জন্য তাকে বোর্ডে ডাকা হবে বলেও জানান তিনি, ‘মোসাদ্দেকের ব্যাপারে আমরা মিডিয়ায় জেনেছি, ওনার স্ত্রী একটি মামলা করেছেন। যেহেতু বিষয়টি আদালতে চলে গেছে, আদালতেই নিষ্পত্তি হোক। কিন্তু বিষয়টি আমরা আমাদের মতো করে দেখব। খুব শিগগিরই এটি নিয়ে আমরা বসব। যেসব খেলোয়াড়কে নিয়ে এসব ঘটছে, তাদেরও বক্তব্য শোনার জন্য সেখানে ডাকা হবে’।

একের পর এক এমন ঘটনায় প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশ ক্রিকেটে। প্রবলভাবেই পড়ছে। জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক গাজী আশরাফ হোসেন তাই ভীষণ ক্ষুব্ধ, ‘ক্রিকেটারদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার কী হওয়া উচিত? ক্রিকেট। কিন্তু একের পর এক ঘটনা দেখে তো মনে হচ্ছে না যে, ক্রিকেটটা ওদের মূল মনোযোগের জায়গা। সাব্বিরের ব্যাপার দেখুন। ওকে তো বেশ কয়েকবার শাস্তি দেয়া হয়েছে। তবু শোধরাচ্ছে না। তাহলে তো অবশ্যই এটি বুঝতে হবে যে, ক্রিকেটটা ওর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ না। মাঠের বাইরের ব্যাপারগুলোর গুরুত্ব এর চেয়ে বেশি। আর তা যখন হবে, পারফরম্যান্সে এর প্রভাব পড়তে বাধ্য’।

সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে এ জাতীয় ঘটনার সংখ্যা। এটি ক্রমশ বড় ইস্যু হয়ে যাচ্ছে বলে তাই স্বীকারও করছেন বিসিবি প্রধান নির্বাহী নিজাম উদ্দিন চৌধুরী, ‘আমি আবারও বলছি, বোর্ড এ ব্যাপারে খুবই কঠোর হবে, কেননা, এখন এটি আমাদের জন্য বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে’।

তা হচ্ছে। আর ওই বড়-ইস্যুতে বারবার ‘ছোট’ হচ্ছে ক্রিকেট। বাংলাদেশের ক্রিকেট।