হানিফ পরিবহনের ড্্রাইভার-হেলপারের বিরুদ্ধে নর্থ-সাউথ ছাত্র হত্যার অভিযোগ, আটক ৩

ফুলকি ডেস্ক: মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার ভবেরচর খাল থেকে গত সোমবার সকালে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির বিবিএর পঞ্চম সেমিস্টারের শিক্ষার্থী সাইদুর রহমান পায়েলের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় তিনজনকে আটক করা হয়। তারা হলেন, হানিফ পরিবহনের বাসচালক জালাল, সুপারভাইজার ফয়সাল ও বাসচালকের সহকারী সুপারভাইজার জনি। পরে তাদের মুখ থেকে জানা গেছে হত্যার ভয়ঙ্কর কাহিনী।

খালে ফেলার আগে ‘থেঁতলে দেওয়া হয়’ পায়েলের মুখ
দুর্ঘটনার ‘দায় এড়াতে’ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী মো. সাইদুর রহমান পায়েলকে অচেতন অবস্থায় সেতু থেকে খালে ফেলে দেওয়ার আগে তার পরিচয় লুকাতে হানিফ পরিবহনের বাসের চালক মুখ থেঁতলে দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ করেছে তার পরিবার।
পায়েলের মামা গোলাম সরওয়ার্দী বিপ্লব বলছেন, ওই বাসের সুপারভাইজার মো. জনি গ্রেপ্তার হওয়ার পর থানায় তার সঙ্গে কথা বলে ওই ঘটনার বর্ণনা জানতে পারেন তারা।

কিন্তু তার আগে বাসের চালক জামাল হোসেন ও সুপারভাইজার জনি ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ পঞ্চম সেমিস্টারের ছাত্র পায়েলের বাসা চট্টগ্রামের হালিশহর সিডিএ আবাসিক এলাকায়। শনিবার রাতে দুই বন্ধু আকিবুর রহমান আদর ও মহিউদ্দিনের সঙ্গে হানিফ পরিবহনের একটি বাসে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার পথে রওনা হওয়ার পর নিখোঁজ হন তিনি।

সোমবার মুন্সিগঞ্জ উপজেলার ভাটেরচর সেতুর নিচের খাল থেকে পায়েলের লাশ উদ্ধার করে গজারিয়া থানা পুলিশ। হানিফ পরিবহনের ওই বাসের সুপারভাইজার জনিকে ঢাকার মতিঝিল এবং চালক জামাল হোসেন ও তার সহকারী ফয়সাল হোসেনকে আরামবাগ থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তারা তিনজনই মুন্সীগঞ্জের জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

সেই জবানবন্দির বরাতে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, গজারিয়া এলাকায়গাড়ি যানজটে পড়ায় প্রসাব করার কথা বলে বাস থেকে নেমেছিলেন পায়েল। বাস চলতে শুরু করলে তিনি দৌঁড়ে এসে ওঠার সময় দরজার সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে সংজ্ঞা হারান। নাক-মুখ দিয়ে রক্ত বের হতে দেখে তাকে হাসপাতালে নেওয়ার বদলে দায় এড়াতে ভাটেরচর সেতু থেকে নিচের খালে ফেলে বাস নিয়ে ঢাকায় চলে আসেন চালক ও সুপারভাইজার। শনিবার পায়েল নিখোঁজ হওয়ার পর সোমবার লাশ উদ্ধার পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় চষে বেড়ান তার মামা বিপ্লব।

তিনি বলেন, গজারিয়া থানা পুলিশ ভাটেরচর সেতুর নিচে খাল থেকে পায়েলের লাশ উদ্ধার করার পর তার প্রথমে তার থেঁতলানো মুখ দেখে চিনতে পারেননি তিনি।
“পরে পায়েলের পরনের শার্ট দেখে আমার ছোট ভাই দিপু জানায় গত ঈদে ও শার্টটা পায়েলকে দিয়েছিল। এরপর ওর আইডি আর লন্ড্রির স্লিপ দেখে আমরা লাশ শনাক্ত করি।”

বিপ্লব বলেন, বাসের সুপারভাইজার জনি ও হেলপার ফয়সাল গ্রেপ্তার হওয়ার পর থানায় তাদের সঙ্গে কথা বলে ‘ঘটনার পুরো বিবরণ’ তারা জানতে পারেন।
জনির বরাত দিয়ে তিনি বলেন, ভাটেরচর সেতুর আগে বাস যানজটে পড়লে চালককে বলে গাড়ি থেকে নামেন পায়েল। তিনি ফেরার আগেই বাস সামনের দিকে এগিয়ে যায় এবং সেতুর ওপর উঠে দাঁড়ায়।

পায়েল দৌঁড়ে এসে দরজার কাছে দাঁড়ালে চালক ভলভো গাড়ির দরজা খুলতে সুইচ টিপে দেন। কিন্তু দরজা খোলার সময় ধাক্কা লেগে পায়েল নাকে-মুখে আঘাত পান এবং পড়ে যান।

