নতুন সড়ক পরিবহন আইনে জটিলতা বাড়ার শঙ্কা

স্টাফ রিপোর্টার : নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে গতকাল সোমবার সড়ক পরিবহন আইনের খসড়ায় অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ। বিদ্যমান আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি সাতবছর কারাদ-ের বিধান থাকলেও নতুন আইনে বেপরোয়া গাড়ি চালানোর ফলে হতাহতের জন্য সর্বোচ্চ পাঁচবছর কারাদ-ের বিধান রাখা হয়েছে। তবে তদন্তে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হত্যাকা-ের প্রমাণ পাওয়া গেলে দ-বিধির ৩০২ ধারায় মৃত্যুদ-ের বিধান রাখা হয়েছে নতুন আইনে। এদিকে, নতুন আইনে প্রত্যাশার চেয়ে সাজা কম রাখা হয়েছে হয়েছে বলে মনে করছেন আইনজ্ঞরা। এর ফলে আইনে জটিলতা বাড়বে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করছেন তারা। এরআগে সড়কে দুর্ঘটনা কমিয়ে আনতে নয় দফা দাবি জানান আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনকারীরা বেপরোয়া চালকের শাস্তি মৃত্যুদ-ের বিধান রাখার দাবি জানান। কিন্তু অনুমোদিত খসড়ায় বলা হয়েছে, বেপরোয়া গাড়ি চালানোর কারণে কেউ গুরুতর আহত বা কারও মৃত্যু হলো সেক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পাঁচবছরের সাজা হবে।

খসড়ায় আরও বলা হয়েছে, যদি তদন্তে উদ্দেশ্যেপ্রণোদিত হত্যাকা-ের তথ্য পাওয়া যায়, তাহলে দ-বিধির ৩০২ এবং বিশেষ ক্ষেত্রে দ-বিধির ৩০৪ ধারা প্রযোজ্য হবে। অর্থাৎ, চালক ইচ্ছে করলে দুর্ঘটনা এড়াতে পারতেন অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যাকা- ঘটিয়েছেন, সেক্ষেত্রে দ-বিধির ৩০২ অনুযায়ী বিচার হবে। তবে তদন্ত ও তথ্যের ওপর নির্ভর করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তা ঠিক করবে।

রাজধানীতে হাত হারানোর ঘটনার পর মারা যাওয়া তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থী রাজিব হাসানের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে চাওয়া রিটকারী আইনজীবী রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, ‘‘সাজার মেয়াদ বিবেচনায় আইনের খসড়াটি প্রত্যাশা পূরণ করেনি। বরং এই আইনের অধীনে কেউ যদি হত্যাকা- ঘটায়, সেক্ষেত্রে সে এই আইনের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবে। কেননা আইনে বলা হয়েছে, ‘যদি‘ ইচ্ছাকৃতভাবে দুর্ঘটনা তদন্তে প্রমাণিত হয়, তবেই মৃত্যুদ- হবে। এই ‘যদি’ শব্দের কারণেই আসামিদের সাজা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না।’’

নতুন আইন প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘একটি মামলায় অনেক রকমের ঘটনা যুক্ত থাকে। তা প্রমাণ না হলে আসামি খালাস পায়। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনা ঘটলে প্রথমে এক ধারায় মামলা হবে আবার তদন্তে অন্য কিছু পেলে তখন ধারা পরিবর্তন করে আসামিকে মৃত্যুদ- দেওয়া হবে, যা আইন সমর্থন করে না। এর ফলে বিষয়টি চ্যালেঞ্জ (রিট মামলা) করলে আসামি সহজেই খালাস পেয়ে যাবে। এতে আরও আইনি জটিলতা বাড়বে। তাই শুরুতেই হত্যা বা দুর্ঘটনার মামলা করার বিধান পৃথকভাবে থাকতে হবে।’

