কলেজ সরকারিকরণের আদেশ জারি শিগগির

অবশেষে ‘সরকারিকৃত কলেজশিক ও কর্মচারী আত্তীকৃত বিধিমালা ২০১৮’ জারি করেছে শিা মন্ত্রণালয়। এরই আলোকে এখন বেসরকারি কলেজগুলো সরকারীকরণের আদেশ জারি করবে মন্ত্রণালয়। শিগগিরই এ কার্যক্রম শুরু হবে বলে জানা গেছে মন্ত্রণালয় সূত্রে। তবে, সদ্যঘোষিত এ বিধিমালা যে বিধানটি নিয়ে বিতর্ক ও ক্ষোভ ছিল সরকারি কলেজশিক্ষকদের, তা সুরাহা হয়নি। বরং তাদের শঙ্কা-উৎকণ্ঠা সত্য হলো। এর ফলে সরকারি কলেজের বিসিএস পরীক্ষায় শিক্ষকদের সাথে নব্য জাতীয়করণকৃত কলেজশিক্ষকদের মধ্যে বিরোধ স্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হলো। এ দিকে, জারিকৃত বিধিমালার প্রেক্ষিতে সরকারি কলেজশিক্ষকদের একক সংগঠন বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির জরুরি বৈঠক ডাকা হবে বলে গতকাল বিকেলে নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন সমিতির মহাসচিব শাহেদুল খবির চৌধুরী। তিনি বলেন, আমাদের শঙ্কাই সত্য হলো। জারিকৃত বিধিমালায় নব্য জাতীয়করণের জন্য মনোনীত কলেজশিক্ষকদের নন-ক্যাডার রাখা হলেও ক্যাডারভুক্তির সুযোগ রাখা হয়েছে। এটাই আমাদের কাছে সবচেয়ে বড় শঙ্কা ও হতাশার বিষয়। এ নিয়ে আগামী ১০ আগস্ট সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠক রয়েছে। সেখানে এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। তবে আগামী ৩-৪ দিনের মধ্যেই জরুরি আরেকটি বৈঠক করার পরিকল্পনা রয়েছে।

তিনি জানান, আজ (গতকাল) প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালে ১৮টি মহিলা কলেজ জাতীয়করণ করা শিক্ষকদের মামলার রায় হয়েছে। তাতে, ক্যাডার সার্ভিসের দাবির পক্ষেই রায় এসেছে। এ ছাড়া উচ্চ আদালতে অপর একটি রিট রয়েছে। এ সব বিষয়কে বিবেচনায় রেখেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে উল্লেখ করে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির মহাসচিব শাহেদুল খবির চৌধুরী আরো বলেন, জাতীয়করণকৃত কলেজশিক্ষকদের ক্যাডারভুক্তির বিরোধিতা এবং এ সংক্রান্ত বিধি বাতিলের দাবি থেকে আমরা সরে যাচ্ছি না। সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকে আপত্তিকর ধারাটি বাতিলের ব্যাপারে পরবর্তী সিদ্ধান্ত ও কর্মসূচি নেয়া হবে।

বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের আলোকে ২০১৬ সাল থেকে দফায় দফায় সর্বমোট দেশের ২৮৩টি বেসরকারি কলেজকে জাতীয়করণের জন্য মনোনীত করে। জাতীয়করণের পর এসব কলেজে কর্মরত শিক্ষকদের অবস্থান ও মর্যাদা কী হত, তা নিয়ে শুরু থেকেই বিতর্ক ও ক্ষোভ চলে আসছিল সরকারি কলেজশিক্ষকদের মধ্যে। সরকারি কলেজশিক্ষকদের দাবি হচ্ছে, আত্তীকৃত শিক্ষকরা ক্যাডারে প্রবেশ করতে পারবে না। কারণ ওই সব শিক্ষক বিসিএসের মতো প্রতিযোগিতামূলক কোনো পরীক্ষায় অংশ না নিয়েই কলেজে চাকরি করে আসছিলেন। এখন ঢালাও জাতীয়করণের সুযোগে তারা সরকারি কলেজে চাকরির সুযোগ পেতে পারেন না। কারণ তা শিক্ষার মান ও যোগ্যতা নিয়ে নানা প্রশ্ন ও অভিযোগ রয়েছে। তবে সরকার তাদের সব সুযোগসুবিধা দিলেও তাতে আপত্তি নেই। তবে, তাদের ক্যাডারভুক্তির কোনো সুযোগ নেই।

বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির তীব্র আপত্তি ও বিরোধিতার পরও শিক্ষা মন্ত্রণালয় গত ৩১ জুলাই ‘সরকারিকৃত কলেজশিক ও কর্মচারী আত্তীকৃত বিধিমালা ২০১৮’ জারি করেছে। এ বিধিমালায় বলা হয়েছে, কোনো শিক শিা ক্যাডারে অন্তর্ভুক্তির উদ্দেশ্যে ওই ক্যাডারের প্রভাষক পদে নিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা থাকলে পিএসসির অধীনে গৃহীত পরীায় অংশ নিতে পারবেন। কোনো শিক ওই পরীায় উত্তীর্ণ হয়ে পিএসসি কর্তৃক সুপারিশপ্রাপ্ত হলে নিয়োগকারী কর্তৃপ তাকে শিা ক্যাডারে প্রভাষক পদে নিয়োগ দিতে পারবে। যোগদানের তারিখ থেকে শিা ক্যাডারে অন্তর্ভুক্ত হবেন। ক্যাডারে অন্তর্ভুক্ত হওয়া শিকেরা বিভিন্ন সরকারি কলেজ ও দফতরে বদলি হতে পারবেন।

তবে, জারিকৃত বিধিমালায় আরো বলা হয়েছে, সাধারণভাবে সরকারি হতে যাওয়া কলেজের অধ্য, উপাধ্য, সহকারী অধ্যাপক ও প্রভাষকেরা নন-ক্যাডার হিসেবে নিজ নিজ পদে নিয়োগ পাবেন। তাদের চাকরি বদলিযোগ্য হবে না। বিধিমালায় নব্য জাতীয়তরণকৃত কলেজের শিকদের বদলি, পদায়ন এবং মর্যাদা কী হবে তা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ সংক্রান্ত বিধানাবলি সংযোজন করা হয়েছে।

বিধিমালা জারির পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে শিক্ষাসচিব মো: সোহরাব হোসাইন বলেন, বিধিমালার আলোকেই এখন সুপারিশকৃত কলেজগুলো শিগগিরই জাতীয়করণের জন্য জিও জারি হবে।

জানা গেছে, সরকারীকরণের জন্য চূড়ান্ত করা ২৮৩টি কলেজ প্রায় ১২-১৫ হাজারের মতো শিক্ষক রয়েছেন। এসব শিক্ষক ক্যাডারভুক্ত হলে বর্তমানে কর্মরত কলেজশিক্ষকরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং চাকরির ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠতা হারাবেন। ফলে দীর্ঘদিন চাকরি করেও সিনিয়রিটি থেকে বঞ্চিত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। এ কারণেই ক্যাডার শিক্ষকেরা নব্য জাতীয়করণকৃতদের বিরোধিতা করে আসছেন। এ দাবিতে অর্থাৎ আত্তীকৃতদের ক্যাডারভুক্তির বিরোধিতা করে ২০১৬ সাল থেকেই নানা কর্মসূচি ও এর প্রতিবাদ করে আসছিলেন। অপর দিকে, জাতীয়করণের জন্য সুপারিশকৃত কলেজশিক্ষকরাও পাল্টা দাবি করে আসছিলেন, যে সরকারীকরণ করা হলে অতীতের মতোই তাদের ক্যাডারভুক্ত করে যোগদানের তারিখ থেকেই সিনিয়রিটি গণনা করতে হবে। অন্যথায় তারা উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হবেন।

এ বিধিমালা নিয়ে দীর্ঘদিন সরকারি কলেজশিক্ষকদের মধ্যে যেমন উৎকণ্ঠা ছিল তেমনি সরকারীকরণ হতে যাওয়া বেসরকারি কলেজ শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে ছিল দীর্ঘ প্রতীক্ষা। সরকারি কলেজশিক্ষকদের উৎকণ্ঠায় রেখে এবং জাতীয়করণকৃতদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হলেও বিতর্ক থেকেই গেল।

গতকাল বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির প্রচার সচিব মো: কামাল উদ্দিন স্বাক্ষরিত এ সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সরকারীকরণের লক্ষ্যে নির্বাচিত বেসরকারি কলেজশিক্ষকদের জন্য গত ৩১ জুলাই জারিকৃত বিধিমালার ব্যাপারে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছে। প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন অর্থাৎ এসব শিক্ষকের চাকরি বদলিযোগ্য না হওয়া এবং প্রথমবারের মত সমিতির দাবি ‘নন-ক্যাডার হিসেবে শিক্ষকদের সরকারীকরণ’ করার বিষয়াবলি অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় সমিতির পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষাসচিব ও মাউশির মহাপরিচালকসহ সবাইকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানাচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্ট কলেজশিক্ষকদের ক্যাডারভুক্তির সুযোগ বিধিমালায় অন্তর্ভুক্ত করায় শিক্ষা ক্যাডারে চরম হতাশা ও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। সমিতি শিক্ষা ক্যাডারে ওই ধরনের পার্শ্বপ্রবেশ বন্ধে অব্যাহত প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে।