আবারো হোঁচট খেল বিএনপি নেতৃত্বাধীন নির্বাচনী জোট গঠনের পরিকল্পনা

বিশেষ প্রতিবেদন: বিএনপির নেতৃত্বে যে বৃহত্তর ঐক্যের চেষ্টা চলছে, সেই জোটের একজন নেতাকে সামনে এনেই আটঘাট বেঁধে নির্বাচনের মাঠে নামতে হবে; জয়লাভ করলে যিনি কয়েক মাসের জন্য সরকার প্রধান (প্রধানমন্ত্রী) হবেন। কিন্তু সেই নেতার প্রশ্নে একমত হতে পারছে না ঐক্যে আগ্রহী দলগুলো।

নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, সম্ভাব্য জোটের প্রধান নেতা হিসেবে বিকল্পধারার সভাপতি অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নাম আলোচনায় আছে। কিন্তু বিজয়ের পর সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের নাম কিছুটা আলোচনায় আসায় বিএনপির পাশাপাশি উদারপন্থী দলগুলোর মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।

জানা গেছে, ড. কামাল প্রধানমন্ত্রী হবেন—এমন সম্ভাবনা মেনে নিয়ে জোট গঠনে আগ্রহী নয় বি চৌধুরীর দল বিকল্পধারা। অন্যদিকে আ স ম রবের নেতৃত্বাধীন জেএসডি এবং মাহমুদুর রহমান মান্নার নেতৃত্বাধীন নাগরিক ঐক্যও সম্ভাব্য এমন সমঝোতায় জোট গঠনে রাজি নয়। এ অবস্থায় বিএনপি কৌশলগতভাবে কিছুটা বিপাকে পড়েছে। জটিলতার মুখে পড়েছে বৃহত্তর জোট গঠনের প্রক্রিয়াও।

কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী গত ২০ জুলাই এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ‘আমরা বি চৌধুরী আর ড. কামাল হোসেনের কার্যকর নেতৃত্ব দেখতে চাই। এটা ফ্রন্ট হোক বা জোট হোক, তার প্রধান হবেন বি চৌধুরী। নির্বাচনের পর সরকার গঠন করলে সরকারপ্রধান হবেন ড. কামাল হোসেন।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শুধু ঘোষণা দিয়েই বঙ্গবীর থেমে থাকেননি, ড. কামাল হোসেনকে সরকারপ্রধান করার জন্য বেশ তত্পরতাও চালান। সম্প্রতি তিনি বি চৌধুরী, তাঁর ছেলে বিকল্পধারার যুগ্ম মহাসচিব মাহী বি চৌধুরীর সঙ্গে ছাড়াও পৃথক বৈঠক করেন আ স ম রব, মাহমুদুর রহমান মান্না এবং গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর সঙ্গে। সূত্র মতে, এসব বৈঠকে ‘ড. কামাল হোসেনকে প্রধানমন্ত্রী করা যায়’ এমন মনোভাব ব্যক্ত করেন কাদের সিদ্দিকী। জবাবে ওই নেতারা প্রশ্ন তুলে বলেন, ড. কামাল কি যুক্তফ্রন্টে আসবেন বা তিনি কি যুক্তফ্রন্টের কেউ? তবে তিনি যুক্তফ্রন্টে এলে তাঁকে যথাযোগ্য মর্যাদা দেওয়া হবে বলে মতামত ব্যক্ত করেন ওই নেতারা। অবশ্য ‘সরকারপ্রধান’ করার বিষয়ে তাঁরা কথা বলেননি। তবে হঠাৎ করে কাদের সিদ্দিকীর ওই বক্তব্যে দলগুলোর মধ্যে বেশ কৌতূহলের সৃষ্টি হয়। বিএনপির পক্ষ থেকে কামাল হোসেনকে এ ধরনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে কি না—এমন সংশয়ও সৃষ্টি হয় যুক্তফ্রন্টের অন্তর্ভুক্ত দলগুলোর নেতাদের মধ্যে।

জানতে চাইলে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বলেন, কামাল হোসেনকে ভবিষ্যৎ সরকারপ্রধান করার প্রস্তাব শুধু তাঁর নিজ দলের। এ নিয়ে অন্য কারো সঙ্গে আলোচনা হয়নি। বিএনপির সঙ্গে আলোচনা হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিএনপির সঙ্গে ঐক্য করার প্রচেষ্টা নয়, আমরা একটি জাতীয় ঐক্য চাই। সেখানে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ উভয় দলের জন্যই রাস্তা খোলা।’