এই প্রসঙ্গে মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘দ্য মোটর ভিকেলস অর্ডিন্যান্স-১৯৮৩’ এর তুলনায় নতুন আইনের খসড়ায় বেশ কিছু পরিবর্তন এসেছে, যা খুব ভালো হয়েছে। তবে দুর্ঘটনায় সাজার বিধানের ক্ষেত্রে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। কারণ, তিন বছরের সাজা বাতিল করে বিদ্যমান আইনে (দ্য মোটর ভিকেলস অর্ডিন্যান্স) সাত বছর সাজা বহাল রয়েছে। অথচ নতুন আইনের খসড়ায় সর্বোচ্চ ৫ বছরের সাজার বিধান রাখা হয়েছে। কিন্তু অবহেলাজনিত সড়ক দুর্ঘটনায় সাজার মেয়াদ ৭ বছরের বেশি করা উচিত বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছিলেন উচ্চ আদালত। আমরা সে রায়ের কপি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের বিবেচনার জন্য পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু তারা সাজার মেয়াদ না বাড়িয়ে বরং কমিয়ে দিয়েছে। এখানে আমাদের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। কারণ, মানুষের দাবি ছিল সাজা বৃদ্ধি করা।’

এই আইনজীবী আরও বলেন, ‘এটি এখনও খসড়া। সংসদে আইনটি পাস হবে।  তবে সবার দাবি অনুযায়ী সাজা না বাড়ালে দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব হবে না। এ কারণেই সংসদ সদস্যরা সাজার মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করবেন বলে আশা করছি।’

গণতান্ত্রিক আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী বলেন, ‘আইন পরিবর্তনের বিষয়টি সরকারের শুভ উদ্যোগ। কিন্তু আইনের খসড়ায় মৃত্যুদ-ের যে সাজার বিধান রাখা হয়েছে, তাতে বিচার করা নিয়ে আরও জটিলতা দেখা দেবে। আমি মনে করি, এখন আন্দোলনের মুহূর্তে আইনের খসড়াটি অনুমোদন পেয়েছে। কিন্তু অচিরেই সংসদে পাস করার আগে আইনটি সংশোধন করা হবে বলে আশা করি।’

জানতে চাইলে ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, ‘হয়তো প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে, আইনের খসড়াটি দেশে চলমান আন্দোলন পরিস্থিতি সামাল দিতে করা হয়েছে। আমি মনে করি, আরও সময় নিয়ে, বিশেষজ্ঞদের অভিমত নিয়ে, আরও বিচার-বিশ্লেষণ করে সংসদ সদস্যরা আইনটি পাস করবেন।’

প্রসঙ্গত, ১৮৬০ সালের দ-বিধি আইনের ৩০২ ধারায় বলা হয়েছে, ‘কোনও ব্যক্তি যদি খুনের অপরাধ করে, তবে ওই ব্যক্তি মৃত্যুদ-ে, যাবজ্জীবন কারাদ-ে দ-িত হবে এবং তদুপরি অর্থদ-েও দ-িত হবে।’ এছাড়া, ৩০৪ ধারায় বলা হয়েছে, ‘কোনও ব্যক্তি যদি খুন নয় এমন শাস্তিযোগ্য নরহত্যা করে, তবে সে ব্যক্তি যাবজ্জীবন কারাদ-ে অথবা দশ বছর পর্যন্ত যেকোনও মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদ-ে দ-িত হবে এবং তদুপরি অর্থ দ-েও দ-িত হবে। যদি যে কার্যটি কর্তৃক মৃত্যু অনুষ্ঠিত হয়, সে কার্যটি মৃত্যু সংঘটনের উদ্দেশ্য নিয়ে করা হয় অথবা এমন দৈহিক জখম করার উদ্দেশ্য নিয়ে করা হয়, যে দৈহিক গঠনের ফলে মৃত্যু ঘটতে পারে অথবা দশ বছর পর্যন্ত যেকোনও মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদ-ে অথবা অর্থ দ-ে অথবা উভয়বিধ দ-েই দ-িত হবে, যদি যে কার্যটি কর্তৃক মৃত্যু অনুষ্ঠিত হয়, যে কার্যটি সম্পাদনের কারণে মৃত্যু হতে পারে বলে জানা থাকে, অথচ কার্যটি মৃত্যু সংঘটনের উদ্দেশ্যে করা হয়নি যে, দৈহিক জখম করার কারণে মৃত্যু ঘটতে পারে।’