‘এতো কুৎসিত লাগে নাই কোনো হাসি, এই জীবনে’, নৌ-মন্ত্রীর সমালোচনায় বিশিষ্টজনেরা

বিশেষ  প্রতিবেদন: প্রতি দিনের মতো রবিবার দুপুরেও অশুভ প্রতিযোগিতায় নেমেছিল জাবালে নূর পরিবহনের দুই বাস। দুপুর ১২টা ১০ মিনিটে শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের একদল শিক্ষার্থী এসে দাঁড়ায় র‌্যাডিসন হোটেলের উল্টোদিকে।

কে কার আগে যাত্রী তুলবেন, এই নিয়ে বাসচালকদের মধ্যে চলে বেপরোয়া প্রতিযোগিতা। মিরপুর থেকে জাবালে নূর পরিবহনের একটি বাস আগে এসে দাঁড়িয়ে যাত্রী তুলছিল। এ সময় পেছন থেকে আরেকটি বাস এসে বাম দিকে এসে চাপা দেয় শিক্ষার্থীদের। মুহূর্তেই দুই শিক্ষার্থী চাপা পড়ে বাসের নিচে। আর অন্যারা ছিটকে পড়ে এদিক-সেদিক। মুহুর্তেই চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু হয়। পালিয়ে যান দুই বাসের চালকেরা। পথচারীরা দ্রুত আহতদের উদ্ধার করে নিয়ে যায় পাশের কুর্মিটোলা হাসপাতালে। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান দুই শিক্ষার্থী আব্দুর করিম সজীব ও দিয়া খানম মীম।

এছাড়া, আহত আরও অন্তত ১২ জনকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। এর মধ্যে ৬ জনকে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে, বাকিদের অন্যান্য হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে।

জানা যায়, শিক্ষার্থীদের চাপা দেওয়া বাস জাবালে নূরের (ঢাকা মেট্রো ব-১১৯২৯৭) পরিচালক নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের শ্যালক মো. নান্নু মিয়া (৫০)। একই সঙ্গে তিনি মন্ত্রীর খালাতো ভাইও। থাকেন রাজধানীর বনশ্রী এলাকায়। জাবালে নূর পরিবহনের সঙ্গে মাহমুদ হোসেন নামে নৌপরিবহনমন্ত্রীর আরেক আত্মীয়ও জড়িত আছেন বলে জানা গেছে।

এদিকে দুই শিক্ষার্থীর নিহত হওয়ার ঘটনায় যখন ক্ষোভে ফেটে পড়ছেন সাধারণ মানুষ, সে সময় মন্ত্রীর মুখে দেখা গেল হাসি। শুধু তাই নয়, অনেকটা স্বাভাবিক বাচনভঙ্গিতেই ঘটনা নিয়ে সাংবাদিকদের করা প্রশ্নের জবাব দেন নৌমন্ত্রী শাজাহান খান।

হাসতে হাসতে জানান দোষীদের শাস্তির কথা। আর সরকারের দায়িত্বশীল একজন মন্ত্রীর এমন আচরণের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। শোকাহত সাধারণ মানুষ মন্ত্রীর এহেন নির্বিকার ভূমিকার সমালোচনা করছেন। প্রশ্ন তুলেছেন, অট্টহাসি দিয়ে যখন মন্ত্রী বলছেন- দোষীদের শাস্তির কথা, সে ক্ষেত্রে কতটা শাস্তি পাবেন দোষীরা?

রবিবার সচিবালয়ে মংলা বন্দরের জন্য মোবাইল হারবার ক্রেন ক্রয়-সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন মন্ত্রী। এসময় সড়ক দুর্ঘটনার বিষয়টি নজরে এনে এক সাংবাদিক মন্ত্রীকে বলেন, আপনার (নৌমন্ত্রী) প্রশ্রয়ে দিন দিন চালকরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। জবাবে হাসিমুখে মন্ত্রী বলেন, ‘এ প্রোগ্রামের সঙ্গে কি এটা রিলেটেড?