বিপ্লব বলেন, “পায়েলের নাক-মুখ থেকে রক্ত ঝরতে দেখে চালক কিছুটা সামনে এগিয়ে যায়। এরপর আবার থামে। তখন সুপারভাইজার পায়েলকে দেখে এসে চালককে বলে-‘ওস্তাদ অজ্ঞান হয়ে গেছে, উঠাই নিব?’
“তখন জামাল হোসেন চালকের আসন থেকে উঠে এসে বলে-‘বিপদে পড়ে যাবি’। তারপর নিজেই পায়েলের মাথার দিকে অংশ ধরে এবং সুপারভাইজারকে পায়ের দিকের অংশ ধরতে বলে। এরপর পায়েলের মুখম-ল রাস্তায় আছড়ে ফেলে। তারপর সেতু থেকে নিচে পানিতে ফেলে দেয়।”

রোববার সকালে পায়েলের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি জানার পর পরিবারের পক্ষ থেকে খোঁজ খবর শুরু করলে চালক ও সুপারভাইজার মিথ্যা তথ্য দিয়ে তাদের বিভ্রান্ত করেন বলেও অভিযোগ করেন বিপ্লব।

তিনি বলেন, শনিবার রাতে পায়েল রওনা হওয়ার পর রোববার সকালে তার মা কোহিনুর বেগম ছেলের মোবাইলে ফোন করলে তা ধরে পাশের সিটের থাকা তার বন্ধু আদর। সে জানায় পায়েল গাড়িতে নেই।

“বাসের সুপারভাইজার জনির সাথে যোগাযোগ করা হলে সে প্রথমে নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানার মদনপুর গ্রামের ক্যাসেল হোটেলের সামনে এক জায়গার কথা বলে। জনি বলেছিল, ওইখানেই প্রসাব করার কথা বলে পায়েল গাড়ি থেকে নেমেছিল। পরে যানজটমুক্ত হয়ে বাসটি সামনের দিকে এগিয়ে গেলে পায়েল আর গাড়িতে উঠতে পারেনি।”
জনির কথায় রোববার দুপুরে নারায়ণগঞ্জ বন্দর থানায় গিয়ে ভাগ্নের নিখোঁজ থাকার কথা জানিয়ে জিডি করেন বিপ্লব। কিন্তু সোমবার গজারিয়া থানার ওসি হারুন অর রশীদ ভাটেরচর সেতুর নিচে লাশ উদ্ধারের খবর দেন।

বিপ্লব বলেন, জনি তাকে প্রথমে যে জায়গায় লাশ পাওয়ার কথা বলেছিলেন, সেই জায়গা আসল ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে। পায়েলের আরেক মামা কামরুজ্জামান বলেন, রোববার সকাল ১০টা পর্যন্ত পায়েলের ফোন না পাওয়ায় তারা ফোন নম্বর যোগাড় করে গাড়ি চালক জামাল হোসেনকে ফোন করেছিলেন।
“সে আমাদের সাথে কোনো কথাই তখন বলেনি। শুধু বলেছে, ‘আপনাদের ভাগ্নে গাড়ি থেকে নেমে গেছে। পরের গাড়িতে ঢাকা আসবে। আপনারা পরিবহনের লোকজনের সাথে যোগাযোগ করেন’।”

গজারিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হারুন-উর-রশীদ জানান, পায়েলের লাশ উদ্ধারের পর পুলিশের তদন্তে প্রাথমিকভাবে বাসচালক, সুপারভাইজার ও চালকের সহকারীকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। সুপারভাইজার ফয়সালকে বৃহস্পতিবার আদালতে পাঠানো হয়। সেখানে তিনি ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন।

