রোহিঙ্গা-বিদ্বেষী হাজারো পোস্ট, অজ্ঞাত কারণে নীরব ভূমিকায় ফেইসবুক কর্তৃপক্ষ

 রোহিঙ্গা-বিদ্বেষী এক হাজারের বেশি পোস্ট ফেসবুকে ঘোরাফেরা করেছে গত সপ্তাহে যেখানে তাদের হত্যা করার আহ্বানসহ ঘৃণাত্মক নানারকম কথাবার্তা দেখা গেছে। এমন তথ্য দিচ্ছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

সংস্থাটির অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ফেইসবুকে কর্তৃপক্ষ এ ধরনের বিষয় ঠেকানোর প্রতিশ্রুতি দেয়া সত্ত্বেও, এই সামাজিক নেটওয়ার্কটিকে এখনো মায়ানমারের এই মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সহিংসতা উসকে দেয়ার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

রয়টার্স বলছে, কিছু কিছু পোস্ট ছয় বছর ধরে অনলাইনে রয়েছে। ফেইসবুকে নিয়মনীতি মোতাবেক জাতিগত কোনো গোষ্ঠীর ওপর ‘সহিংসতা কিংবা অমানবিক’ আক্রমণ নিষিদ্ধ।

যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক সামাজিক নেটওয়ার্ক ফেইসবুক এ ধরনের আক্রমণাত্মক পোস্ট শনাক্ত করার ক্ষেত্রে সাধারণত সাইট ব্যবহারকারীদের ওপর নির্ভর করে, এর সফটওয়্যার বার্মিজ ভাষা বুঝতে যথেষ্ট দক্ষ নয়। ফেইসবুক সব ধরনের ফ্ল্যাগড ম্যাটেরিয়াল(যা নিয়ে কারও আপত্তি আছে) সরিয়ে ফেলেছে।

ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার বার্কলে স্কুল অব ল -এর হিউম্যান রাইটস সেন্টারের সাথে যৌথভাবে অনুসন্ধান চালানো হয়েছিল।

এই প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ওপর বিষয়টি আরও চাপ বাড়িয়ে দিতে পারে যাতে করে তারা এ ধরনের সমস্যা মোকাবেলায় আরও বিনিয়োগ বাড়ায়।

এর আগে জাতিসংঘেরর তরফ থেকে সমালোচনার মুখে পড়ে ফেইসবুক, সেইসাথে মার্কিন এবং ব্রিটিশ রাজনৈতিক নেতারাও সমালোচনা করেন।

২০১৭ সাল থেকে ৭০০,০০০ রোহিঙ্গা মুসলিম মিয়ানমার ছেড়েছে যাদের অনেকেই এখন বাংলাদেশের শরণার্থী ক্যাম্পে রয়েছে।

তারা জানিয়েছে, বার্মিজ সৈন্যরা এবং সন্ত্রাসীরা তাদের সম্প্রদায়ের লোকজনকে হত্যা, ধর্ষণ এবং বাড়ি-ঘর পুড়িয়ে দিয়েছে।

মায়ানমারের সেনারা বলছে, তারা রোহিঙ্গা জঙ্গিদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে এবং রাখাইন রাজ্যে বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্য করে হামলার অভিযোগ তারা অস্বীকার করেছে।

রয়টার্স বলছে, তাদের হাতে আসা অধিকাংশ রোহিঙ্গা-বিরোধী মন্তব্য, ছবি এবং ভিডিও বার্মিজ ভাষায় পোস্ট করা।

সেগুলোতে যা বলা হয়েছে:
• রোহিঙ্গাদের গুলি করার আহ্বান, আগুন লাগিয়ে দেয়া এবং শুকরকে খাওয়াতে বলা হয়।
• গণহত্যার দাবি, একজন লিখেছেন, ‘আমরা তাদের সাথে লড়াই করবো, ঠিক যেভাবে হিটলার ইহুদির দমন করেছেন’।
• মুসলিম-বিরোধী পর্নোগ্রাফিক অশ্লীল ছবি।
• তাদেরকে কুকুর এবং ধর্ষণকারী হিসেবে তুলে ধরা।

