থানার বিভিন্ন খাতে সরকারি বরাদ্দ কি পর্যাপ্ত?

স্টাফ রিপোর্টার : থানা বিপদগ্রস্ত মানুষের ভরসার জায়গা। আইনি সহায়তা ও পুলিশি সেবা পেতে মানুষ থানার শরণাপন্ন হয়। থানার কর্মকর্তারাও তাদের সাধ্যমতো করতে সর্বদাই প্রস্তুত থাকেন। মানুষের জানমালের নিরাপত্তাসহ অপরাধ দমন ও পুলিশি সেবা দিতে থানাকে সবসময় রাখতে হয় পরিপাটি ও সুশৃঙ্খল। এ জন্য দরকার অর্থের। থানার আসবাবপত্র থেকে শুরু করে মনিহারি দ্রব্যাদি পর্যন্ত বিভিন্ন খরচের খাত রয়েছে। তবে এসব খাতে সরকারি যে বরাদ্দ তা থানার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য যথেষ্ট নয় বলে জানিয়েছেন পুলিশ সদস্যরা।

পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অপরাধের ধরন পাল্টেছে, সেই সঙ্গে পুলিশি সেবার মানও উন্নত হচ্ছে। বর্তমান ডিজিটাল যুগে অপরাধ দমন ও জনমানুষকে পুলিশি সেবা দিতে নতুন নতুন প্রযুক্তি ও পদ্ধতি অবলম্বন করা হচ্ছে। আগে থানায় লেখালেখির সব কার্যক্রম হাতে-কলমে বা টাইপ রাইটারের করা হতো। এখন প্রতিটি থানায় এসব কাজ করা হয় কম্পিউটারে। যেকোনও মামলার তদন্ত কার্যক্রম ও আসামি গ্রেফতারে ম্যানুয়াল পদ্ধতির পাশাপাশি ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে। থানায় সেবার মান যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে তেমনি বেড়েছে থানা পরিচালনার ব্যয়ও।

পুলিশ সদর দফতর সূত্রে জানা গেছে, থানা পরিচালনার জন্য বেশ কয়েকটি খাতে সরকারি বরাদ্দ রয়েছে। এর মধ্যে আসবাবপত্র, মামলা তদন্ত, মনিহারি দ্রব্য, যানবাহন ও অন্যান্য ব্যয় উল্লেখযোগ্য। এর মধ্যে মামলা তদন্ত ব্যয় দ্বিগুণ করা হয়েছে ২০১৭ সালে। তবে থানায় আপ্যায়ন, রান্নার জন্য বাবুর্চি, পরিচ্ছন্নতার জন্য ক্লিনার এবং উপ-পরিদর্শকদের ‘সোর্স মানি’ সংক্রান্ত কোনও বরাদ্দ নেই।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক থানার কয়েকজন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বলেন, সরকারের বরাদ্দ পুরোটাই তারা পান। তবে বরাদ্দ দেওয়ার বাইরেও কিছু খাত আছে যেখানে তাদের নিজেদের পকেট থেকে টাকা খরচ করতে হয়। যেকোনও পুলিশি সুবিধা অথবা অভিযোগ নিয়ে প্রতিদিন অনেক মানুষ থানায় আসেন। ভদ্রতার খাতিরে হলেও অন্তত এক কাপ চা দিয়ে হলেও তাদের আপ্যায়ন করতে হয়। এই যে খরচ হয়, এখানে কোনও বরাদ্দ নেই।

পুলিশের উপ-পরিদর্শক পর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তা জানান, তাদের কাজের বেশির ভাগ সময় ফিল্ডে থাকতে হয়। কোথাও কোনও অপরাধ হচ্ছে কিনা, কোনও মাদকের চালান পাচার হচ্ছে কিনা, অথবা অন্য যেকোনও তথের জন্য তাদের কিছু সোর্স মেইন্টেন করতে হয়। এসব ক্ষেত্রে তাদের পকেটের টাকা খরচ হয়। তারা বলেন, সোর্স মেইন্টেন করার জন্য যদি সরকারের তরফ তাদের কিছু ‘সোর্স মানি’ দেওয়া হলে তারা উপকৃত হতেন।  াম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘সাধারণ মানুষ পুলিশের বিরুদ্ধে প্রায়ই একটা অভিযোগ করে থাকেন যে টাকা না দিলে পুলিশ কাজ করে না। এটা হয়তো অনেক আগে ছিল। কিন্তু পুলিশ এখন আর আগের মতো নেই। অনেক মেধাবী পুলিশের যোগদান করছেন। সেবার মান বেড়েছে, পুলিশের বেতনও বেড়েছে। তবে পুলিশ যদি তার কাজের সব সুবিধা পায় তবে তার অবৈধ কোনও আয়ের দরকার হয় না।’  াজধানীর বিভিন্ন থানায় দায়িত্বরত বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য জানান, নিরাপত্তা নিশ্চিতের লক্ষ্যে এবং থানার দায়িত্ব পালনে সুবিধার জন্য সরকারি গাড়ি বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে তা পর্যাপ্ত নয়।  বরাদ্দ দেওয়া যানবাহনও বেশিরভাগ সময় বিকল (নষ্ট) হয়ে পড়ে থাকে। তাই পুলিশের দায়িত্ব পালন ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের লক্ষ্যে বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যানবাহন বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। এতে কিছুটা স্বস্তি মিলছে। এছাড়াও দায়িত্ব পালনের প্রতিমাসে থানার মোটরসাইকেল বাবদ ৩০ লিটার তেল এবং থানার পিকআপ ভ্যান বাবদ দিনে ১৫ লিটার তেল সরকারিভাবে বরাদ্দ দেওয়া হয়। পুলিশের উপ-পরিদর্শক পর্যায়ের কর্মকর্তারা বলেন, ‘থানায় প্রত্যেকের মোটর সাইকেল প্রয়োজন। কারণ, থানা এলাকায় কোথাও কোনও ঘটনা ঘটলে বা কোনও ঘটনার তদন্তের জন্য দ্রুত স্পটে যেতে হলে মোটর সাইকেল খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বাহন। যদিও অনেক উপ-পরিদর্শকদেরও মোটর সাইকেল নেই।’

