আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ভিকারুননিসার ছাত্রীদের নিয়ে নানা গুঞ্জন

নিরপদ সড়ক আন্দোলন থেমে গেলেও রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল ও কলেজে ছাত্রীদেরকে নানাভাবে উত্তেজিত করার অপচেষ্টা চলছে। নানা গুঞ্জন ও উসকানিমূলক অপপ্রচার চালাচ্ছে ভেতর-বাহিরের একটি শ্রেণি। গত একসপ্তাহ ধরে শিক্ষার্থীদের নিয়ে ফেসবুকে উত্তেজনাকর পোস্ট দিচ্ছে তারা। এছাড়া আন্দোলন শান্ত করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখা শিক্ষক ও ছাত্রীদের এসএমএস এবং ফোন করে নানা কটূক্তি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটির কিছু বর্তমান ও সাবেক ছাত্রী এবং কয়েকজন শিক্ষক এসব ঘটনার নেপথ্যে আছেন। ঘটনাটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তদন্ত করছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

পুলিশের পক্ষ থেকেও বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন রমনা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মারুফ হোসেন সরদার। তিনি বলেন, আন্দোলনের বিষয়ে কাজ করছে ডিএমপির সাইবার ক্রাইম ইউনিট। কোনো বিশেষ স্কুল বা কলেজ নিয়ে আমরা কাজ করছি না। অন্যান্য কাজের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে আমরা সাধারণভাবে কাজ করছি। যদি কোনো বিশেষ প্রতিষ্ঠানে গুজব সৃষ্টি বা উত্তেজনা ছড়ানোর অপচেষ্টা চলে তবে তা আমরা তদন্ত করে দেখবো।

একাধিক সূত্র জানিয়েছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কার্যকর পদক্ষেপের কারণে গত ৫ আগস্ট স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীরা রাজপথ থেকে ফিরে যায়। শিক্ষার্থীদের শান্ত করতে এরপরও প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তি পর্যায়ে নানা পদক্ষেপ নেয়া হয়। এর অংশ হিসেবে ৬ আগস্ট নগরভবনে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগ রাজধানীর বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের নিয়ে সভা করা হয়। ওই সভায় ভিকারুননিসার ৩৯ ছাত্রী যোগ দেয়। ওই সভাকে পুঁজি করেই মিথ্যা তথ্য দিয়ে গুজব রটানো শুরু করে একটি মহল। এক্ষেত্রে স্কুল শাখার ছাত্রীদেরকে টার্গেট করা হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করে একাধিক ছাত্রী ও শিক্ষক বলেন, সড়ক আন্দোলন থেমে গেলেও নতুন করে সাধারণ ছাত্রীদের মাঝে গুজব ছড়ানো হচ্ছে। বলা হচ্ছে- যারা সভায় গেছে তাদেরকে জোরপূর্বক নেয়া হয়েছে। সেখানে একজনকে বক্তৃতা করতে বাধ্য করা হয়েছে। এ ঘটনার পেছনে স্কুলের পরিচালনা পর্ষদের (জিবি) শিক্ষক প্রতিনিধি (টিআর) ড. ফারহানা খানমসহ কয়েকজন শিক্ষক এমনকি কিছু ছাত্রীকেও দায়ী করে ফেসবুকে প্রচারণা চালানো হচ্ছে।

ওই সভায় যোগ দেয়া এক ছাত্রী জানান, ফেসবুকের প্রচারণা শতভাগই মিথ্যা। মেয়েরা চারটি গাড়িতে করে স্বেচ্ছায় নগরভবনে গেছে। কয়েকজন মেয়ে নিজ থেকেই বক্তৃতা তৈরি করে অধ্যক্ষকে শোনায়। কিন্তু ওইদিন আমরা নগরভবন থেকে ফেরার পর ফেসবুকে নানা ধরণের মিথ্যা প্রচারণা দেখতে পাই। পরে সঠিক তথ্য তুলে ধরে অধ্যক্ষ একটি পোস্ট দেন। কিন্তু তাদের বন্ধু, জুনিয়র-সিনিয়র মিলে ৪ শতাধিক মেয়ে অকথ্য ভাষায় তাকে গালাগাল করেছেন।

অভিযোগ পাওয়া গেছে, ছাত্রীদের উত্তেজিত করতে ড. ফারহানার নামে একটি অডিও ছড়ানো হয়েছে। ওই অডিওতে আন্দোলনে না যেতে ড. ফারহানা ছাত্রীদের বাঁধা দিচ্ছেন, আর শাসাচ্ছেন বলে শোনা যায়। এছাড়া ৬ আগস্ট নগরভবনে নেয়া ছাত্রীদেরকে রেখে তিনি চলে আসছেন বলেও ফেসবুকে গুজব ছড়ানো হয়েছে। এ নিয়ে ড. ফারহানাকে ফোনে এসএমএসেও অকথ্য ভাষায় গালাগাল করা হয়েছে বলেও জানা গেছে।

এ ব্যাপারে ড. ফারহানা খানমের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ছাত্রীদের নিরাপত্তার কথা ভেবে আন্দোলনে যাওয়া ছাত্রীদের তিনি বুঝিয়েছেন সত্য। কিন্তু কাউকে অশোভন ভাষায় কথা বলা ও ধমক দেননি। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অধ্যক্ষ এবং জিবির একজন সদস্যের নেতৃত্বে ছাত্রীদের নগর ভবনে নেয়া হয়। কিন্তু তার নাম করে একটি বানোয়াট অডিও ছড়ানো হয়েছে। তিনি মনে করেন, সাধারণ ছাত্রীদের উসকে দিয়ে নেপথ্যে কোনো দুষ্টচক্র ফায়দা হাসিল করতে চায়। এ কারণে তারা অপপ্রচার ও গুজব ছড়াচ্ছে। এতে সাধারণ কোনো ছাত্রী ন্যূনতম জড়িত নেই।

সর্বশেষ গুজব ছড়ানো হয় গত ৯ আগস্ট। গুজবটি হচ্ছে- সাড়ে ৩ শতাধিক ছাত্রী খাতায় ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ স্লোগান লিখে পরীক্ষা না দিয়ে বেরিয়ে গেছে। এরপর তারা মানববন্ধন করেছে।

খোঁজ-খবর নিয়ে জানা গেছে, বাস্তবে কোনো ছাত্রীই পরীক্ষার খাতায় এ ধরনের স্লোগান লেখেনি। তবে কয়েকজন ছাত্রীরা স্কুল ক্যাম্পাসের ভেতরে মানববন্ধন করেছে। মূলত কয়েকদিনের গুজবে উত্তেজিত হয়েই তারা ওই মানববন্ধন করে। তবে শিক্ষকরা ছাত্রীদের বুঝিয়ে শান্ত করেন এবং কলেজ গেটের বাইরে যাওয়া থেকে বিরত রাখেন।

বিষয়টি নিশ্চিত করে কলেজের অধ্যক্ষ  বলেন, এ ধরণের কোনো ঘটনা আমাদের প্রতিষ্ঠানে ঘটেনি। তারা ওইদিন পরীক্ষার পর ছাত্রীদের খাতা একটি একটি করে চেক করে দেখেছেন কেউ ওই ধরনের স্লোগান লেখেনি। কিন্তু গুজব ছড়ানো হয়েছে। এটি মিথ্য বলে তিনি অভিযোগ করেন।

প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি গোলাম আশরাফ তালুকদার বলেন, শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত ইচ্ছা-অনিচ্ছা থাকতেই পারে। তবে আমাদের সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে কোনো সমস্যা সৃষ্টি হয়নি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।