আদালতের নির্দেশের ৯ মাস পরেও বন্ধ হয়নি হাইড্রোলিক হর্ন

স্টাফ রিপোর্টার: দেশের উচ্চ আদালতের নির্দেশের ৯ মাস পেরিয়ে গেলেও সারাদেশে সম্পূর্ণরুপে বন্ধ হয়নি যানবাহনের হাইড্রোলিক হর্ন। ফলে হাইড্রোলিক হর্নে সৃষ্ট শব্দ দূষণে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ছেন অনেকেই। আদালতের আদেশের বিষয়ে ট্রাফিক পুলিশ বলছে, হাইড্রোলিক হর্ন বন্ধে অভিযান চলছে নিয়মিত। কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা।

হাইড্রোলিক হর্ন বন্ধের বিষয়ে বর্তমান অবস্থা, ক্ষতিকর দিক ইত্যাদি নিয়ে প্রিয়.কমের সঙ্গে কথা হয় এক চিকিৎসক, আইনজীবী ও ট্রাফিক পুলিশের কর্মকর্তার সঙ্গ।ে

জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের শিশু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আব্দুল্লাহ শাহরিয়ার বলেন, ‘হাইড্রোলিক হর্নের কারণে মানুষের কানের ক্ষতি হয়। এ রকম হর্নের কারণে ৮৫ ডেসিবেল কম্পাংকের শব্দের উৎপন্ন হয়। যা কানের জন্য খুবই ক্ষতিকর। এ কারণে বধির হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এবং সড়ক পার হওয়ার সময় দুর্ঘটনার শিকার হতে পারে পথচারীরা। শুধু হাইডোলিক হর্ন নয়, মাইক, টিভি, সিডির শব্দও কানের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এ জন্য সরকারের উচিত এ বিষয়ে আইন যথাযথভাবে প্রয়োগ করা।’

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সহ-সভাপতি ব্যারিস্টার সফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আদালতের নির্দেশ অমান্য করে যারা রাস্তা-ঘাটে হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহার করছেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। আদালত অবমানননা যেন না হয় সেজন্য বিআরটিএ এবং ট্রাফিক পুলিশ অবশ্যই ভূমিকা রাখবেন।’

এ ছাড়া আদালতের নির্দেশনা মেনে হাইড্রোলিক হর্নের আমদানি ও বাজারজাতের বিরুদ্ধে জোরাল ব্যবস্থা গ্রহণ করাও প্রয়োজন বলে মনে করেন এই আইনজীবী।

আর আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘হাইড্রোলিক হর্ন এখনও কিছু জায়গায় শোনা যায়। এতে করে অনেকেরই কানের সমস্যা হচ্ছে। আদালতের আদেশ মানা হচ্ছে, তবে সেভাবে নয়। সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক পুলিশ যদি এ বিষয়ে কঠোর হয় তাহলে সম্পূর্ণভাবে এটি বন্ধ হয়ে যাবে । এ জন্য পুলিশ প্রসাশনকে সচেষ্ট হওয়া দরকার।’

ট্রাফিক পূর্ব বিভাগের ডিসি ড. কামরুজ্জামান বলেন, ‘হাইড্রোলিক হর্ন বন্ধে আমরা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছি। অভিযানের সময় সামনে হাইড্রোলিক হর্ন পেলে সেটি জব্দ করি। আদালতের আদেশ অনুযায়ী আমাদের কাছে অনেকগুলো হর্ন জমা পড়েছে। তবে, কতগুলি জমা পড়েছে সেটির সঠিক পরিসংখ্যান এই মুহূর্তে দিতে পারব না। হাইড্রলিক হর্ন বন্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে।’

২০১৭ সালের আগস্ট মাসে রাজধানীতে শব্দ দূষণ রোধে সব ধরনের যানবাহনে হাইড্রোলিক হর্ন বা উচ্চ শব্দবিশিষ্ট হর্ন ব্যবহার বন্ধে পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দিয়েছিল হাইকোর্ট। পরিস্থিতির বিষয়ে আদালতে একটি প্রতিবেদন জমা দিতেও নির্দেশ দেয়। এরপর সে বছরের ৫ নভেম্বর রাজধানীতে হাইড্রোলিক হর্ন বন্ধের নির্দেশনার অগ্রগতি সংক্রান্ত প্রতিবেদন হাইকোর্টে দাখিল করে ট্রাফিক পুলিশ। এতে সন্তুষ্ট না হয়ে একটি সম্পূরক আবেদন করেন রিটকারী।

সে আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ৫ নভেম্বর বিচারপতি রেজা-উল হক ও বিচারপতি মোহাম্মদ উল্লাহর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রাজধানীসহ সারা দেশের হাইড্রোলিক হর্ন বন্ধের আদেশ দেয়।

পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি), পুলিশের বিভাগীর কমিশনার (ডিআইজি) বাংলাদেশে রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) চেয়ারম্যান ও যুগ্ম কমিশনারের (ট্রাফিক) প্রতি এ নির্দেশ দেওয়া হয়।

এর আগে ২০১৭ সালে রাজধানীতে যানবাহনে হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহার বন্ধে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা চেয়ে মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ রিট আবেদন করে।

আর ২০১৭ সালের ২২ আগস্ট রিটকারী মনজিল মোরসেদের দায়েরকৃত এক রিট আবেদেনের পরিপেক্ষিতে ২৩ আগস্ট রাজধানীতে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হাইড্রোলিক হর্ন বন্ধের নির্দেশ দেয় হাইকোর্ট। ওই আদেশে হাইড্রোলিক হর্ন আমদানি এবং বাজারে যেসব হাইড্রোলিক হর্ন আছে সেগুলো সাত দিনের মধ্যে জব্দের নির্দেশ দিয়ে বলা হয়েছিল, ২৭ অগাস্টের পর যদি ঢাকার রাস্তায় কোনো গাড়িতে হাইড্রোলিক হর্ন বাজানো হয়, তাহলে ওই গাড়িও জব্দ করতে হবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্যানুযায়ী, প্রতি এক হাজার জনের মধ্যে একজন জীবনের কোনো-না-কোনো সময় বধির হয়ে যেতে পারেন। এ ছাড়া প্রতি এক হাজার জনের মধ্যে একজন বধিরতা নিয়ে জন্ম নেন। বধির মানুষের জন্য যোগাযোগে শব্দ কোনো ভূমিকাই রাখে না। কিন্তু এমন কেউ নেই যে তার জীবদ্দশায় কানে শোনার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলতে চাইবে। শব্দদূষণ থেকে বধিরতা ছাড়াও নানা জটিল রোগের সৃষ্টি হতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী, ৩০টি কঠিন রোগের কারণ ১২ রকমের পরিবেশদূষণ, যার মধ্যে শব্দদূষণ অন্যতম। শব্দদূষণের কারণে রক্তচাপ বৃদ্ধি, হৃদস্পন্দনে পরিবর্তন, হৃৎপি-ে ও মস্তিষ্কে অক্সিজেন কমে যেতে পারে। এ জন্য শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরা, বমি বমি ভাব, বমি হওয়া, দিক ভুলে যাওযা, দেহের নিয়ন্ত্রণ হারানো, মানসিক ক্ষতিসহ বিভিন্ন ধরনের অসুস্থতা তৈরি করে। শব্দদূষণের ক্ষতির হাত থেকে রক্ষার জন্য বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন পদক্ষেপ পরিলক্ষিত হয়।