কোর্ট ইন্সপেক্টর হেদায়তুল ইসলাম জানান, আসামি ফয়সালকে মুন্সীগঞ্জের ৫ নম্বর আমলি আদালতে হাজির করা হয়। আদালতের বিচারক মো. জসিম উদ্দিনের কাছে তিনি ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। জবানবন্দিতে ফয়সাল বলেন, রাতে বাস যানজটে পড়লে বাসযাত্রী পায়েল প্রস্রাব করতে নিচে নামেন। যাত্রীবাহী বাস দ্রুত টান দিলে পায়েল বাসের দরজার সঙ্গে জোরে ধাক্কা খেয়ে রাস্তায় পড়ে যান। এ ঘটনায় তার নাক-মুখ দিয়ে রক্ত বের হতে থাকে। তিনি গুরুতর অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তখন বাসের চালক, চালকের সহকারী ও সুপারভাইজার মনে করেন পায়েল মারা গেছে। তারপর তাকে নদীতে ফেলেই তারা বাস চালিয়ে ঢাকার উদ্দেশে চলে আসেন।
মুন্সিগঞ্জে বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলনে জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) জায়েদুল আলম বলেন, হানিফ পরিবহনের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত (ঢাকা মেট্রো-ব-৯৬৮৭) বাসে দুই বন্ধু মহিউদ্দিন, হাকিমুর রহমানসহ ঢাকায় আসছিলেন সাইদুর। বাসের একেবারে সামনে (চালকের পেছনের) আসনে (৩ ও ৪) পাশাপাশি বসেছিলেন সাইদুর ও মহিউদ্দিন। রোববার ভোর চারটার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের গজারিয়া উপজেলার ভবের চর এলাকায় সেতুর কাছাকাছি যানজটের মধ্যে ‘বাথরুম’ করতে সাইদুর বাস থেকে নামেন। তিনি বাসে ওঠার আগেই যানজট ছাড়ায় বাস চলতে শুরু করে। সাইদুর দৌঁড়ে বাসের কাছে যান। বাস ততক্ষণে ভাটের চর সেতুর ওপর উঠেছে। সাইদুরকে বাসে ওঠানোর জন্য দরজাও খোলেন বাসকর্মীরা। তবে ওঠার সময় স্বয়ংক্রিয় দরজার সঙ্গে জোরে ধাক্কা খান সাইদুর। তাঁর মাথা, নাক, মুখ দিয়ে রক্তক্ষরণ শুরু হয়, রাস্তার ওপর লুটিয়ে পড়েন তিনি। বাসকর্মীরা ধারণা করেন, তিনি মারা গেছেন। বিষয়টি নিয়ে ঝামেলার আশঙ্কায় তাঁরা ওই সেতুর ওপর থেকেই ফুলদী নদীতে সাইদুরকে ফেলে দিয়ে ঢাকায় চলে আসেন।

এসপি বলেন, ময়নাতদন্তে সাইদুরের পেটে প্রচুর পানি পাওয়া যায়। তাতে ধারণা করা যায়, পানিতে ফেলে দেওয়ার পরও বেশ কিছুক্ষণ তিনি জীবিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে নিহত সাইদুরের বন্ধু ও সহযাত্রী মহিউদ্দিন বলেন, তখন তাঁরা বাসে ঘুমিয়ে ছিলেন। ঘুম ভাঙার পর বন্ধুকে না পেয়ে হেলপারকে জিজ্ঞেস করলে উত্তর আসে, ‘আপনার বন্ধু বাস থেকে নেমে গেছে, পরের বাসে আসবে।’ এ সময় সাইদুরের মোবাইল ফোনটি বাসের আসনেই পড়ে থাকতে দেখেন তিনি। মা কীভাবে মেনে নেবেন?

চট্টগ্রামের হালিশহরে সাইদুরদের বাসা। সেখানে মা কোহিনূর আক্তার একাই থাকেন। বাবা গোলাম মাওলা আর বড় ভাই গোলাম মোস্তফা কাতারপ্রবাসী। বিয়ের পর বড় বোনেরও আলাদা সংসার। তাই ছোট ছেলে সাইদুর রহমানই ছিলেন মায়ের আবেগের সবটুকু। সেই ছেলেটাই এমনভাবে জীবন হারালেন, যা কিছুতেই মানতে পারছেন না মা।
৮ জুলাই বড় ভাই কন্যাসন্তানের বাবা হয়েছেন। এই সুসংবাদ শুনেই সাইদুর এসেছিলেন। নিজের নামের সঙ্গে মিলিয়ে ভাতিজির নামও দেন-মাহানুর রহমান। গতকাল সন্ধ্যায় সাইদুরদের বাসায় কথা হয় তাঁর বাবা গোলাম মাওলা, বড় ভাই গোলাম মোস্তফা এবং মা কোহিনূর আক্তারের সঙ্গে।

ঢাকা থেকে বাসায় ফিরলে যে খাটে ঘুমাতেন সাইদুর, সেই শূন্য খাটের দিকে তাকিয়ে বারবার শোকে বিহ্বল হয়ে পড়ছেন মা কোহিনূর।
সাইদুরের মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে সোমবার দেশে এসেছেন সাইদুরের বাবা ও বড় ভাই। গোলাম মাওলার আক্ষেপ, শেষবারের মতো ছেলেকে দেখতে পারেননি। কারণ, লাশ বিকৃত হয়ে যাওয়ায় কফিন খোলা হয়নি। তিনি বলেন, ‘আমি এখন আমার ছেলেকে হত্যাকারীদের দেখতে চাই। তাদের সামনে দাঁড়িয়ে এই প্রশ্নটি করতে চাই, কেন তারা ছেলেটাকে এভাবে মেরে ফেলল?’

উল্লেখ্য, গত ২১ জুলাই গ্রামের বাড়ি থেকে বন্ধুদের সঙ্গে হানিফ পরিবহনের বাসে চড়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন পায়েল। পথে রাত ২টার দিকে নারায়ণগঞ্জ বন্দর এলাকায় গিয়ে জ্যামে পড়ে বাসটি। সে সময় বাস থেকে প্রস্রাব করার জন্য নিচে নামেন পায়েল। এরপর থেকে পায়েলকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। ২৩ জুলাই তার লাশ মেলে।