বিকল্পধারার সভাপতি ও যুক্তফ্রন্টের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী এ প্রসঙ্গে বলেন, কাদের সিদ্দিকী যুক্তফ্রন্টে নেই—এ কথা তিনি নিজেই বলেছেন। সুতরাং কাউকে সরকারপ্রধান করার প্রস্তাবও তাঁর উর্বর মস্তিষ্কপ্রসূত। হয়তো তাঁর স্বাধীন মনের কথা। এর সঙ্গে যুক্তফ্রন্টের কোনো সম্পর্ক নেই। এক প্রশ্নের জবাবে সাবেক এই রাষ্ট্রপতি বলেন, হতে পারে কামাল হোসেন সাহেবকে কেউ হয়তো এ ধরনের প্রস্তাব দিয়েছেন, যা উনি (কাদের সিদ্দিকী) হয়তো জানতে পেরেছেন।

কাদের সিদ্দিকীর প্রস্তাবের বিষয়টিতে মন্তব্য করে কোনো বিতর্ক সৃষ্টি করতে চান না বলে জানিয়েছেন গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন। গতকাল বৃহস্পতিবার কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, তাঁর (কাদের সিদ্দিকী) বক্তব্যের ব্যাপারে ‘জানি না বা ফেলে দিয়েছি’ এগুলোর যেকোনোটি বললেই ভুল-বোঝাবুঝি সৃষ্টি হতে পারে। এক প্রশ্নের জবাবে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এই আইনজীবী বলেন, সরকারপ্রধান বিষয়ে বিএনপির সঙ্গে তাঁর কোনো আলোচনা হয়নি। তাঁর মতে, ‘এই বয়সে এগুলো কোনো বিষয় হতে পারে না।

তবে বিএনপিকে বলেছি যে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনে আমি ভূমিকা পালন করতে রাজি আছি,’ যোগ করেন ড. কামাল হোসেন।

কাদের সিদ্দিকীর প্রস্তাবের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান জেএসডি সভাপতি আ স ম রব। তিনি বলেন, বিএনপি বা উদারপন্থী দলগুলোর মধ্যে ঐক্য হলে নেতা কে হবেন, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। সময় হলে এগুলো যুক্তফ্রন্টের বৈঠকে আলাপ-আলোচনা করে ঠিক করা হবে।

নির্বাচনী জোট গঠন করতে হলে ভবিষ্যৎ সরকার গঠন ও পরিচালনা নিয়ে কয়েকটি প্রস্তাবের বিষয়ে দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য হতে হবে। ওই প্রস্তাবে প্রথম তিন বা ছয় মাসের জন্য জোটের একজনকে প্রধানমন্ত্রী করার কথা উল্লেখ থাকবে। উল্লেখ থাকবে নির্বাচনে জয়লাভ করে সরকার গঠন করতে পারলে খালেদা জিয়াকে কারামুক্ত করে একটি আসনে উপনির্বাচন করে জিতিয়ে আনার কথাও। সমঝোতা বা চুক্তি অনুযায়ী এরপর খালেদা জিয়াকে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করা হবে।

আর আগের প্রধানমন্ত্রীকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করা হবে—এমন আলোচনা চলছে বিএনপির পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ওই দলগুলোর মধ্যে। কিছুদিন আগে পর্যন্ত ওই পদে একমাত্র বি চৌধুরীর নামই আলোচনায় ছিল। কিন্তু বিএনপির পক্ষ থেকে ব্যাপক তত্পরতা সত্ত্বেও বি চৌধুরীর সঙ্গে দলটির দূরত্ব কমেনি। বরং বিকল্পধারার দেড় শ আসনের দাবিতে জটিলতা আরো কিছুটা বেড়েছে বলে কেউ কেউ মনে করেন।

দূরত্ব সৃষ্টির আগের প্রধান তিনটি কারণ হলো—বিগত চারদলীয় জোট সরকারের সময় চাপ সৃষ্টি করে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে বি চৌধুরীর পদত্যাগ, পরে তাঁর পরিবারকে অপদস্থ করা এবং সর্বশেষ ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে গুলশান কার্যালয় থেকে প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পরও মাহী বি চৌধুরীকে মনোনয়ন না দেওয়ার ঘটনা নিষ্পত্তি না হওয়া। সূত্র মতে, এ কারণেই বিকল্প হিসেবে সামনে চলে আসছে ড. কামাল হোসেনের নাম। তা ছাড়া বিএনপির বড় একটি অংশ এ-ও মনে করে যে কামাল হোসেনের নাম সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে থাকলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষ করে ভারতের সমর্থন (মতান্তরে অনুমোদন) পাওয়া যাবে।