ছাত্র আন্দোলন রাজপথ ছাড়ার ঘোষণা দিল শিক্ষার্থীরা

নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের ৯ দফা দাবি বাস্তবায়নে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপে সন্তোষ প্রকাশ করে রাজপথ ছেড়ে ক্লাসে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। তাদের এ ঘোষণা স্বাগত জানিয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন বলেছেন, তোমরা ক্লাসে ফিরে যাও, তোমাদের যৌক্তিক দাবি বাস্তবায়নে আমাদের যতটুক করণীয় সেটা করবো।

সোমবার (৬ আগস্ট) ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন আয়োজিত ‘নিরাপদ সড়ক ও আমাদের করণীয়’ শীর্ষক মুক্ত আলোচনায় ঢাকার শীর্ষস্থানীয় সব স্কুল-কলেজসহ ৪২১টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা এতে অংশ নেন। সেখান থেকে এ ঘোষণা আসে।

এসময় উপস্থিত ছিলেন ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের (দক্ষিণ) সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদ, ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খান মোহাম্মদ বিলাল, বিভিন্ন ওয়ার্ডের কাউন্সিলররা।

মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে ভিকারুন নেসা নুন স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষার্থী ঐশী দাস বলেন, ‘সরকার আমাদের দাবি মেনে নিয়েছেন, আমরা রাজপথে থাকবো না ক্লাসে ফিরে যেতে চাই।’ ঐশী প্রত্যেক স্কুলের সামনে ট্রাফিক পুলিশের ব্যবস্থা করার জন্য মেয়রের প্রতি অনুরোধ জানান।’

আজিমপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মাইশা বলেন, ‘আমাদের প্রত্যেক শিক্ষার্থীর দাবি ছিল নিরাপদ সড়ক। সরকার আমাদের সেই দাবির যুক্তি বিবেচনায় তা মেনে নিয়েছে। সেজন্য আমরা সবাই ক্লাসে ফিরে যাবো।’

আজিমপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের অপর এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমাদের আন্দোলন কিসের জন্য? আমরা একটি নিরাপদ সড়ক চাই। কিন্তু সেই দাবি আদায়ের আন্দোলন করতে গিয়ে দেখেছি পুলিশ তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করে না। তারা এটা না করলে কীভাবে নিরাপদ সড়ক হবে?’

এ সময় মেয়র বলেন, বিএনপি-জামায়াতের পরাজিত শক্তি তাদের গুণ্ডা বাহিনী লেলিয়ে দিয়ে শিক্ষার্থীদের অহিংস আন্দোলনকে সহিংস করছে। তারা ভুয়া আইডিকার্ড, ইউনিফর্ম পরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ঢুকে আতঙ্ক ছড়ানোর চেষ্টা করছে, দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। তাদের কোনো ষড়যন্ত্রই সফল হবে না। ছাত্র-শিক্ষক, শ্রমিকসহ সর্বস্তরের জনগণ তাদের সমুচিত জবাব দেবে।’

সাঈদ খোকন বলেন, ‘ছাত্রদের যৌক্তিক দাবির পক্ষে সর্বস্তরের মানুষের সমর্থন ছিল, আছে। কিন্তু গত দু’তিন দিন ধরে সেই অহিংস আন্দোলনের রূপ পরিবর্তন হয়েছে। আমরা দেখেছি ছোট্ট সোনামনিদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার জন্য পরাজিত শক্তি নিপুণভাবে ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছে। যারা দেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল, যারা মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা করেছিল সেই চক্রান্তকারীদের প্রজন্ম ছাত্রদের ইউনিফর্ম পরে, আইডিকার্ড ঝুলিয়ে রাজপথে সাধারণ মানুষের ওপর আক্রমণ শুরু করেছে।’

তিনি বলেন, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে এই দেশে মুক্ত অধিকার প্রকাশের সব সুযোগ সরকার দিয়েছে। শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করার জন্য সমস্ত সুবিধা দেয়া হয়েছে। সেই সুযোগ ব্যবহার করে যদি ব্যাগের মধ্যে পাথর, অস্ত্র নিয়ে বঙ্গবন্ধু কন্যার ওপর হামলা চালানোর চেষ্টা করা হয় বা হামলা করা হয় তাহলে বাংলার জনগণ বসে থাকবে না।

পরে লেখক ও গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ শিক্ষার্থীদের এই যৌক্তিক আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়ে তাদের ক্লাসে ফেরার আহ্বান জানান।

অনুষ্ঠানে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদ, ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খান মোহাম্মদ বিলালসহ ডিএসসিসির বিভিন্ন ওয়ার্ডের কাউন্সিলররা বক্তব্য দেন।

উল্লেখ্য, রাজধানীর কুর্মিটোলায় বিমানবন্দর সড়কে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের ওপর উঠে পড়ে জাবালে নূর পরিবহনের একটি বাস। এতে ঘটনাস্থলেই নিহত হয় শহীদ রমিজউদ্দীন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র আবদুল করিম ওরফে রাজীব (১৭) এবং একই কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্রী দিয়া খানম মীম (১৬)।

ওই ঘটনার দিন থেকে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের টানা আন্দোলনে অনেকটা অচল হয়ে পড়েছে রাজধানী। রাজধানী ছাড়াও দেশের কয়েকটি জেলায় এ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে।

বুধবার (১ আগস্ট) গ্রেফতার করা হয়েছে জাবালে নূর পরিবহনের দুর্ঘটনা ঘটানো বাসের মালিক শাহাদৎ হোসেন ও চালক মাসুম বিল্লাহকে। বাতিল করা হয়েছে জাবালে নূর পরিবহনের রুট পারমিট ও নিবন্ধন।

রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সড়কে অবস্থান নিয়ে আন্দোলন করছে শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনের সময় চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষা করছে তারা। এর মধ্যে বেশ কিছু যানবাহনের ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে।

এমন্তাবস্থায় সোমবার (৬ আগস্ট) মন্ত্রিসভার বৈঠকে চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়েছে ‘সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮’ এর খসড়া। সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের সাজা ও পাঁচ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রেখে সড়ক পরিবহন আইনের এ খসড়া অনুমোদন দেয়া হয়। সকাল ১০টায় সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সভাকক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

নতুন আইন অনুযায়ী বেপরোয়াভাবে বা অবহেলা করে গাড়ি চালানোর কারণে কেউ আহত বা নিহত হলে দণ্ডবিধির ৩০৪ (খ) ধারায় মামলা দায়ের হবে। আর এই ধারায় সাজা সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড এবং সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা। বর্তমান এই আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ তিন বছর কারাদণ্ডের বিধান আছে।

তবে গাড়ি চালানোর কারণে কারো নিহত হওয়ার ঘটনা তদন্তে হত্যা বলে প্রমাণিত হলে ফৌজদারি আইনে মৃত্যুদণ্ডের বিধান প্রয়োগ হতে পারে।

নতুন আইনে বলা হয়েছে, গাড়ি চালানোর অপেশাদার লাইসেন্স পেতে হলে অষ্টম শ্রেণি পাস ও ১৮ বছর হতে হবে। পেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য ২১ বছর হতে হবে।

এছাড়া লাইসেন্সেপ্রাপ্ত চালকের জন্য থাকবে ১২ পয়েন্ট। অপরাধ করলে পয়েন্ট কাটা যাবে। এভাবে ১২ পয়েন্ট শেষ হয়ে গেলে লাইসেন্স বাতিল হবে। অপরদিকে কোনো অপরাধী ড্রাইভিং লাইসেন্স পাবেন না। আগে যেসব অপরাধী লাইসেন্স পেয়েছে তা বাতিল করা হবে।