‘কেউ ছবি তুলবি না, ক্যামেরা ব্যাগে ঢুকিয়ে ফেল’

ডেস্ক রিপোর্ট: নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় রাজধানীর সাইন্সল্যাব এলাকায় সাংবাদিকদের ওপর ছাত্রলীগ ও যুবলীগ কর্মীরা হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। রবিবার বেলা ২টার দিকে সংবাদ সংগ্রহের সময় তাদের ওপর হামলা চালানো হয়।

হামলায় যারা আহত হয়েছেন: রবিবার দুপুরে সায়েন্সল্যাব থেকে ধানমন্ডি ২ নম্বর হয়ে জিগাতলা পর্যন্ত অন্তত দশজন সাংবাদিক হামলার শিকার হয়। তাদের মধ্যে রয়েছেন- আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এপি’র (অ্যাসোসিয়েট প্রেস) ফটোসাংবাদিক এ এম আহাদ, প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক আহমেদ দীপ্ত, পাঠশালার দুই শিক্ষার্থী রাহাত করীম ও এনামুল কবীর, দৈনিক বণিক বার্তার পলাশ শিকদার, অনলাইন নিউজ পোর্টাল বিডি মর্নিংয়ের আবু সুফিয়ান জুয়েল, দৈনিক জনকণ্ঠের জাওয়াদ, প্রথম আলোর সিনিয়র ফটোগ্রাফার সাজিদ হোসেন, চ্যানেল আইয়ের সামিয়া রহমান, মারজুক হাসান, হাসান জুবায়ের ও এন কায়ের হাসিন।

হামলাকারীরা তাদের ক্যামেরা ও মোবাইল ছিনিয়ে নেয়। কারো কারো ক্যামেরা ভেঙে ফেলা হয়। তাদের দিকে ইট-পাটকেল ছোঁড়া হয়। বেশ কয়েকজন সাংবাদিককে লাঠি, লোহা ও কাঠ দিয়ে পিঠিয়ে গুরুতর আহত করা হয়।

এ এম আহাদের সঙ্গে হামালার শিকার হন দৈনিক বণিক বার্তার ফটোসাংবাদিক পলাশ শিকদার। তিনি বলেন, ‘দুপুর ১টা ৫৫ মিনিটের দিকে আমি, আহাদ ভাই ও একটি অনলাইনের ফটোসাংবাদিক সায়েন্স ল্যাব ওভারব্রিজের নিচে ছিলাম। এ সময় ঢাকা কলেজের দিক থেকে ছাত্রলীগের একটি মিছিল আসে। মিছিলের সামনে ছয়-সাতজন ছাত্র হাতে জিআই পাইপ নিয়ে প্রথমে আমাদের ওপর চড়াও হয়। এ সময় আহাদ ভাইয়ের মাথা ফেটে যায়।’

‘আমরা দৌঁড়ে সামনের দিকে এগিয়ে যায়। সেখানে দু’জন নার্স রাস্তাতেই আমাদের সহযোগিতা করছিল। এ সময় ছাত্রলীগের ছেলেরা আরেক দফা এসে আহাদ ভাইকে পেটাতে থাকে। আমাকেও টেনে নিয়ে পেটানো শুরু করলে আমি দৌঁড়ে রাস্তার ওপারে চলে যাই।’

তিনি বলেন, ‘আহাদ ভাইকে প্রথমে ল্যাবএইড হাসপাতালে নিয়ে গেলে তারা ভর্তি করাতে চায়নি। এমনকি হাসপাতালেও ঢুকতে দিতে চাইনি। পরে ঢাকা ট্রিবিউনের ফটোসাংবাদিক মেহেদী এগিয়ে এসে জোর করে ল্যাবএইডের জরুরি বিভাগে ঢোকায়।’

প্রায় একই সময়ে ছাত্রলীগের হামলার শিকার হন প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক আহমেদ দীপ্ত। হামলার পরপরই তিনি জানান, দুপুর ২টার দিকে তিনি সায়েন্স ল্যাব ফুটওভার ব্রিজের নিচে শিক্ষার্থীদের অবস্থান দেখতে এগিয়ে যান। এ সময় অতর্কিত ভাবে ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মী লাঠিসোঁটা নিয়ে তার ওপর চড়াও হয়। বেধড়ক পেটানোর পর অন্য সহকর্মীরা তাকে উদ্ধার করেন।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আহমেদ দীপ্তর পিঠ ও হাতসহ শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। তবে তার অবস্থা আশঙ্কামুক্ত। এ এম আহাদের মাথা ফেটে গেছে। তার মাথায় বেশ কয়েকটি সেলাই দিতে হয়েছে। তিনিও এখন আশঙ্কামুক্ত।

ছাত্রলীগের বেধড়ক মারধরের শিকার হয়ে একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি আছেন ফটোগ্রাফার বিষয়ক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পাঠশালার শিক্ষার্থী ও ফ্রিল্যান্স ফটোগ্রাফার রাহাত করীম। দুপুর ২টার দিকে সায়েন্সল্যাবের ফুটওভার ব্রিজের নিচে তাকে মারধর করা হয়।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ফটোসাংবাদিক বলেন, ‘দুপুর ২টার পরপরই ঢাকা কলেজের দিক থেকে আসা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা যখন সায়েন্স ল্যাবের দিকে আসে, তখন রাহাত করীম ফুটওভার ব্রিজে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছিলেন। এ সময় লাঠি হাতে যুবকরা প্রথমে তার দিকে ইট-পাটকেল ছোঁড়ে। সেখানে আরও অন্তত ১০-১২ জন ফটোগ্রাফার ছিলেন। রাহাত নিচে নেমে আসলে তার ক্যামেরা কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু রাহাত ক্যামেরা না ছাড়ায় তাকে মারধর করে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। তাকে মারতে মারতে গেঞ্জি ছিঁড়ে ফেলা হয়। তার মাথা ফেটে রক্ত বের হলে নেতাকর্মীদের কয়েকজন এগিয়ে এসে অন্যদের থামায়।

