ধুলাবালির কারণে রাজধানীতে জলাবদ্ধতা বাড়াচ্ছে

স্টাফ রিপোর্টার : সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা অভিযানের পরও প্রতিদিন রাজধানীর সড়কে ৯৮ ভাগ ধুলাবালিই থেকে যায়। রাস্তার এসব ধুলাবালি পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন উপায়ে ড্রেনে পড়ে বাধাগ্রস্থ করে স্বাভাবিক পানি নিষ্কাশন। ফলে সামান্য বৃষ্টি হলেই রাজধানীজুড়ে দেখা দেয় তীব্র জলাবদ্ধতা। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।

সংশ্লিষ্ট এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে বাধাগুলো শনাক্তের জন্য ডিএনসিসির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শাখা গবেষণাটি পরিচালনা করে। গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফল বলছে, ডিএনসিসির আওতাধীন এলাকায় দৈনিক ৭৪৩ টন ধুলাবালি জমা হয়। এসব ধুলাবালির মধ্যে মাত্র ১০ টন পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের মাধ্যমে সরিয়ে নেয়া যায়। বাকি ৭৩৩ টন ধুলাবালি চলে যায় ড্রেনে। এতে ড্রেনেজ সিস্টেম অচল হয়ে সৃষ্টি হয় তীব্র জলাবদ্ধতা।

ধুলাবালি নিয়ে এ গবেষণাটি পরিচালনার জন্য ডিএনসিসির পক্ষ থেকে এর আগে পৃথক দুটি গবেষণা পরিচালনা করা হয়। এজন্য প্রথমেই ডিএনসিসির দুটি রুট থেকে ড্রেনের আবর্জনা এবং রাস্তার আবর্জনার নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পরে সেই নমুনা ল্যাবে পরীক্ষার মাধ্যমে জানা যায়, ড্রেনের আবর্জনার মধ্যে কাদা-মাটির পরিমাণই ৮৬ শতাংশ, যা মূলত ধুলাবালি থেকে সৃষ্ট। এর বাইরে ৯ শতাংশ ইটের গুঁড়ো ও ২ শতাংশ ধাতব পদার্থ এবং ১ শতাংশ করে পলিথিন, প্লাস্টিক, কাঠের টুকরো ও বাদামের খোসা পাওয়া গেছে।

রাস্তা থেকে সংগ্রহ করা আবর্জনার নমুনা পরীক্ষায় ধুলাবালি আরো বেশি পাওয়া গেছে। এই শ্রেণীর আবর্জনার মধ্যে ধুলাবালির পরিমাণই ৯৭ শতাংশ। বাকি ৩ শতাংশের মধ্যে ১ শতাংশ কাঠের গুঁড়ো ও ১ ভাগ ইটের গুঁড়ো এবং বাকি ১ শতাংশ বিবিধ ধরনের আবর্জনা।

রাজধানীর সড়কে এবং ড্রেনে জমা হওয়া এসব ধুলাবালির পাঁচটি উেসর কথা বলা হয়েছে ডিএনসিসির এ গবেষণায়। এর মধ্যে একটি হলো খোলা এবং তলায় ছিদ্র থাকা ট্রাকে নির্মাণ সামগ্রী পরিবহন, যা রাজধানীর সড়কে সবচেয়ে বেশি ধুলাবালি ফেলে। দ্বিতীয় উৎস হিসেবে বলা হয়েছে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির কথা। এছাড়া ঢাকনা খোলা ড্রেন, ড্রেনের পাশে দোকান এবং রাজধানীবাসীর সচেতনতার অভাবকেও ড্রেনে ধুলাবালি পড়ার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

গবেষণায় বলা হয়েছে, সড়কের ধুলাবালি ড্রেনে গিয়ে কাদামাটিতে রূপান্তর হয়ে ড্রেনেজ ব্যবস্থাকে অকেজো করে দিচ্ছে। এজন্য ঘন ঘন ড্রেন পরিষ্কার করতে হচ্ছে সিটি করপোরেশনকে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ১ হাজার ৩২ বার ড্রেন পরিষ্কার (ব্লকড ক্লিয়ার) করা হয়েছে। আর ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ড্রেনেজ ব্লকড ক্লিয়ার করা হয়েছে ১ হাজার ৪৬২ বার। আগামীতে এ সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।

রাজধানীর জনবসতিপূর্ণ এলাকা মিরপুরে সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, ওই এলাকার পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা খুবই নাজুক। সেখানে একদিকে চলছে বিভিন্ন সেবা প্রদানকারী সংস্থার উন্নয়নকাজ, অন্যদিকে চলছে মেট্রোরেলের কাজ। এ দুই উন্নয়নকাজের ফলে রাস্তায় তৈরি হয়েছে মাটি, ইট আর কাঠের স্থুপ। সামান্য বৃষ্টি হলেই এ স্থুপের আবর্জনা গড়িয়ে পড়ে ড্রেনে। এতেই অকার্যকর হয়ে পড়েছে মিরপুর এলাকার ড্রেনেজ সিস্টেম।

ড্রেনেজ সিস্টেমের এ বাজে হালে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসীও। আজমাইন নামে মিরপুরের স্থানীয় এক বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এক বছর ধরে এ এলাকায় জলাবদ্ধতা চলছে। হেঁটে চলাচলের কোনো উপায় নেই। বাসার গেটে রিকশা নিয়ে তারপর বের হতে হয়।

ভোগান্তির দেখা মিলেছে মোহাম্মদপুরেও। শেখেরটেক, আদাবর, খিলজী রোড ও শাহজাহান রোড ঘুরে দেখা যায়, ড্রেনেজ ব্যবস্থা বিকল হয়ে পড়ায় পুরো এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়েছে।

রাজধানীকে ধুলাবালিমুক্ত করতে বিশেষ পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে বলেও জানান ডিএনসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা। তিনি বলেন, আমরা এতদিন কর্মীনির্ভর হয়ে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করতাম। কিন্তু এত বড় এলাকা ৩ বা ৪ ঘণ্টার মধ্যে ঝাড়ু দিয়ে ধুলামুক্ত করা সম্ভব নয়। কারণ সকাল হলেই সড়কে গাড়ির চাপ বেড়ে যায়। তখন আর ঝাড়ু দেয়া সম্ভব হয় না। এ সমস্যার সমাধানে এরই মধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে একটি রোড সুইপার আনা হয়েছে। এটি দিয়ে অল্প সময়ে অনেক বেশি ধুলাবালি নিখুঁতভাবে পরিষ্কার করা যাচ্ছে। অত্যাধুনিক এ যানের সংখ্যা বৃদ্ধি করা গেলে ২ থেকে ৩ ঘণ্টার মধ্যেই ডিএনসিসির পুরো এলাকার ধুলাবালি প্রতিদিন পরিষ্কার করা যাবে বলে জানান তিনি।