কুড়িগ্রামে জেএমবির শীর্ষ দুই নেতাসহ আটক ৩, অস্ত্র উদ্ধার

কুড়িগ্রাম সংবাদদাতা : কুড়িগ্রাম জেলার চর রাজীবপুর, রৌমারী ও চিলমারী উপজেলার সীমান্তবর্তী ব্রহ্মপুত্র নদের দুর্গম দিয়ারার চরে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) একটি আস্তানা পাওয়া গেছে। দিয়ারার চর এখন নবগঠিত ঢুষমারা থানার অন্তর্গত। পুলিশ সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও বগুড়ার ডিবি যৌথ অভিযান চালিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদের দুর্গম দিয়ারার চরের জঙ্গি আস্তানা থেকে জেএমবির সামরিক শাখার দুই নেতাসহ তিনজনকে আটক করেছে। বগুড়ার পুলিশ সুপার আলী আশরাফ ভূঞা কুড়িগ্রাম থেকে বিদেশি অস্ত্র-গুলিসহ তিনজনকে আটকের তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

বৃহস্পতিবার রাতে জঙ্গি আস্তানা থেকে অস্ত্র উদ্ধার ও তিনজনকে আটক করলেও বিষয়টি পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে গণমাধ্যমকে জানাতে শনিবার সংবাদ সম্মেলন ডেকেছে। তাদের কাছ থেকে বিদেশি পিস্তল, চারটি গুলি, এক কেজি বিস্ফোরক পাউডার, আধা লিটার সালফিউরিক অ্যাসিড ও গ্রেনেড তৈরির সরঞ্জামসহ তোফাজ্জল হোসেন ওরফে তোতা মিয়া (৩০), রফিকুল ইসলাম (৩০) ও আবদুল হামিদ (৬০) নামের তিনজনকে আটক করা হয়। তারা তিনজনই কুড়িগ্রাম জেলার নবগঠিত ঢুষমারা থানার ও রাজীবপুর উপজেলার দিয়ারার চরের বাসিন্দা।

পুলিশের দাবি, আটক তোফাজ্জল হোসেন জেএমবির কুড়িগ্রাম জেলার ইছাবা বা সামরিক শাখার প্রধান। রফিকুল ইসলাম জেএমবির রাজীবপুর, রৌমারী ও চিলমারী অঞ্চলের সামরিক শাখার প্রধান। আবদুল হামিদ জেএমবি দাওয়াহ শাখার সক্রিয় সদস্য।

এর আগে গত রবিবার গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখা এবং বগুড়া জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখা যৌথভাবে রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার তিস্তা নদীবেষ্টিত দুর্গম বাগডহড়া চরে (মিনা বাজার) অভিযান চালিয়ে ১৫টি গুলিসহ একটি অত্যাধুনিক একে-২২ বোর রাইফেল, দুটি বিদেশি ৭ পয়েন্ট ৬৫ এমএম পিস্তল ও দুটি ম্যাগাজিন, দুটি বর্মিজ চাকু ও নগদ ৫৫ হাজার নগদ টাকাসহ জেএমবির শীর্ষ চার নেতাকে আটক করে।

আটক করা ব্যক্তিরা হলেন রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার কুড়িবিশ্বা দোলাপাড়া গ্রামের ডিম ব্যবসায়ী মো. আজহারুল ইসলাম ওরফে ওয়ানুর (৩২), একই উপজেলার তিস্তা নদীর দুর্গম চর বাগডহড়ার বাসিন্দা ও চর বাগডহড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. আকরামুজ্জামান ওরফে মুকুল (২৬), চর বাগডহড়ার বাসিন্দা মো. ফারুক ওরফে সাজু (২২) এবং একই চরের পল্লি চিকিৎসক মো. আবদুল হাকিম ওরফে মিলন (২৪)।

পুলিশ সূত্র জানায়, দিয়ারার চরের অবস্থান ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত কুড়িগ্রামের রাজীবপুর, রৌমারী ও চিলমারীর সীমান্তবর্তী দুর্গম এলাকায়। এর উত্তরে রৌমারী, পূর্বে ভারতের মেঘালয় রাজ্য, দক্ষিণ ও পশ্চিমে জামালপুর ও গাইবান্ধা জেলা। সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা ছাড়াও সামরিক প্রশিক্ষণের জন্য এমন দুর্গম এলাকায় আস্তানা গেড়ে ছিল জেএমবি।

সেখানে জেএমবির শীর্ষ নেতা ও বর্তমানে বাংলাদেশে পুরোনো জেএমবির সব সাংগঠনিক শাখার প্রধান সমন্বয়ক মো. খোরশেদ আলম ওরফে মাস্টার ওরফে জিয়া ওরফে শামিল ওরফে উদয় (৩৮), পুরোনো জেএমবির রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের দাওয়াহ বিভাগের প্রধান মো. শহীদুল্লাহ ওরফে ইয়ামিন ওরফে গোলাপ ওরফে নাদিদ (৪৫), পুরোনো জেএমবির রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের সামরিক প্রধান মো. নূর হক ওরফে ওমর ওরফে ওসমান (৩০) এবং চট্টগ্রাম বিভাগের দাওয়াহ শাখার প্রধান হাদীসহ (৩৮) শীর্ষ নেতাদের যাতায়াত ছিল। এছাড়া গোপন আস্তানায় সামরিক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি জেএমবির কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করায় স্থানীয় একজন ইউপি চেয়ারম্যানকেও হত্যারও ছক কষেছিল জঙ্গিরা।

পুলিশের ওই সূত্র আরো বলেন, গত বছরের মার্চ-এপ্রিল মাসে বগুড়ার একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে আনা হয়েছিল রাজধানী ঢাকার হোলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলার অন্যতম পরিকল্পনাকারী জাহাঙ্গীর আলম ওরফে রাজীব গান্ধীকে।

পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে রাজীব গান্ধী উত্তরাঞ্চলে দুর্গম চরাঞ্চলে গোপন আস্তানা গেড়ে জঙ্গি প্রশিক্ষণের তথ্য দিয়েছিলেন। রাজীব গান্ধীর কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ এক বছর ধরে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করতে তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্র নদের চরাঞ্চলে জঙ্গি আস্তানার খোঁজে অনুসন্ধান চালায়। এক বছরেরও বেশি সময় পর গত রবিবার রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার বাগডহড়া চরে অভিযান চালিয়ে অস্ত্রসহ শীর্ষ জঙ্গিদের গ্রেপ্তার করে। বৃহস্পতিবার রাতে কুড়িগ্রামের দিয়ারার চরে অভিযান চালিয়ে জেএমবির শীর্ষ দুই নেতাসহ তিনজনকে আটক করা হয়।