ভবিষ্যতের জ্বালানি: কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ

পৃথিবীতে যে পরিমাণ জীবাশ্ম জ্বালানি সঞ্চিত রয়েছে, তা দিয়ে বড়জোর আরও ১০০ বছর চলবে। এরপর নতুন জ্বালানিতে অভ্যস্ত হতে হবে। নতুন জ্বালানিতে অভ্যস্ত হওয়ার আগের এই ১০০ বছর চলবে অভ্যস্ত হওয়ার প্রক্রিয়া। কী হবে সেই নতুন জ্বালানি? সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মানুষকে প্রকৃতির কাছেই ফিরে যেতে হবে। সবুজ জ্বালানি অর্থাৎ নবায়ণযোগ্য জ্বালানিই হবে আগামী দিনের ভরসা। মানুষকে পানি, সূর্য আর বায়ুর কাছ থেকে শক্তি সঞ্চয় করে চলতে হবে।

বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, বর্তমানে জ্বালানির চাহিদা ও জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার বিদ্যমান গতিতে চললে ২০৫০ সাল নাগাদ তেল, ২০৬০ নাগাদ গ্যাস এবং ২০৮৮ সাল নাগাদ কয়লার মজুদ শেষ হয়ে আসবে। ফলে মানুষকে বাধ্য হয়েই জ্বালানির বিকল্প উৎস খুঁজে বের করতে হবে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিকল্প উৎস খোঁজার কাজটি হতে হবে আরও ত্বরান্বিত। কারণ, সরকারের প্রক্ষেপণ বলছে, নতুন মজুদ না পাওয়া গেলে ২০৩০ সালের পর গ্যাস আর থাকবে না। দেশে কয়লাখনির গভীরতা বেশি হওয়ায় অনেক খনি থেকে কয়লা পাওয়া প্রায় অসম্ভব। আর কোনও তেলের মজুদ নেই দেশে। সুতরাং এখনই আমদানি নির্ভরতার দিকে ঝুঁকছে বাংলাদেশ।

২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশে ৬৮ লাখ ৪১ হাজার মেট্রিকটন জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়েছে। এখন তরল গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করা হচ্ছে। আগামী বছর নাগাদ দেশে অন্তত দৈনিক এক হাজার ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি আমদানি করা হবে। এই আমদানির পরিমাণ দিনে দিনে আরও বাড়বে। তবে বিশ্বের মজুদ ফুরিয়ে গেলে আমদানি করাও আর সম্ভব হবে না।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উন্নত বিশ্ব এখন থেকেই প্রাকৃতিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে ঝুঁকছে। জাতিসংঘ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রে নবায়ণযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধির দিকে ঝুঁকছে। ক্রমে সৌরশক্তি থেকে, বায়ু থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ কমে আসছে। এক্ষেত্রে নতুন উদ্ভাবন আরও ব্যয় কমিয়ে আনতে পারে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শামসুল আলম বলেন, ‘যে হারে জ্বালানির চাহিদা বাড়ছে তাতে আগামী ৩০ বছরের মধ্যেই বিশ্বের কয়লা, গ্যাস ও তেল ফুরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তাই বিশ্বের উন্নত দেশগুলো এরই মধ্যে নবায়ণযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে। তারা চেষ্টা করছে এই জ্বালানির নতুন নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কার করতে। পাশাপাশি দামও কমিয়ে আনতে।’

তিনি বলেন, ‘এক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থা আরও খারাপ। তাই সরকারের উচিত এখনই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে কাজ শুরু করা। নবায়ণযোগ্য জ্বালানির উন্নয়নে সমন্বিত একটি পরিকল্পনা করা জরুরি। যত দিন যাবে কমতে থাকবে ফসিল ফুয়েল। তাই বিকল্প চিন্তা এখন থেকেই করতে হবে।’

