ছয় মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৩০২৬, কেন নিরাপদ করা যাচ্ছে না ঢাকার সড়ক

স্টাফ রিপোর্টার: রাস্তায় বাসের প্রতিযোগিতায় রবিবার দুই শিক্ষার্থীর প্রাণহানির পর গণপরিবহনের অরাজক অবস্থা নিয়ে আবারো বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে ঢাকাবাসী। রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক বন্ধ করে সোমবার প্রতিবাদ জানিয়েছে ঢাকার বেশ কয়েকটি স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা। আর দুর্ঘটনার পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে নৌ পরিবহন মন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া নিয়ে রবিবার থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে ব্যাপক সমালোচনা। ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে গত কয়েক বছর ধরেই সরকার ও বিশ্লেষক নানা মহলেই আলাপ আলোচনা চলছে। কিন্তু কোন পরিবর্তনই আসেনি। কেন কোন একটি কাঠামোয় আনা যাচ্ছে না গণপরিবহন ব্যবস্থাকে?

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্যানুযায়ী সারা দেশে গত জানুয়ারি মাস থেকে জুন মাস পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনায় তিন হাজার ২৬ জন মানুষ নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি ঘটনা আলোচিত হবার পর সংশ্লিষ্ট চালককে গ্রেপ্তার ও মামলার মত তাৎক্ষণিক কিছু ব্যবস্থা নেয়া হলেও দৃশ্যত বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি। বাংলাদেশের গণপরিবহন ব্যবস্থাকে গুছিয়ে একটি কাঠামোর মধ্যে আনার জন্য ২০০৫ সালে একটি পরিকল্পনাও তৈরি করা হয়েছিল।

কিন্তু সেটি বাস্তবায়নের কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক শামসুল হক বলেছেন, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মনোযোগের অভাবে সেই পরিকল্পনা এখনও বাস্তবায়ন হয়নি।

‘সংশ্লিষ্ট বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলো, যাদের কাছে সেই কৌশলপত্র পাঠানো হয়েছিল, তাদের নজরদারির অভাবের কারণে সেটি হয়নি। পাশাপাশি আমাদের দাতাগোষ্ঠীগুলোও মেগা প্রজেক্টের মধ্যে চলে আসছে। ফলে পথচারীবান্ধব ও গণপরিবহনকে বাসরুট ফ্রাঞ্চাইজির মাধ্যমে সুশৃঙ্খল করে সেবা খাতে পরিণত করা যায়নি।’

অধ্যাপক হক বলছেন, এখনকার আলাদা আলাদা মালিক নির্ভর গণপরিবহন ব্যবস্থা বিশৃঙ্খল এবং সেটি নিয়ন্ত্রণের অসাধ্য।

তিনি মনে করেন, এর মূল সমস্যা পরিচালনায়। সে কারণে কৌশলপত্রে সুপারিশ করা হয়েছিল ছিল সব গণপরিবহনকে এক ছাতার নিচে কয়েকটি কোম্পানির অধীনে নিয়ে আসার। কিন্তু সেটা হয়নি। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, এত বছর আগে একটি কৌশলপত্র সরকার অনুমোদন করলেও এখনো তা বাস্তবায়ন করা যায়নি কেন।

সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় বলছে, গণপরিবহন ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব সরাসরি মন্ত্রণালয়ের নয়, বরং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ বা বিআরটিএ’রই সেই দায়িত্ব। বিআরটিএর কর্মকর্তারা বলছেন, সেই দায়িত্ব তারা পুরোপুরি পালন করতে পারেন না। কারণ রুট পারমিট দেয়াসহ যেসব বিষয়কে সড়কে বিশৃঙ্খলার জন্য দায়ী করা হয়, তা দেখভালের একক কর্তৃত্ব তাদের হাতে নেই।

সংস্থাটির একজন পরিচালক শেখ মোহাম্মদ মাহবুবে রাব্বানী বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, ‘আঞ্চলিক পরিবহন কমিটি যার প্রধান পুলিশ কমিশনার, সেই কমিটি ঢাকা শহরে চলাচলের রুট পারমিট দেয় এবং নির্ধারণ করে কোন রুটে কতটি বাস চলবে।’ ২০১৩ সালে ঢাকা নগরীর জন্য মোট ১৫৬টি রুট নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু এই মূহুর্তে প্রায় তিনশ রুটে বাস চলাচলের অনুমতি রয়েছে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, প্রয়োজনের চেয়ে বেশি রুট পারমিট থাকায় একই রুটে একাধিক কোম্পানি গাড়ি নামায় আর এ কারণেই অসুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে সব গণপরিবহনকে এক ছাতার নিচে কয়েকটি কোম্পানির অধীনে পরিচালনার প্রস্তাবের শক্ত বিরোধিতা করেছে পরিবহন মালিকেরা। বিষয়টি নিয়ে তাদের বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হলে বাংলাদেশে সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির নেতৃবৃন্দ এ নিয়ে কথা বলবেন না বলে জানিয়ে দেন।