তারপর বেশ কিছুক্ষণ হেসেই বিষয়টা উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেও সাংবাদিকদের তোপের মুখে নৌমন্ত্রী বলেন, ‘‘আমি শুধু এটুকু বলতে চাই, যে যতটুকু অপরাধ করবে সে সেভাবেই শাস্তি পাবে।’’

এদিকে নৌপরিবহন মন্ত্রী হাসি আর দূর্ঘটনা প্রসঙ্গে তার বক্তব্য ও হাসি নিয়ে ফেসবুকে চলছে তুমুল সমালোচনার ঝড়।

মন্ত্রীর এই হাসিকে ‘কুৎসিত’ উল্লেখ করে খ্যাতনামা পরিচালক মোস্তফা সারোয়ার ফারুকী তার অফিশিয়াল ফেসবুকে লিখেন,’ ‘এতো কুৎসিত লাগে নাই কোনো হাসি, এই জীবনে’। অনেকে বলেছেন, ভাই, মন্ত্রীর তো আর দোষ নাই, দূর্ঘটনা তো দুর্ঘটনাই। কিন্তু আপনি যখন এইসব বদমায়েশদের পাশে দাঁড়ান, দাঁত কেলিয়ে কুযুক্তি দেন, তখন আপনি আরো দশ হাজার পরিবহন শ্রমিককে দূর্বৃত্ত বানিয়ে দেন। তারা তখন রাজপথকে তাদের স্টেডিয়াম বানিয়ে খেলে, আর মাঝখান থেকে পিঁপড়ার মতো আমাদেরকে একটু থেতলে দেয়। এইভাবেই আশকারা দিতে দিতে আপনি একটা দূর্বৃত্ত বাহিনী গড়ে তোলেন। এই নির্লজ্জ লোকটাকে সরকার বরখাস্ত করে একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে না?

(নোট: সরকার আন্তরিক হইলে, আইন প্রণয়ন এবং প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা করলে, এই সব বদমায়েশ সোজা হবে মাত্র এক দিনে! সরকার সত্যি সত্যি চাইলে পরিবহন খাতের ব্যবস্থাপনা বদলে ফেলাও সম্ভব, যদি এই রকম দূর্বৃত্ত সরকারের ভিতরে থেকে ধর্মঘটের চাল না চালে এবং সরকার তাতে কাবু না হয়)’

বাংলা ভিশনের প্রধান বার্তা সম্পাদক মোস্তফা ফিরোজ লিখেছেন, ‘মাননীয় মন্ত্রী অনেক হয়েছে। এতো নির্লজ্জ হাসি হাসবেন না। শরীরে জ্বালা পোড়া হচ্ছে। রাতে ঘুমাতে পারবো কিনা জানিনা। ভালো হতো সকালে ঘুম থেকে উঠে যদি প্রথম খবর পেতাম যে আপনার গদি উল্টে গেছে। তাহলে শান্তি পেতাম একটু।

দয়া করে পদত্যাগ করে দায় মুক্তি নেয়ার চেষ্টা করেন। আর ভুলেও ভারতের কথা টেনে এনে নিজেকে হাস্যরসে পরিণত করবেন না। আপনি ভারতে জন্মালে মন্ত্রীতো দূরে থাক কোন মন্ত্রীর দপ্তরের পিওন হতে পারতেন কিনা সন্দেহ আছে। একের পর এক নির্মম মৃত্যু ঘটছে। তার প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। উল্টো যারা দূর্ঘটনার শিকার হচ্ছে তাদের উপরে দায় চাপানো হচ্ছে। একটি তরুণ তাজা প্রাণকে বাস থেকে ছুঁড়ে পানিতে ফেলে দেয়া হলো। এর রেশ না কাটতেই উত্তরায় দুই শিক্ষার্থীর উপরে বাস উঠিয়ে হত্যা করা হলো। এসব মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেই চলেছে। অথচ নির্বিকার নৌ পরিবহন মন্ত্রী। যিনি সড়ক পরিবহনের আসল নেতা। তার কাছে সরকার জনগণ সবাই জিম্মি। এই দুঃসহ পরিস্থিতি থেকে মুক্তি হবে কবে?’

জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত সুরকার ও সঙ্গীতশিল্পী বেলাল খান ফেসবুকে লিখেছেন, এই ছেলে,মেয়ের বাবা অথবা চাচা যদি মন্ত্রী নিজে হতো তাহলে কি মন্ত্রী পারতো এমন কুৎসিত হাসি হাসতে?

নৌমন্ত্রীর সমালোচনা করে উশিন ফাতিমা নামের একজন মানবাধিকার কর্মী ফেসবুকে লিখেন, ‘আমাদের পরিবহনমন্ত্রী শাহজাহান খান আজ বাসচাপায় তিন জন শিক্ষার্থীর মৃত্যু প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ভাবলেশহীন, নির্বিকারভাবে হাসছে!’