লাইসেন্সধারী চালক সংকট, ঈদযাত্রায় অনিশ্চয়তা

স্টাফ রিপোর্টার : রাজধানী ঢাকার ভেতরে এবং দূরপাল্লার যান চলাচল শুরু হলেও ঈদের আগাম টিকেট বিক্রি নিয়ে বিপাকে পড়েছেন বাস মালিকরা। পর্যাপ্তসংখ্যক লাইসেন্সধারী চালক না থাকায় ঈদে বাসের শিডিউল কিভাবে নির্ধারণ করা হবে, তা নিয়ে এই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। চালকরা বলছেন, তাদের যে লাইসেন্স আছে তা মাঝারি ধরনের যান চালানোর জন্য অনুমোদিত। দূরপাল্লার বাস ভারি যান হওয়ায় এই লাইসেন্স নিয়ে রাস্তায় বের হওয়া বেআইনি।

সোমবার ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি হাজী আবুল কালাম বলেন, গত বছরের জুলাই মাস থেকে এ বছরের জুলাই পর্যন্ত এক বছরে এক হাজার পাঁচশ ভারি যান রেজিস্ট্রেশন করা হলেও তার বিপরীতে ড্রাইভিং লাইসেন্স হয়েছে মাত্র ছয়শ। এ থেকেই বোঝা যায় কতটা বিপাকে রয়েছে বাস মালিকরা। এ কারণে ঈদে আগাম টিকেট বিক্রি নিয়েও সংকট তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, চালকদের লাইসেন্স না থাকার পেছনে মূলত বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) গাফলতি রয়েছে। এ বিষয়ে ঢাকা জেলা ট্রাক কভার্ড ভ্যানশ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মো. ইনসুর আলী জানান, অনেকের লাইসেন্স আছে কিন্তু মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পর আর নবায়ন করা হয়নি। বিআরটিএ’তে ভোগান্তির কারণে অনেকেই লাইসেন্স করাননি। তাছাড়া এতদিন তারা এমনিতেই গাড়ি চালাতে পেরেছেন, লাইসেন্স দরকার হয়নি। তাই তাগিদও অনুভব করেননি। বিআরটিএ সার্বিক সুযোগ-সুবিধা দিলে সবাই লাইসেন্স করে নেবেন।

গাড়ির মালিকদের সমালোচনা করে তিনি বলেন, অনেকেই ড্রাইভার-হেলপারদের ব্যবহার করে আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছেন। কিন্তু পরিবহন খাতে কাজ করা এসবশ্রমিকদের কোনো ধরনের সুযোগ-সুবিধার কথা কেউ চিন্তাও করেননি। চালকদের কোনো নিয়োগপত্র দেওয়া হয় না। দীর্ঘ দিন থেকে আমরাও ১২ দফা দাবিতে আন্দোলন করছি।

এদিকে, সড়ক আইনের সংশোধিত খসড়া সোমবার (৬ আগস্ট) অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। এ প্রসঙ্গে ইনসুর আলী বলেন, আইনটা ভালো করে পড়ে বুঝে এ বিষয়ে মন্তব্য করা হবে।

অন্যদিকে, যাত্রী কল্যাণ সমিতিরি মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, লাইসেন্সধারী চালক সংকটের মূল কারণ হলো বিআরটিএ’র অনিয়ম। তারা যেভাবে কাজ করছে তাতে আগামী ৫০ বছরেও এই সংকটের উত্তরণ সম্ভব নয়। বিআরটিএ’র পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশে মোট যানবাহনের সংখ্যা ৫০ লাখ। আর বিআরটিএ’র নিবন্ধিত যানবহনের সংখ্যা ৩৫ লাখ। এর বিপরীতে লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে মাত্র ১৮ লাখ।

উল্লেখ্য, গত ২৯ জুলাই রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে কুর্মিটোলা এলাকায় জাবালে নূর পরিবহনের দুই বাসের রেষারেষিতে শহীদ রমিজ উদ্দিন কলেজের দুই শিক্ষার্থীর প্রাণহানি ঘটলে এর প্রতিবাদে এবং নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনে নামে বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা। টানা এক সপ্তাহের আন্দোলনের তৃতীয় দিন থেকে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব নেয় শিক্ষার্থীরা। এতে রাজধানীর ব্যস্ততম সড়কেও ফিরে আসে শৃঙ্খলা। বন্ধ হয়ে যায় অবৈধ যান চলাচল। লাইসেন্সবিহীন চালকরা দায় এড়িয়ে পালাতে গেলে চাপা পড়ে দুই শিক্ষার্থী আহত হন।

এই সচেতনতার হাওয়া লাগে সারাদেশে এবং দেশের বাইরে। অন্যদিকে,শ্রমিকদের নিরাপত্তার প্রসঙ্গ তুলে ঢাকার গণপরিবহন ও দূরপাল্লার বাস বন্ধ করে দেয় পরিবহন খাতের মালিক-শ্রমিকরা। ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া এই উদ্যোগের প্রশংসা করেন ও বিশেষ ট্রাফিক সপ্তাহ ঘোষণা করেন, যা শুরু হয়েছে গতকাল রোববার (৫ আগস্ট)। একইসঙ্গে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তাদের ঘরে ফিরে যেতে আহ্বান জানান তিনি। এরপর প্রধানমন্ত্রী শিক্ষার্থীদের আশ্বাস দেন, তাদের সব দাবি মেনে নেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে আহ্বান জানান, শিক্ষার্থীরা যেন ঘরে ফিরে যায়।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০ জন করে মানুষ মারা যান। যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাব অনুযায়ী, ২০১৭ সালে সারাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ৯৭৯টি। এসব দুর্ঘটনায় ২৩ হাজার ৫৯০ জন যাত্রী, চালক ও পরিবহন শ্রমিক হতাহত হয়েছেন। এর মধ্যে নিহত হয়েছেন ৭ হাজার ৩৯৭ জন।