এক বিবৃতিতে ফেইসবুক স্বীকার করেছে যে, ঘৃণাত্মক মনোভাব ছড়িয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে কারা দায়ী সেটি খুঁজে বের করার ক্ষেত্রে তারা পিছিয়ে ছিল, ‘মিয়ানমারের মত দেশে যেখানে বহু লোক প্রথম বারের মতো ইন্টারনেট ব্যবহার করছে’। ‘আমরা ভুল তথ্য ছড়ানো বন্ধ করতে এবং ঘৃণা উসকে দেয়া ঠেকাতে সাধ্যমত কঠোর পরিশ্রম করছি’।

গত বছর পণ্য নীতি এবং কার্যক্রম পরিচালনা বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি টিম গঠন করা হয়েছে, অফলাইন থাকা অবস্থায় সম্ভাব্য ক্ষতি ঠেকাতে রিপোর্ট করা কন্টেন্টে দ্রুত সাড়া দেয়া, সক্রিয়ভাবে বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য শনাক্ত করার পদ্ধতির উন্নতি।

রয়টার্স বলছে মায়ানমার সম্পর্কিত বেশিরভাগ তথ্য ফেইসবুক আরেকটি ফার্ম অ্যাকেঞ্চার থেকে আউট-সোর্স করেছে, যেখানে বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্যের রিপোর্ট হলে তা যাচাইয়ের জন্য ৬০ জন ব্যক্তির ওপর নির্ভর করা হয়।

মায়ানমারে ৫০ মিলিয়ন মানুষের বাস, তাদের মধ্যে ১৮ মিলিয়ন নিয়মিতভাবে সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে।

গত মার্চে জাতিসংঘের তদন্তকারীরা জানান, মায়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ উসকে দেয়া পেছনে ফেইসবুক ব্যবহারের ‘বড় ধরনের ভূমিকা ছিল’।

এরপর ফেইসবুক প্রধান মার্ক জাকারবার্গকে জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনায় সামাজিক এই নেটওয়ার্কের সম্পৃক্ততার বিষয়ে মার্কিন সিনেটরদের কাছে জবাবদিহিতার মুখে পড়তে হয় ।

সেসময় তিনি স্বীকার করেন যে তার প্রতিষ্ঠানের আরও বেশি কিছু করা প্রয়োজন ছিল এবং দেশটিতে যা ঘটেছে তাতে ‘ভয়াবহ ট্রাজেডি’ বরে বর্ণনা করেন।

ফেইসবুক করেছে এরকম তিনটি নির্দিষ্ট বিষয় তুলে ধরেন তিনি-
• বার্মিজ ভাষা জানে এমন ডজন-খানেক কন্টেন্ট রিভিউয়ার আনা হয়,
• মায়ানমারের সিভিল সোসাইটির সাথে কাজ ভবিষ্যতে এমন ঘটনা এড়াতে মায়ানমারের সাথে পণ্য আদান-প্রদান।

ব্রিটেনের ডিজিটাল, সংস্কৃতি, গণমাধ্যম এবং খেলাধুলা সংক্রান্ত বিভাগ যারা ফেকনিউজ বা ভুয়া খবর নিয়ে নিজস্বভাবে তদন্ত করেছে, তারা বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য মোকাবেলায় ফেইসবুকের প্রধান কারিগরি কর্মকর্তার তথ্যে সন্তুষ্ট হতে পারেনি।

কত সংখ্যায় ভুয়া অ্যাকাউন্ট শনাক্ত করা গেছে এবং তা সরিয়ে দেয়া হয়েছে সে সম্পর্কে কোন তথ্য দিতে পারেননি তিনি।

কমিটি তাদের রিপোর্টে জানায়, সামাজিক মাধ্যমটি ‘রোহিঙ্গা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য প্রচার বন্ধ করতে কোনকিছু করেছে’ – এমন প্রমাণ দিতে ব্যর্থ হয়েছে।

সূত্র: বিবিসি