ছাত্রলীগের বেপরোয়া হামলার সময় ল্যাবএইডের উল্টো দিকে ধানমন্ডি ৩ নম্বর সড়কের পাশে হ্যাপি আর্কেডের সামনে অবস্থান নেন বেশ কয়েকজন সাংবাদিক। দুপুর ২টার একটু পর ঘটনাস্থলে থাকা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের অপরাধ বিষয়ক প্রধান প্রতিবেদক লিটন হায়দার বলেন, ‘ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা সায়েন্সল্যাবের দিক থেকে ধাওয়া দিলে আমরা দৌঁড়ে এসে হ্যাপি আর্কেডের সামনে এসে অবস্থান নিই। এসময় ছাত্রলীগের ছেলেরা আমাদের ওপর চড়াও হয়। তারা দূর থেকে আমাদের ওপর বৃষ্টির মতো ইট-পাটকেলও নিক্ষেপ করে। একপর্যায়ে ওরা লাঠিসোঁটা ও চাপাতি হাতে নিয়ে এগিয়ে আসে। আমাদের সেখান থেকে চলে যেতে বলে এবং কোনও ছবি তুলতে নিষেধ করে।’

ধানমন্ডি ২ নম্বর সড়কে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের কাছে হেনস্তার শিকার হন চ্যানেল আইয়ের রিপোর্টার সামিয়া রহমান। সেখানে বেশ কয়েকজন ফটোসাংবাদিক ও রিপোর্টার উপস্থিত ছিলেন। এই প্রতিবেদক নিজেও সেখানে অবস্থান করে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের হুমকি-ধমকি প্রত্যক্ষ করেন।

ঘটনাস্থলে থাকা ইংরেজি দৈনিক নিউ এজের স্টাফ রিপোর্টার মুক্তাদির রশীদ বলেন, ‘হেলমেট পরিহিত ছাত্রলীগ পরিচয়ধারীরা এসে বলে, ‘আজকের সব কিছুর সমস্যার মূলে সাংবাদিকরা।’ তারা ধারালো অস্ত্র নিয়ে সাংবাদিকদের কাছে এসে বলে, ‘কেউ ছবি তুলবি না।’ ‘সব ক্যামেরা ব্যাগে ঢুকিয়ে ফেল’ বলে ধমকাচ্ছিল। যেসব ছাত্রলীগ নেতারা আশপাশ দিয়ে যাচ্ছিল তারা সবাই তেড়ে আসার পাশাপাশি অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালি করছিল এবং ধমকাচ্ছিল। তারা বলছিল, ‘কালকে যদি কোনও ছবি দেখি কাউকে ছাড়বো না।’ এর ভেতরে একজন বলে ওঠে, ‘একজন যদি ছবি তোলে সবাইকে কোপাবো।’ তবে পুলিশের খুব কাছাকাছি হওয়ায় তারা জিগাতলার দিকে যেতে থাকে। উপায়ন্তর না দেখে পুলিশ সাংবাদিকদের সরে যেতে অনুরোধ করে।”

দুপুর ১টার দিকে ঢাকা সিটি কলেজের সামনে নাগরিক টিভির একটি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। নাগরিক টিভির ক্যামেরাম্যান রিপন হাসান জানান, দুপুর ১টার দিকে তারা ঢাকা সিটি কলেজের সামনে অবস্থান করছিলেন। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা যখন মিছিল নিয়ে জিগাতলার দিকে যাচ্ছিল, তখন একদল যুবক আমাদের গাড়িটিতে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। আমরা সঠিক তথ্য প্রকাশ করছি না- এই অভিযোগে হামলা করে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের মহাসচিব সোহেল হায়দার চৌধুরী বিডি২৪লাইভকে বলেন, ‘সাংবাদিকরা সমাজের দর্পণ। সমাজের যা কিছু ভালো-মন্দ বা শুদ্ধ-অশুদ্ধ তা তুলে ধরে। সাংবাদিকদের ওপর হামলা কখনও কাম্য হতে পারে না। এটি গণতন্ত্র ও সমাজ বিকাশের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলবে।’

তিনি বলেন, ‘সব সরকারের সময়েই সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালানো হয়। কিন্তু বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সাংবাদিকবান্ধব। সেই আওয়ামী লীগের আমলে যখন এ ধরনের ঘটনা দেখি এবং হামলার সুষ্ঠু বিচার না হতে দেখি, তখন মর্মাহত হই। হামলাকারীরা যে দেলেরই হোক তাদের দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবি জানাই।’

সাংবাদিকদের মারধরের বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের রমনা বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মারুফ হোসেন সরদার বলেন, ‘আমাদের কাছে কেউ এমন কোনও অভিযোগ করেনি। অভিযোগ পেলে অবশ্যই আমরা মামলা নেবো এবং আইনগত ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।’