রাজধানীর ৬৭টি ওয়ার্ডই ডেঙ্গুর ঝুঁকিতে

স্টাফ রিপোর্টার : ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া নিয়ে ব্যাপক আলোচনা, নানামুখী সচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপের মাঝেও ঢাকায় এডিস মশার বিস্তার কমছে না, উল্টো বাড়ছে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ৯৩টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৬৭টিই এডিস মশার বিস্তারে অধিকতর ঝুঁকিপূর্ণ বলে শনাক্ত হয়েছে। খোদ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার এক জরিপে উঠে এসেছে এমন চিত্র।

অন্যদিকে ডেঙ্গুর প্রকোপও ২০১৭ সালের তুলনায় বেড়েছে, মৌসুমের শুরুতেই এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে সাতজনের মৃত্যু হয়েছে, আর আক্রান্তের সংখ্যা গত মঙ্গলবার পর্যন্ত ৯০০ জনের বেশি সরকারি হিসাব অনুসারেই। বেসরকারি হিসেবে আক্রান্তের সংখ্যা আরো বেশি বলে জানান বিশেষজ্ঞরা; যা নিয়ে উদ্বেগের মুখে বুধবার সভায় বসেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশনসহ আরো কয়েকটি সংস্থার নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের লোকজন।

জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, ডেঙ্গুতে আতঙ্কিত না হয়ে বরং সতর্ক ও সচেতন থাকার ওপর বেশি জোর দিতে হবে। এই মৌসুমে জ্বর হলেই ডেঙ্গুর বিষয়টি মাথায় রাখা দরকার। লক্ষণ দেখে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে বা চিকিৎসাকেন্দ্রে যেতে হবে। সেই সঙ্গে এডিস মশার ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে, যাতে কোনো বাসাবাড়িতে এই মশার প্রজনন উপযোগী পরিবেশ না থাকে। তিনি চিকিৎসকদের উদ্দেশ করে বলেন, জ্বর নিয়ে কেউ এলে তাদের যেন ডেঙ্গুর পরীক্ষা করে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার উপকর্মসূচি ব্যবস্থাপক (ডেঙ্গু-ম্যালেরিয়া) ডা. আক্তারুজ্জামান বলেন, ‘আমাদের জরিপটি হয়েছে প্রাক-মৌসুমে গত মে মাসে। তাই ভরা মৌসুমে এই পরিস্থিতি আরো খারাপ হওয়া স্বাভাবিক। আমরা শিগগিরই আরেকটি জরিপের পরিকল্পনা করছি।’

ডা. আক্তারুজ্জামান বলেন, ‘জরিপে আমরা ঢাকা উত্তরের ২৫ ও দক্ষিণের ৪২টি ওয়ার্ডে এডিস মশার প্রজনন ও বিস্তারের নমুনা ও লক্ষণ পেয়েছি। দুই অংশেই অনেক আবাসিক এলাকা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাণিজ্যিক এলাকা, বিভিন্ন ধরনের সরকারি-বেসরকারি দপ্তরের এলাকাও ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় রয়েছে। এ ক্ষেত্রে নির্মাণাধীন বাড়ির ছাদ, পরিত্যক্ত পরিবহন, টায়ার, প্লাস্টিকের ড্রাম, বালতি, ফুলের টব, স্যাঁতসেঁতে মেঝেতে এডিস মশার বংশবিস্তার বেশি দেখা যায়।

কীটতত্ত্ববিজ্ঞানী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মাহাবুবুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জলবায়ু ও তাপমাত্রার পরিবর্তনে আমাদের দেশে এডিস মশার বংশবিস্তারে প্রভাব পড়ে। আমাদের দেশে বর্ষাকাল এই মশার প্রজননবান্ধব। এবার আগের চেয়ে পরিস্থিতি আরো খারাপ হওয়ার কারণগুলো নিয়ে কাজ করা দরকার। বিশেষ করে মশা নিধনের যে পদ্ধতি বা কীটনাশক ব্যবহার করা হয়, সেটা কতটা সঠিক সেটাও বিবেচনায় নিতে হবে। কেবল ওপরে স্প্রে করলেই হবে না, একই সঙ্গে পানির স্তরেও লার্ভা ও পিউপা নিধনে তরল কীটনাশকে জোর দিতে হবে। সেই সঙ্গে মানুষকেও সচেতন হতে হবে নিজ নিজ বাসাবাড়ি পরিষ্কার রাখতে।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ডা. আয়েশা আক্তার জানান, গত বছর পুরো ডেঙ্গু মৌসুমে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ছিল দুই হাজার ৭৫৯। আর মৃত্যু ছিল আটজনের। এবার জুলাইয়ের শুরুতেই হঠাৎ করে প্রকোপ বেড়ে গেছে। জুনে তিনজন এবং জুলাইয়ে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এর আগে জানুয়ারিতে মারা গেছে আরো একজন। এ ছাড়া মঙ্গলবার পর্যন্ত আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৯০৫ জন। যদিও এই তথ্য সব হাসপাতালের নয়। যে কটি হাসপাতাল থেকে তথ্য দেওয়া হয়েছে সেই হিসাবই এই কেন্দ্রে সংরক্ষণ করা হয়। এখনো সামনের বর্ষা মৌসুমজুড়েই ডেঙ্গুর ঝুঁকি রয়েছে।

এমন পরিস্থিতি সামনে রেখেই গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ এবারে দেশে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া রোগের বাহকের ওপর জরিপকাজের ফলাফল নিয়ে পর্যালোচনায় বসেন। সভায় ওই অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা, পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. সানিয়া তহমিনা, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সাবরিনা ফ্লোরা, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. জাকির হাসানসহ অন্য বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত ছিলেন। তাদের সামনে জরিপের ফলাফল উপস্থাপন করেন রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার উপকর্মসূচি ব্যবস্থাপক ডা. এম এম আক্তারুজ্জামান ও কীটতত্ত্ববিদ মো. খলিলুর রহমান।