মোবাইল অপারেটররা ৩৫টির বেশি প্যাকেজ রাখতে পারবে না

স্টাফ রিপোর্টার: দেশের পাঁচটি মোবাইল ফোন অপারেটরের ভয়েস ও ইন্টারনেট প্যাকেজের সংখ্যা বর্তমানে ছয় শতাধিক। একেক অপারেটরের রয়েছে শতেক প্যাকেজ। এত প্যাকেজের ভিড়ে মোবাইল ব্যবহারকারীরা সঠিক প্যাকেজটি বেছে নিতে জটিলতায় পড়েন। কখনও কখনও তাদের বিরক্তির উদ্রেক হয়। আর অপারেটরদের অতি বাণিজ্যিক প্যাকেজের অফারে ধন্দে পড়ে যান মোবাইল ব্যবহারকারীরা। এ জটিলতা থেকে গ্রাহকদের মুক্তি দিতে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রতিটি অপারেটরের জন্য সর্বোচ্চ ৩৫টি প্যাকেজের সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে প্যাকেজের সংখ্যা আরও কমানো হতে পারে বলে জানা গেছে।

মোবাইল অপারেটর সূত্রে জানা গেছে, পাঁচটি মোবাইল অপারেটরের মোট প্যাকেজের সংখ্যা বর্তমানে ৬১৭টি। এর মধ্যে গ্রামীণফোনের ১০২, রবি ও এয়ারটেলের ২৫৮টি (মতান্তরে ১৩৯টি), বাংলালিংকের ৭৬ এবং টেলিটকের রয়েছে ৪২টি। সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিটি অপারেটরকে তাদের প্যাকেজের সংখ্যা (ভয়েস ও ইন্টারনেট মিলিয়ে) ৩৫টিতে নামিয়ে আনতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গত ১ জুলাই থেকে এই নির্দেশ কার্যকর কথা বলা হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেন, ‘অপারেটরগুলোকে প্যাকেজের সংখ্যা সর্বোচ্চ ৩৫ করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গত ১ জুলাই থেকে এই নির্দেশ কার্যকর করতে বলা হয়েছে। যদি কেউ নির্দেশ না মানে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

তিনি মনে করেন, ‘মোবাইল অপারেটরদের শত শত প্যাকেজ জনগণের ওপর কী প্রভাব পড়ে, তা কখনও তারা মূল্যায়ন করেনি। বরং ইচ্ছে মতো তারা প্যাকেজ তৈরি করেছে।’

মন্ত্রী আরও বলেন, ‘প্যাকেজের সংখ্যা ৩৫ করলেই হবে না, আমি এই সংখ্যাটাও রিভিউ করতে বলেছি। যেসব প্যাকেজে জনগণের কল্যাণ হয়, জনগণ সরাসরি জড়িত এবং উপকারভোগীÍ সেসব প্যাকেজ রাখা হবে। সেক্ষেত্রে প্যাকেজের সংখ্যা আরও কমতে পারে।’ তিনি উল্লেখ করেন, যেহেতু প্যাকেজের অনুমোদন বিটিআরসি দেয়, ফলে বিটিআরসি বিষয়টি কঠোরভাবে রিভিউ করবে।

প্রসঙ্গত, ২০১৬ সালের শেষ দিকে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ মোবাইল ফোন সেবায় বিদ্যমান প্যাকেজের সংখ্যা কত, তা জানতে চেয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসিকে চিঠি দেয়। ওই চিঠিতে জানতে চাওয়া হয়েছিল, অপারেটরগুলোর মোট প্যাকেজ, অনুমোদনহীন প্যাকেজের সংখ্যা, যেসব প্যাকেজ অটো-রিনিউ হয়, সেসব প্যাকেজের তালিকা এবং গ্রাহকের সমস্যা হয়, এমন কী কী সেবা বিদ্যমান আছে, যেগুলো গ্রাহকরা বুঝতে পারেন না। চিঠির জবাবের পর ভয়েস ও ইন্টারনেট প্যাকেজগুলো কমানোসহ তখন গ্রাহকবান্ধব কিছু নির্দেশনা জারির উদ্যোগ নেওয়ার কথা ছিল। আর প্যাকেজের সংখ্যা ১০ থেকে ২০টার মধ্যে নামিয়ে আনার কথা শোনা গিয়েছিল।

