হাজার কোটি টাকার ডালিমের বাজার পুরোটাই বিদেশিদের দখলে

 উন্নত জাত অবমুক্তকরণের উদ্যোগ নেই, দেশের হাজার কোটি টাকার ডালিমের বাজারের পুরোটাই বিদেশিদের দখলে। দেশে প্রচলিত অন্যতম আকর্ষণীয় এই ফলের যেসব জাত রয়েছে তা সবই নিম্নমানের। এখানে ডালিমের অনুমোদিত কোনো জাত নেই। বনিজ্যিকভাবে চাষও হয়না। অথচ এদেশে ডালিমের (বেদানা বা আনার) চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্ভিদ সংগনিরোধ উইং সূত্রে জানা গেছে, বিগত ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে এদেশে প্রায় ৫০ হাজার মেট্রিক টন অর্থাৎ পাঁচ কোটি কেজি বেদানা বা আনার আমদানি করা হয়। প্রতি কেজি ২০০ টাকা হারে যার দাম দাঁড়ায় প্রায় এক হাজার কোটি টাকা। ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে দেশে আনার আমদানি হয়েছিল ৩২৩৯৮.৪১৭ মেট্রিক টন। আর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) হর্টিকালচার উইং এর হিসেবে এসময়ে দেশের ১২৭৬ হেক্টর জমিতে ডালিম উৎপাদন হয় ৬৩৮৫ মেট্রিক টন।

ডিএই এর সাবেক মহাপরিচালক ও বছরব্যাপী ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন শীর্ষক প্রকল্পের জাতীয় পরামর্শক কৃষিবিদ এম. এনামুল হক বলেন, এদেশে উৎপাদিত ডালিম মানের দিক থেকে তেমন সন্তোষজনক নয়। এজন্য বাংলাদেশের এফলের বিপুল চাহিদা মেটাতে প্রতি বছর যথেষ্ট পরিমাণে ডালিম বা বেদানা বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। ডালিম এ দেশের অন্যতম আকর্ষনীয় ফল। গাছের আকার তেমন বড় হয়না। গাছ ও এর পাতা, ফুল, ফল সবই দেখতে অতি সুন্দর। আকার ছোট হওয়ায় এ গাছ টবে বা ছাদে চাষের জন অতি উপযোগী। শোভাবর্ধনকারি গাছ হিসেবে বসতবাড়ির আঙ্গিনায় এ ফল চাষের প্রচলন বেশি। প্রায় সারা বছরই অত্যন্ত পুষ্টি ও অন্যান্য গুণের এ ফলের চাষ করা যায়। ডালিম গাছের ফুলের রং লাল ও দর্শনীয়। একই গাছে পুরুষ ও স্ত্রী ফুল আলাদা ভাবে ফোটে। বিশ্বের অনেকে দেশে এ ফলের বানিজ্যিক চাষের প্রচলন রয়েছে। আমাদের দেশে এর বানিজ্যিক চাষ হয়না। গুরুত্বপূর্ণ এ ফলের চাষ এ দেশে সে ভাবে সম্প্রসারণ হওয়ার তেমন লক্ষণ দেখা যায়না। এখানে ডালিমের উল্লেখযোগ্য তেমন কোনো জাত নেই। স্থানীয় বিভিন্ন জাত নির্বাচনের মাধ্যমে ব্যাক্তিগত পর্যায়ে কিছু চারা কলম বিক্রি করা হয়। কোন কোন নার্সারিম্যান ভারত থেকে কিছু জাতের কলম আমদানি করে উন্নত জাত বলে বিপননে তৎপর। নার্সারীমানরা ‘কান্ডারী’ নামের এক জাতের ডালিমের কলম বিক্রি করে থাকে। এ জাতের ফলের আকার বড়, তবে বীজ শক্ত।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হর্টিকালচার উইং সূত্রে জানা যায়, যথেষ্ট পুষ্টিকর আয়রন ও ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ এ ফলে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি এবং মিনারেল রয়েছে। অসুস্থ্য মানুষের দূর্বলতা দূরীকরণের জন্য এটা উত্তম। রোগীদের স্বাস্থ্য উন্নয়নে ডাক্তাররা ডালিম ফল আহারের পরামর্শ দিয়ে থাকেন। ফল হিসেবে জনপ্রিয় ডালিমের রস হৃদরোগ নিয়ন্ত্রণ ও কুষ্ঠসহ বিভিন্ন রোগনাশক হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। এর গাছের বাকল, পাতা, অপরিপক্ক ফল এবং ফলের খোসার রস পাতলা পায়খানা, আমশয় ও রক্তক্ষরণ বন্ধ করে। রক্তস্রাব ও কফ নিরাময়ে সহায়ক। ডালিম জ্বরের দাহ, অরুচিনাশক, বলকারক ও তৃপ্তী দায়ক। এছাড়া ডালিম জ্যাম ও শরবত তৈরীতেও ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশের সর্বত্র বসতবাড়ির আঙ্গিনায় চাষ হলেও রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁ এবং রংপুরে বেশি হয় ডালিম। ট্রপিক্যাল ও সাবট্রপিক্যাল এলাকার আর্দ্র আবহাওয়ায় বেশি ভালো হয় এই ফল। তবে উষ্ণ ও শুষ্ক আবহাওয়া বেশি উপযোগি। আর্দ্রতা বেশি হলে ডালিমের স্বাদ ভাল হয় না। যে কোনো মাটিতে ভাল জন্মে, তবে কাঁকরময় শক্ত মাটিতেও ডালিম ফলানো যায়।