গ্যাসের দাম ও কস্ট রিকভারি বাড়িয়ে পিএসসি সংশোধনের উদ্যোগ

গ্যাসের দাম ও কস্ট রিকভারির হার (অনুসন্ধান উত্তোলনের ব্যয়) পরিমাণ বাড়িয়ে সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের উৎপাদন বন্টন চুক্তি (পিএসসি) সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে জ্বালানি বিভাগ। এরইমধ্যে এই সংশোধিত পিএসসির খসড়া অনুমোদনের জন্য জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। নতুন পিএসসি অনুমোদন পেলেই আবার নতুন করে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করবে পেট্রোবাংলা।

পেট্রোবাংলার একজন কর্মকর্তা জানান, পিএসসির দুটি জায়গায় পরিবর্তন আনার কথা বলেছেন পরামর্শকরা। একটি হচ্ছে গ্যাসের দাম, অন্যটি হচ্ছে কস্ট রিকভারির হার। তিনি বলেন, ‘বিদেশি কোম্পানিগুলো শুরু থেকেই ১০০ ভাগ কস্ট রিকভারি দাবি করছে। অর্থাৎ তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে তারা যে অর্থ ব্যয় করবে তার পুরোটাই তারা তুলে নেবে। কিন্তু এমন হলে পেট্রোবাংলা কোনও গ্যাস পাবে না।’

ওই কর্মকর্তা জানান, ‘সর্বোচ্চ কস্ট রিকভারির পরিমাণ ৬৫ থেকে ৮০ শতাংশের মধ্যে রাখার পক্ষে পেট্রোবাংলা।এখন গভীর সমুদ্রে প্রতি ইউনিট গ্যাসের দাম সাড়ে ৬ ডলার। বাংলাদেশে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আগ্রহী কোম্পানিগুলো চাইছে, এই দাম বাড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাজারের এলএনজির সমান করতে। একবারে দাম বাড়িয়ে ৮ থেকে ৯ ডলার করার দাবি করেছে তারা। কিন্তু পেট্রোবাংলা এই দাম এতো বেশি বাড়াতে চাচ্ছে না।’

পেট্রোবাংলার জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) শাহনেওয়াজ পারভেজ এ বিষয়ে  বলেন, ‘সংশোধিত মডেল পিএসসি ২০১৮ নামে অভিহিত হবে। পেট্রোবাংলার পক্ষ থেকে সংশোধনীর কাজ শেষ করা হয়েছে। এখন অনুমোদনের জন্য জ্বালানি বিভাগে পাঠানো হয়েছে। চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়ার পরপরই আমরা আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করতে চাই। এমনিতেই সাগরে একটি কূপ খনন করে সেখান থেকে গ্যাস পেতে কমপক্ষে ৯ থেকে ১০ বছর সময় প্রয়োজন। অন্যদিকে দেশীয় কোম্পানি বাপেক্সের পক্ষে সাগরে গ্যাস অনুসন্ধানের মতো অভিজ্ঞতা ও যন্ত্রাংশ নেই। পাশাপাশি অনুসন্ধানে যে পরিমাণ খরচ হবে, বাপেক্সের পক্ষে সেই ঝুঁকি নেওয়াও সম্ভব নয়। তাই বিদেশি কোম্পানিগুলোকে আমরা এই কাজে আগ্রহী করতে চাই।’.

সবমিলিয়ে দেশে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য ব্লক আছে ৪৮টি। এরমধ্যে স্থলভাগে ২২টি এবং সাগরে রয়েছে ২৬টি ব্লক। সাগরের ব্লকগুলোর মধ্যে আবার অগভীর সাগরে ১১টি এবং গভীর সাগরে ১৫টি। স্থলভাগে শেভরন বাংলাদেশ ১২, ১৩ ও ১৪ নম্বর ব্লক থেকে গ্যাস উত্তোলন করছে। ক্রিস এনার্জি ৯ নম্বর ব্লক অর্থাৎ বাঙ্গুরা থেকে গ্যাস তুলছে।

অন্যদিকে সাগরের ৪টি ব্লকে কাজ করছে সান্তোস-ক্রিশ এনার্জি, ওএনজিসি এবং পেসকো দাইয়ু। পেট্রোবাংলা জানায়, সাগরে মোট ৪টি কূপ খনন করার পরিকল্পনা এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত হয়েছে। এরমধ্যে ভারতীয় কোম্পানি ওএনজিসি এসএস-৪ এবং এসএস-৯ নম্বর ব্লকে তিনটি কূপ খনন করবে। অন্যদিকে সান্তোস এসএস-১১ নম্বর ব্লকে একটি কূপ খনন করবে। এছাড়া ডিএস-১২ নম্বর ব্লকে পেসকো দাইয়ু ২ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকায় ত্রিমাত্রিক জরিপের কাজ শুরু করবে চলতি বছরের শেষ নাগাদ। এই জরিপের কাজের পরপরই তারাও একটি কূপ খননের কাজে হাত দেবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে বাংলাদেশের মডেল পিএসসিতে যে গ্যাসের দাম আছে তা বিদেশি কোম্পানিগুলোর কাছে আকর্ষণীয় নয়। সে কারণে কোনও দেশ বাংলাদেশে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। একই কারণে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কোম্পানি কনোকো ফিলিপস সাগরের দুটি ব্লকে জরিপের কাজ করে গ্যাস থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করার পরও কূপ খনন না করে চলে যায়।

পেট্রোবাংলার এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, গভীর সাগরের  দুটি ব্লক এবং অগভীর সাগরের একটি ব্লকে তেল গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য ২০১৬ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর ইওআই (এক্সপ্রেশন অব ইন্টারেস্ট) আহ্বান করে পেট্রোবাংলা। ক্রিশ এনার্জি, পেসকো দাইয়ু ও স্টেটওয়েল আগ্রহ দেখায়। কিন্তু পরে পেট্রোবাংলার পক্ষ থেকে আরএফপি (রিকোয়েস্ট ফর প্রপোজাল) চাওয়া হলে কোনও কোম্পানি তা জমা দেয়নি।

এ অবস্থায় সরকার পিএসসি সংশোধন করে বিদেশি কোম্পানিগুলোকে সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আগ্রহী করার উদ্যোগ নিয়েছে। জানা যায়, জ্বালানি বিভাগের অনুমোদনের পর আইন মন্ত্রণালয়ে মতামত (ভ্যাটিং) এর জন্য পাঠানো হবে। এরপর মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর সংশোধনীটি চূড়ান্ত হবে।