রেমিট্যান্সের হিসাবে শুভঙ্করের ফাঁকি

সরকারের তরফ থেকে বারবার বলা হচ্ছে, বাংলাদেশের রেমিট্যান্স আয়ের পরিমাণ বছরে ১৫ থেকে ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। কিন্তু বিদেশিরা কাজ করে বাংলাদেশ থেকে কী পরিমান রেমিট্যান্স নিয়ে যাচ্ছে সে হিসাব দেওয়া হয় না কখনোই। বাংলাদেশিদের রেমিট্যান্স আয় থেকে বিদেশিদের  নিয়ে যাওয়া রেমিট্যান্স বাদ দিলে আসলে কোনও আয়ই থাকে না। কাজেই রেমিট্যান্স আয় নিয়ে বাংলাদেশ যে হিসাব দেয়, তাতে শুভঙ্করের ফাঁকি রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

গত বছর ৮ জুলাই আইডিইবি ভবনে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স (আইডিইবি) আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, দেশে তিন লাখ বিদেশি কর্মরত। দক্ষ জনবলের অভাবে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন তারা। যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভারতীয নাগরিক। জানা গেছে, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ১০ বাংলাদেশি নাগরিক যে পরিমাণ রেমিট্যান্স দেশে পাঠায়,  গড়ে একজন ভারতীয় নাগরিক বাংলাদেশ থেকে সেই পরিমাণ রেমিট্যান্স নিয়ে যায়। দক্ষতার অভাবই এর জন্য দায়ী বলে জানান বিশেষজ্ঞরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশে প্রধানত শ্রমিক হিসেবেই যাচ্ছেন বাংলাদেশি নাগরিকরা। শ্রমিক হিসেবে রাস্তাঘাট পরিষ্কার, বাগান করা, রেস্টুরেন্টে কাজ করে, নির্মাণশিল্প ও বিভিন্ন কারখানায় অত্যন্ত কঠোর পরিশ্রম আর মানবেতর জীবনযাপন করে এ অর্থ দেশে পাঠান তারা। সেই তুলনায় বাংলাদেশে বড় বড় পদে বেশি বেতনে কাজ করেন বিদেশি নাগরিকরা। ভারতের বিপুলসংখ্যক নাগরিক এ দেশে গার্মেন্ট- টেক্সাটাইলসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে লাখ লাখ টাকা বেতনে গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মরত রয়েছেন। বিজিএমইএ’র তথ্য মতে, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক কারখানায় এখন ২২ হাজার গুরুত্বপূর্ণ পদে ভারতীয় নাগরিকরা কর্মরত রয়েছেন।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এর নির্বাহী পরিচালক গত ৩ জানুয়ারি বাংলাদেশের অর্থনীতি পর্যালোচনা বিষয়ক এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, ভারতের রেমিট্যান্স অর্জনে অবদানকারী দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম। এদিক পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব মতে, গতবছর ১০ বিলিয়ন ডলার আয়ের সুযোগ দিয়ে বাংলাদেশ ভারতীয়দের জন্য চতুর্থ বৃহৎ রেমিট্যান্স আয়ের উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০০৯ সালে পাঁচ লাখ ভারতীয় নাগরিক অবৈধভাবে বাংলাদেশে অবস্থান করছিল। তাদের অনেকেই বাংলাদেশে এসেছিলেন টুরিস্ট ভিসা নিয়ে। পরে তারা বাংলাদেশে থেকে এখানকার বিভিন্ন এনজিও, গার্মেন্টস কারখানা, টেক্সটাইল ও তথ্য-প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে কাজে নিযুক্ত হয়। অভিযোগ রয়েছে তারা হুন্ডির মাধ্যমে নিজ দেশ রেমিট্যান্স পাঠায়। ভারত কানাডা, সিঙ্গাপুর, কুয়েত, ফ্রান্স, ইটালি, দক্ষিণ আফ্রিকা, এমনকি অস্ট্রেলিয়া থেকে যা আয় করে তার চেয়ে বেশি রেমিটেন্স আয় করে বাংলাদেশ থেকে। আর বাংলাদেশ থেকে রেমিট্যান্স নেওয়ার তালিকায় ভারতের অবস্থান হচ্ছে এক নম্বরে। জানা গেছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানকারী ১ কোটি বাংলাদেশি দেশে টাকা পাঠায় ১৪ বিলিয়ন ডলারের কমবেশি। সেখানে বাংলাদেশে অবস্থানকারী ১০ লাখের মতো ভারতীয় নাগরিক নিয়ে যাচ্ছেন ১০ বিলিয়ন মাকিন ডলারের রেমিট্যান্স।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম  বলেন, ‘রেমিট্যান্স বাড়াতে দক্ষ জনবল তৈরির কোনও বিকল্প নাই। বাংলাদেশের অদক্ষ ১০০ শ্রমিক বিদেশে যা আয় করে বিদেশি দক্ষ ৫ জন শ্রমিক বাংলাদেশ থেকে সমপরিমাণ রেমিট্যান্স আয় করে। ১৫ থেকে ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ প্রবাস আয়ের বিষয়ে অহংকারের কিছু নাই। কারণ দক্ষতার অভাবে তার চেয়ে বেশি অর্থ বাংলাদেশ থেকে দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। এটি ঠেকাতে হলে দক্ষতা বাড়াতে হবে।’

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি জানান, ‘আমাদের দেশের রেমিটেন্স প্রবাহের প্রবৃদ্ধি সন্তোষজনক। তবে এ প্রবৃদ্ধি আরও বাড়ানো যেতো যদি আমরা আরও দক্ষ শ্রমিক পাঠাতে পারতাম। সরকার এ বিষয়ে নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। যা চলমান রয়েছে। আশা করছি আগামীতে বাংলাদেশের রেমিটেন্স আয় আরও বাড়বে।’

রেমিটেন্স আয় প্রবৃদ্ধি সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির জানিয়েছেন, ‘বাংলাদেশি শ্রমিকরা দক্ষতার অভাবে বেতন কম পান। দক্ষ শ্রমিক পাঠাতে পারলে আমাদের রেমিট্যান্স আয় আরও বাড়তো। বিশ্বজুড়েই এখন দক্ষ শ্রমিকের চাহিদা বাড়ছে। চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে ব্যর্থ হলে আমরা পিছিয়ে থাকবো।’