ফিলিস্তিনিদের কিনতে চান ট্রাম্প!

ফুলকি অনলাইন: ইসরায়েলি দখলদারিত্বের অবসানের মধ্য দিয়ে নিজ ভূমিতে অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিকেই মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার কেন্দ্রীয় বিবেচ্য মনে করে ফিলিস্তিনিরা।

স্বনামধন্য ব্রিটিশ সাংবাদিক ও মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষক বরার্ট ফিস্ক মন্তব্য করেছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প তার কথিত ‘শতাব্দীর সেরা শান্তিচুক্তি’র মধ্য দিয়ে ডলার দিয়ে ভূমিতে অধিকার প্রতিষ্ঠার সেই ফিলিস্তিনি দাবিকে কিনে নিতে চান।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট-এ লেখা এক নিবন্ধে ট্রাম্পের কথিত শতাব্দীর সেরা চুক্তির সমালোচনা করে বলেছেন, ওই চুক্তিতে ট্রাম্প ফিলিস্তিনিদের ভূমির অধিকার ছেড়ে টাকার বন্যায় ভাসার প্রস্তাব দিয়েছেন।

উল্লেখ্য, দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংকট নিরসনে এক শান্তি পরিকল্পনা উপস্থাপনের কথা জানিয়েছিলেন ট্রাম্প। তার সেই পরিকল্পনা অল্পদিনের মধ্যেই উন্মোচিত হবে বলে জানা গেছে।

ট্রাম্প প্রশাসন এই পরিকল্পনার বিষয়ে বিস্তারিত কিছুই জানাচ্ছে না। ফলে কথিত শতাব্দীর সেরা এই প্রস্তাব নিয়ে অনেকেই সন্দিহান হয়ে উঠেছেন।

ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের মধ্যকার দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা শান্তি আলোচনা ভেঙে পড়ে ২০১৪। ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিয়ে দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পথে হাঁটছিল আগের মার্কিন প্রশাসন।

এই পরিকল্পনা অনুসারে ১৯৬৭ সালের ৪ জুন ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের সীমান্ত আলাদা করা হয়েছিল। এতে পূর্ব জেরুজালেমকে ধরা হয়েছিল ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের রাজধানী।

২০১৭ সালের ডিসেম্বরে আন্তর্জাতিক রীতি ভঙ্গ করে জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী স্বীকৃতি দেয় ট্রাম্প প্রশাসন। এরপর ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ ঘোষণা দেয়, যুক্তরাষ্ট্র মধ্যস্ততাকারীর উপযুক্ত নয়, মার্কিন মধ্যস্ততায় ইসরায়েলের সঙ্গে কোনও শান্তি আলোচনায় যোগ দেবে না তারা।

ফলশ্রুতিতে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা বন্ধ করে দেয় ফিলিস্তিন। পাল্টা পদক্ষেপও নেয় যুক্তরাষ্ট্র। জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের সংস্থায় পরিকল্পিত সহযোগিতার অর্ধেক তহবিল বাতিল করে।

মে মাসে প্রকাশিত মার্কিন বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস-এপি’র এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আগামী মাসে (জুনে) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বহুল প্রত্যাশিত মধ্যপ্রাচ্য শান্তি পরিকল্পনা উন্মোচন করার পরিকল্পনা করছে তার প্রশাসন।

এই পরিকল্পনায় ফিলিস্তিনিদের জন্য পশ্চিম তীর ও গাজায় যুক্তরাষ্ট্রের মানবিক ও উন্নয়ন সহযোগিতা কমিয়ে ফিলিস্তিনকে আরও বিচ্ছিন্ন করা হতে পারে।

ট্রাম্পের কথিত শান্তি পরিকল্পনা এখনও উন্মোচিত হয়নি। তবে ফিস্ক তার নিবন্ধে জানিয়েছেন, এরইমধ্যে ৫৩ লাখ ফিলিস্তিনি শরণার্থীর জন্য আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠান জাতিসংঘের ত্রাণ ও কর্ম সংস্থা (আনওয়ারা) তাদের কর্মী ছাটাই শুরু করেছে।

গত সপ্তাহেই শুধু গাজা থেকেই ১১৩ জন কর্মী ছাটাই করেছে প্রতিষ্ঠানটি। ১৯৪৯ সাল থেকে ফিলিস্তিনিদের দেখভাল করা আনওয়ারা এরইমধ্যে ৪ কোটি ৯০ লাখ ডলারের তহবিল সংকটে ভুগছে।