বাংলাদেশ যে এক্ষেত্রে একেবারে বসে রয়েছে তা অবশ্য নয়। ভবিষ্যতের চিন্তা করে নবায়ণযোগ্য জ্বালানিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রচেষ্টার সূচনা এরই মধ্যে করা হয়েছে। সম্প্রতি দেশে একটি পূর্ণাঙ্গ উইন্ড ম্যাপিং-এর কাজ শেষ হয়েছে। এর ফল বিশ্লেষণ করে বলা হচ্ছে, বায়ুশক্তি ব্যবহার করে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে অন্তত ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। দেশের নয়টি স্থানে ২৪ থেকে ৪৩ মাসের বায়ুপ্রবাহের যে তথ্য সংগ্রহ করা হয়, সেই তথ্য পর্যবেক্ষণ করে আমেরিকার ন্যাশনাল রিনিউয়েবল এনার্জি ল্যাবরেটরি (এনআরইএল)। গত মে মাসে সরকারেকে পর্যবেক্ষণের ফল  জানিয়েছে এনআরইএল।

এনআরইএল তাদের পর্যবেক্ষণে বলছে, বাংলাদেশের নয়টি এলাকার বাতাসের গড় গতিবেগ ৫ থেকে ৬ মিটার/সেকেন্ড। বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য যাকে আদর্শ বলছে মার্কিন প্রতিষ্ঠানটি। ভিন্ন ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সংগ্রহ করা বায়ুপ্রবাহের তথ্য পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত ফল জানানোর দায়িত্ব ছিল এনআরইএলয়ের ওপর। সরকারের উইন্ড ম্যাপিং প্রকল্পর মেয়াদ গত জুনে শেষ হয়েছে।

বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হলে একটি পূর্ণাঙ্গ ম্যাপিং দরকার ছিল। সাধারণত ২ দশমিক ৩ থেকে ২ দশমিক ৫ মিটার/সেকেন্ড হলেই বায়ু বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। সেক্ষেত্রে বিদ্যুতের দাম বেশি পড়ে। কিন্তু ৫ থেকে ৬ মিটার/সেকেন্ড বাতাসের গতিবেগ হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক করা সম্ভব। এখন আধুনিক প্রযুক্তি এসেছে; একটি টারবাইন দিয়ে ৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব।

 এ বিষয়ে তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব আনু মুহম্মদ বলেন, ‘দুনিয়াজুড়ে বিকাশমান প্রযুক্তি হচ্ছে নবায়ণযোগ্য জ্বালানি। অন্যদিকে কয়লা, পারমাণবিক এবং তেল-গ্যাস হচ্ছে পুরানো প্রযুক্তি। এগুলো ১৯ শতক, ২০ শতকের প্রযুক্তি। ২১ শতকের প্রযুক্তি হচ্ছে নবায়ণযোগ্য জ্বালানি। চীন, ভারতসহ ইউরোপের দেশগুলো এখন এই জ্বালানির ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে গবেষণা করছে। ফলে দ্রুত এই জ্বালানির সক্ষমতাও বাড়ছে, আবার দামও কমে যাচ্ছে। শুধু দাম নয়, বাতাস, মাটি, পানি সবকিছুকে দূষণমুক্ত রাখবে। শুধু দুষণমুক্তই রাখবে না, পাশাপাশি অর্থনৈতিকভাবেও কয়লা বা পারমাণবিকের তুলনায় ভবিষ্যতে দামও এর কম হবে। এখনই সস্তা হচ্ছে। সামনে আরও সস্তা হবে।’

তিনি বলেন, ‘এই অবস্থায় বাংলাদেশের উচিত হচ্ছে এই খাতে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো। বিদেশি কোম্পানির ওপর নির্ভর না করে তাদের নিজেদের প্রাতিষ্ঠানিক জাতীয় সক্ষমতা বাড়ালে বাংলাদেশের সম্ভাবনা উজ্জ্বল।’

ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তায় বড় সহায়ক হবে সৌরশক্তি। সরকার সারাদেশে ব্যাপকভাবে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা করছে। ক্রমান্বয়ে সৌরবিদ্যুতের দামও কমে আসছে। বলা হচ্ছে, সময় যত গড়াবে ততই সৌরবিদ্যুতের দাম কমে আসবে। শুরুতে সরকার ২০ টাকায় প্রতি ইউনিট সৌরবিদ্যুৎ কেনার চুক্তি করলেও এখন তা নেমেছে ১০ টাকার ঘরে। এই দাম দেশের ভাড়ায় চালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় কম।

জানতে চাইলে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বিডি রহমত উল্লাহ বলেন, ‘এটা খুব সত্য যে ২০৫০ সাল নাগাদ তেল, ২০৬০ নাগাদ গ্যাস এবং ২০৮৮ সাল নাগাদ কয়লার মজুদ শেষ হয়ে যাবে। সর্বোচ্চ পরিমাণ তুললেই এত দিন চলতে পারে। এখন সারাবিশ্ব এ কারণেই নবায়ণযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকেছে। আমাদেরও উচিত ভবিষ্যত জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া।’

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বিদ্যুৎ সংকট সমাধানের আরেকটি পথ হতে পারে জলবিদ্যুৎ। যদিও বাংলাদেশের একার পক্ষে এই জলবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার বিপুল জলরাশিকে কাজে লাগাতে হবে। সেগুলোর মধ্যে প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করা যেতে পারে। ভারতে বিভিন্ন প্রদেশে অন্তত এক লাখ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা রয়েছে। নেপাল, ভুটান ও মিয়ানমারের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আরও দেড় লাখ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদন হতে পারে।

সরকার, বলা চলে, এক্ষেত্রে দূরদর্শিতার প্রমাণ দিয়েছে। এরই মধ্যে সব প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আজ শুক্রবার নেপালের সঙ্গে জল বিদ্যুৎ উৎপাদন বিষয়ে সরকারের একটি সমঝোতা স্মারক সই হতে যাচ্ছে।

এর মধ্যে নেপালে জিএমআর নামে ভারতীয় একটি কোম্পানি জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। তারা বাংলাদেশে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বেচার প্রস্তাবও দিয়েছে সরকারকে। এছাড়া ভারতের রাষ্ট্রীয় কোম্পানি এনভিভিএন নেপাল থেকে ৫০০ থেকে ৯০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বাংলাদেশের কাছে বেচতে আগ্রহী। বাংলাদেশ সরকার বা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ বিক্রয় চুক্তি সইয়ের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

নেপালে ৩০ হাজার মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা থাকলেও দেশটি বর্তমানে সামান্য পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। এখানেও ভারতের বিভিন্ন কোম্পানি কয়েকটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ করার উদ্যোগ নিয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নেপাল ও ভুটানের উদ্যোগের সঙ্গে মিয়ানমারকে যুক্ত করতে পারলে আরও বেশি সুবিধা পাওয়া যাবে। দেশটিতে আরও ৪০ হাজার মেগাওয়াটের জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা রয়েছে। অবশ্য মিয়ানমার এরই মধ্যে বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানির সঙ্গে আলোচনা করছে। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে এখনও বাংলাদেশ মিয়ানমারের সঙ্গে কোনও আলোচনা করেনি। তবে চীনা কোম্পানিগুলো এরই মধ্যে  মিয়ানমারের সঙ্গে কয়েকটি চুক্তি করেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তিন দেশের অনেক এলাকাই এখনও সম্ভাব্যতা জরিপের বাইরে রয়েছে। সঠিকভাবে জরিপ করা সম্ভব হলে তিন দেশ থেকেই আসতে পারে দেড় লাখ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। এত বেশি বিদ্যুৎ যেহেতু তারা ব্যবহার করতে পারবে না তাই প্রতিবেশী হিসেবে আমাদের এখানে বড় রকমের সুযোগ রয়েছে।

তবে এ বিষয়ে পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহম্মদ হোসেইন বলেন, ‘২০৪১ সাল পর্যন্ত আমরা চলবো কয়লা, পরমাণু, এলএনজি আর তেল দিয়ে। এই সময়ের মধ্যে যদি সাগরে তেল-গ্যাস পাওয়া যায় তাহলে জ্বালানি খাতে বাংলাদেশের অবস্থা আরও ভালো হবে। এর পরের সময়টুকু অনিশ্চিত। প্রযুক্তি কোন দিকে যাবে এখন তা বলা সম্ভব হয়। তবে নবায়ণযোগ্য জ্বালানিতে বাংলাদেশ চেষ্টা করে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে এই খাতের প্রযুক্তি যদি আরও উন্নত হয় এবং বাংলাদেশের পরিস্থিতিতে তা যদি সহজলভ্য হয় তাহলে সরকার তা-ই নেবে।