এ প্রসঙ্গে বাংলালিংকের হেড অব করপোরেট অ্যাফেয়ার্স তাইমুর রহমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘টেলিটক ছাড়া অন্য অপারেটরের প্যাকেজের চেয়ে বাংলালিংকের প্যাকেজের সংখ্যা কম (৭৬টি)। আমরা এগুলো আরও ‘সিম্পলিফাই’ ও ‘এফিশিয়েন্ট’ করার চেষ্টা করছি।

তিনি বলেন, ‘আসলে প্যাকেজ তৈরি হয় গ্রাহকের প্রয়োজন অনুসারে। কোনও গ্রাহক পাঁচ টাকা, কোনও গ্রাহক ৫০০ টাকা, কোনও গ্রাহক আবার দেড় হাজার টাকার প্যাকেজ চান। ফলে সবার কথা মাথায় রেখেই প্যাকেজ তৈরি করতে গিয়ে সংখ্যা বেড়ে যায়। আমরা চেষ্টা করছি গ্রাহকবান্ধব প্যাকেজ তৈরি করতে।’

তাইমুর রহমান বলেন, ‘নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি’র সঙ্গে মোবাইল অপারেটরগুলোর নিয়মিত বৈঠক হচ্ছে। বৈঠকে আমাদের কাছে জানতে চাওয়া হয়’ আমাদের (অপারেটর) প্যাকেজের সংখ্যা কত,কতটা কমিয়েছি ইত্যাদি। আমরা আমাদের অবস্থান তুলে ধরছি। আশা করি, একটা যৌক্তিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে।’

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, যেসব প্যাকেজ অটো-রিনিউ হয়, সেসব প্যাকেজ বন্ধ করা এবং প্যাকেজের সংখ্যা কমানোর মতো সিদ্ধান্তও আসতে পারে। এক্ষেত্রে যুক্তি হলোÍ মোবাইল অপারেটররা যত প্যাকেজ অফার করে, বাস্তবে এত প্যাকেজের কোনও প্রয়োজন নেই। গ্রাহককে স্বস্তি দিতে পারে এবং সাশ্রয়ী করে তোলে, এমন প্যাকেজ অফারের প্রতি জোর দিতেই এই উদ্যোগ বলে জানা গেছে।

এদিকে অনুমোদনহীন প্যাকেজের বিষয়েও খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। এর আগে গ্রামীণফোনের গো ব্রডব্যান্ড ও বাংলালিংকের আইকন প্যাকেজের অনুমোদন না থাকায়, বিটিআরসি এগুলোকে অবৈধ বলে ঘোষণা করে। গো ব্রডব্যান্ড প্যাকেজের জন্য বিটিআরসি গ্রামীণফোনকে ৩০ কোটি টাকা এবং আইকন প্যাকেজের জন্য বাংলালিংককে ৯২ কোটি টাকা জরিমানা করে।

ভয়েস বা ইন্টারনেট প্যাকেজ চালুর ক্ষেত্রে তিন-চার বার বা আরও বেশি বাটন প্রেস পদ্ধতি চালু করা যায় কিনা, তাও বিবেচনায় রয়েছে সংশ্লিষ্টদের। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে কোনও প্যাকেজ চালুর ক্ষেত্রে অন্তত দু’বার মোবাইল ফোনের বাটন প্রেস বা স্পর্শ করতে হয়। স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোনও প্যাকেজ চালুর সুযোগ নেই। তারপরও মোবাইল ব্যবহারকারীদের ভোগান্তি দূর করতে কীভাবে আরও সহজ প্যাকেজ চালু করা যায়, তা ভাবা হচ্ছে। মোবাইল ফোনে কোনও প্যাকেজ গ্রাহকের অজ্ঞাতসারে চালু হয় মূলত ব্যবহারকারীর অজ্ঞতা বা মেসেজ না পড়ে ইয়েস বাটন চাপার ফলে। মোবাইল ব্যবহারকারীদের বড় একটা অংশ গ্রামে বা প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাস করেন। ফলে সবাই এগুলো ঠিকমতো বুঝতে পারেন না। এই সমস্যা দূর করা গেলে ব্যবহারকারীরা আরও সহজে মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে পারবেন।