প্রতিষ্ঠানটির ৩০ হাজার ফিলিস্তিনি চিকিৎসক, নার্স, শিক্ষক ও অন্য ধরনের কর্মীরা এখন বেকারত্বের শঙ্কায় ভুগছে। ফিস্ক জানিয়েছেন, আর এভাবেই গাজার ক্লান্ত আর হতদরিদ্র মানুষেরা এখন ক্ষুধার হুমকির মুখে। ৫৩ বছর বয়সী ছয় সন্তানের এক বাবা সম্প্রতি বলেছেন ৩২ বছর আনওয়ারায় কাজ করার পর বেকার হয়ে গেছেন তিনি।

দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট-এ লেখা নিবন্ধে ফিস্ক মনে করিয়ে দিয়েছেন, একমাস আগে জ্যারেড কুশনার মন্তব্য করেছেন ‘আমার বিশ্বাস রাজনীতিবিদদের আলোচনায় ফিলিস্তিনি জনগন কম মূল্য পায়।

তারাই এখন দেখবে একটি চুক্তি কিভাবে তাদের বদল ঘটায় আর তাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম নতুন সুযোগ, আরও বেশি কাজ ও বেশি বেতনের চাকরি এবং একটি সমৃদ্ধ জীবন পাবে।’

তার এই মন্তব্যের আগে ফিস্ক বলেছিলেন, এটা ভূমির অধিকার ফিরিয়ে দিয়ে শান্তি নিশ্চিতের পরিবর্তে অর্থের বিনিময়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা; ডলারের বিনিময়ে ফিলিস্তিনির রাজধানী জেরুজালেম কেড়ে নেওয়া।

ইহুদি উপনিবেশের অবসান আর নিজ ভূমিতে প্রত্যাবাসন এবং আরও অনেক অধিকারকে ডলার দিয়ে কিনে নেওয়া। সত্যিকার অর্থে এক ট্রাম্পীয় সমাধান।

গত বছর ডিসেম্বরের নিউ ইয়র্ক টাইমস প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্পের ইসরায়েল-ঘেষা জামাতা জ্যারেড কুশনারের মস্তিষ্কপ্রসূত সম্ভাব্য শান্তি পরিকল্পনায় সৌদি আরব, মিসর, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও জর্ডানে যাত্রী পরিবহনসহ টেলিযোগাযোগ স্থাপন করতে পারবে ইসরায়েল।

চুক্তিতে ইসরায়েল-ফিলিস্তিনের মধ্যে ভূ-খণ্ড বিনিময়ের কথা বলা হলেও কেন এবং কোন ভূ-খণ্ডের সঙ্গে কোন ভূ-খণ্ড বিনিময় করা হবে তা উল্লেখ করা হয়নি। নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর সেই প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসকে রাজি করাতে চুক্তির আওতায় সুন্নি আরব দেশগুলো ফিলিস্তিনকে কয়েকশ মিলিয়ন অর্থ সহায়তা দেবে।

৩ আগস্ট (শুক্রবার) প্রকাশিত নিবন্ধে ফিস্ক লিখেছেন, প্রথমে ট্রাম্প জেরুজালেম ইসরায়েলিদের দিয়ে দিলেন। ফিলিস্তিনিরা যখন এতে ভয় পেল না তখন তিনি মানবিক সহায়তায় কাঁটছাট আনলেন আর তাদের নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার প্রচেষ্টা চালালেন।

তখন তরুণ কুশনারের বদান্যতায় ট্রাম্প তাদের উপনিবেশিক দখলদারিত্ব অবসানের ‘বিশাল, অনৈতিক, ইহুদিবিদ্বেষী, নাৎসীদের মতো বর্ণবাদী দাবি’ থেকে বেরিয়ে আসার বিনিময়ে ‘চূড়ান্ত চুক্তিতে’ টাকায় ভাসিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দিলেন।

ফিস্ক তার নিবন্ধে এই বাস্তবতা সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন, ‘এভাবে ফিলিস্তিনিদের হৃদয় হয়তো শূন্য থেকে যাবে তবে তাদের পেট থাকবে পূর্ণ। তাদের আশার মৃত্যু ঘটতে পারে কিন্তু তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে থাকবে অর্থ।’