এ বিষয়ে পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, পুলিশের সার্ভিসের শুরু থেকেই প্রত্যেক সদস্যকে দায়িত্ব পালনের জন্য যানবাহন হিসেবে একটি করে মোটর সাইকেল সরকারের তরফ থেকে বরাদ্দ দেওয়া হয় এবং বরাদ্দকৃত মোটর সাইকেলের টাকা বেতন থেকে কর্তন করা হোক। বেতন থেকে প্রতি মাসে কিছু অংশ কেটে রাখা হলে একসময় এই মোটর সাইকেলটি তার ব্যক্তিগত হয়ে যাবে, এতে মোটরসাইকেল যতেœ থাকবে ও ভালো চলবে।

মামলার তদন্তে সরকারি ব্যয়

২০০৭ সাল থেকে থানায় দায়ের করা মামলার তদন্ত কার্যক্রমে টাকা বরাদ্দের ব্যবস্থা চালু করা হয়। সে সময় মামলার ধরন অনুযায়ী তদন্ত বাবদ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হতো। ডাকাতি ও খুনের মামলা তদন্তে তিন হাজার টাকা, অপহরণ মামলায় দুই হাজার ৫০০ টাকা, দস্যুতা ও অপমৃত্যু মামলায় দুই হাজার টাকা, নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে দায়ের করা মামলায় এক হাজার টাকা বরাদ্দ ছিল।

পরে ২০১৭ সালে মামলা তদন্তে টাকার হার বাড়ানো হয়েছে। ডাকাতি ও খুনের মামলায় ছয় হাজার টাকা, অপহরণ মামলায় পাঁচ হাজার টাকা, দস্যুতা ও অপমৃত্যু মামলায় চার হাজার টাকা, নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে দায়ের করা মামলায় দুই হাজার টাকা, এসিড নিক্ষেপ মামলায় দুই হাজার টাকা, দ্রুত বিচার আইনে দায়ের করা মামলায় দুই হাজার টাকা এবং অন্যান্য মামলায় দেড় হাজার টাকা তদন্ত ব্যয় পান তদন্ত কর্মকর্তারা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক পুলিশ সদস্য বলেন, ‘যদি কোনও স্থানে হত্যাকা- বা সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে, তবে সেখানে গিয়ে প্রথমে মরদেহ উদ্ধার করতে হয় এবং সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করতে হয়। এরপর সেটি নিয়ে যাওয়া হয় সরকারি হাসপাতালের মর্গে। ময়নাতদন্ত শেষ হলে ওই লাশ স্বজনদের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করতে হয়। এর মধ্যে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির জন্য কাগজ, কার্বন কপি, কলমÍ এসব নিজের পকেটের টাকায় কিনতে হয়।’ পুলিশের একাধিক থানার কর্মকর্তারা জানান, সরকারি বরাদ্দ পর্যাপ্ত থাকলেও মামলা তদন্তের বিষয়ে ও আসামি গ্রেফতারের বিষয়ে আমাদের কিছু বেগ পেতে হয়। কারণ এখন প্রায় বেশিরভাগ মামলার তদন্তে ও আসামি গ্রেফতারের তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা নিতে হয়, যা পুলিশের হাতে নেই। যদি এই সুবিধাটি ডিএমপির প্রতিটি বিভাগে আলাদা আলাদা থাকে তবে মামলার তদন্ত ও আসামি গ্রেফতার আরও দ্রুত সময়ে করা সম্ভব হবে।

পুলিশ সদর দফতরের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের (এআইজি) সোহেলী ফেরদৌস বলেন, ‘একটি থানা পরিচালনার জন্য সরকারের তরফ থেকে যে পরিমাণ বরাদ্দ থাকে, তার সবটুকুই দেওয়া হয়। এই বরাদ্দের টাকা থানার ওসিদের নামে তাদের অ্যাকাউন্টে চলে যায়।’  থানা পরিচালনায় সরকারি এই বরাদ্দ কি যথেষ্ট, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘একটি থানার স্বাভাবিক নিয়মে চলতে গেলে খরচ তো থাকেই। এদিকে থানায় ক্লিনারের কোনও পোস্ট নেই, রান্নার জন্য বাবুর্চির কোন পোস্ট নেই, ফলে এসব কাজের কোনও বরাদ্দও নেই। তবে অন্যান্য খাতের ব্যয় যোগ-বিয়োগ করে বাবুর্চি ও ক্লিনারের ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা হয়ে থাকে।’ সোহেলী ফেরদৌস বলেন, ‘থানার আসবাবপত্রের খাত আলাদা, মনিহারি দ্রব্যাদি কেনার জন্য খুব বেশি বরাদ্দ থাকে না। বর্তমান সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে থানা পরিচালনার জন্য এই বরাদ্দ পর্যাপ্ত বলা যায় না।’ না পাওয়ার চেয়ে কিছু বরাদ্দ পাওয়া ভালো বলে মন্তব্য করেন তিনি। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম) কৃষ্ণপদ রায় বলেন, ‘‘মামলা তদন্তে সরকারি একটি বরাদ্দ দেওয়া হয়। বর্তমানে এটি বৃদ্ধি করে দ্বিগুণ করা হয়েছে। এখন মামলা তদন্তে এই বরাদ্দ পর্যাপ্ত।’