এক সময়ের ক্রিকেট ক্যাপ্টেন এখন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী

ফুলকি অনলাইন: পাকিস্তানের পার্লামেন্ট নির্বাচনে ইমরান খানের নেতৃত্বাধীন তেহরিকে ইনসাফ পার্টি মুসলিম লীগ-নওয়াজের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ আসন পেয়ে বিজয়ী হয়েছে। তবে তেহরিকে ইনসাফ ছাড়া আর সব দল নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেছে।

বুধবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনের প্রাথমিক বেসরকারি ফলাফলে দেখা যাচ্ছে তেহরিকে ইনসাফ পেয়েছে ১১১টি আসন এবং মুসলিম লীগ-নওয়াজ পেয়েছে ৬৫টি আসন।

এ ছাড়া, বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারির নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান পিপলস পার্টি পেয়েছে ৪৩টি, এমকিউএম ৫টি এবং এমএমএ ৯টি আসন লাভ করেছে। আজ বৃহস্পতিবার পাকিস্তান নির্বাচন কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করবে বলে কথা রয়েছে।

বুধবার সন্ধ্যার পর নির্বাচনের ফলাফল ঘোষিত হতে শুরু করার পর তেহরিকে ইনসাফ দলের সমর্থকরা রাস্তায় নেমে উল্লাস প্রকাশ করে।

এদিকে পাকিস্তানের বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেছে। পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজের শীর্ষস্থানীয় নেতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের ভাই শাহবাজ শরীফ এক সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, নির্বাচনে নজিরবিহীন কারচুপি হয়েছে এবং এর ফলাফলে জনগণের প্রকৃত রায়ের প্রতিফলন ঘটেনি। পাকিস্তান পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান বিলাওয়াল ভুট্টো নির্বাচনের ফলাফলকে ‘অযৌক্তিক ও অসঙ্গত’ বলে তা প্রত্যাখ্যান করেছেন।

পাকিস্তানের অন্যান্য রাজনৈতিক দলও নির্বাচনের ফলাফলের ব্যাপারে কঠোর আপত্তি জানিয়েছে।

তবে পাকিস্তান নির্বাচন কমিশনের প্রধান (সিইসি) মুহাম্মাদ রাজা খান এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে দাবি করেছেন, নির্বাচন ১০০% সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়েছে। তিনি আজ (বৃহস্পতিবার) ভোর ৪টায় রাজধানী ইসলামাবাদে এক সংবাদ সম্মেলন করে এ ঘোষণা দেন।

পাকিস্তানের সেনাবাহিনী সেদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে বিশেষ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন ব্যবস্থা নিয়ে তেহরিকে ইনসাফ দলকে বিজয়ী করার জন্য আগে থেকে পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে বলে বিভিন্ন মহল থেকে অভিযোগ শোনা যাচ্ছিল।

পাকিস্তান নির্বাচন কমিশন বলছে, জাতীয় পরিষদের ২৭২ আসনের বিপরীতে এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ৩ হাজার ৪৫৯ প্রার্থী। এরমধ্যে শুধুমাত্র পাঞ্জাব থেকেই এক হাজার ৬২৩ জন, সিন্ধ থেকে ৮২৪ জন, খাইবার পাখতুনখাওয়া থেকে ৭২৫ জন ও বেলুচিস্তান থেকে ২৮৭ জন। এছাড়া দেশটির দুটি আসন এনএ-৬০ ও এনএ-১০৮ এ নির্বাচন স্থগিত রয়েছে।

কোনো একক দল ক্ষমতায় যেতে হলে থলেতে ভরতে হবে কমপেক্ষ ১৩৭ আসন; তবেই দেশ শাসনের জন্য সরাসরি সরকার গঠন করতে পারবে। এছাড়া কোনো দলই যদি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারে তাহলে ঝুলে যাবে পাকিস্তানের পার্লামেন্ট। দ্বারস্থ হতে হবে ছোট-খাট দলগুলোর; জোট গঠন করে তবেই মসনদে যেতে হবে।

এদিকে, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে পাকিস্তানের সাবেক ক্রিকেট তারকা ও পাকিস্তান তেহরিক-ই ইনসাফের (পিটিআই) প্রধান ইমরান খানকে এগিয়ে রেখেছে ব্রিটিশ দৈনিক দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট। এক প্রতিবেদনে ইন্ডিপেনডেন্ট বলছে, দেশটির পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার প্রতিযোগিতায় পাকিস্তানের বিশ্বকাপজয়ী কিংবদন্তি অধিনায়ক ইমরান খানই রয়েছেন এগিয়ে।

মধ্য-ডানপন্থী পাকিস্তান তেহরিক-ই ইনসাফের এই প্রধান দুর্নীতিবিরোধী প্ল্যাটফর্মে থেকে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। দেশটির তিনবারের প্রধানমন্ত্রী কারাবন্দি নওয়াজ শরিফের রক্ষণশীল রাজনৈতিক দল পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজের (পিএমএল-এন) বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতা করছেন ৬৫ বছর বয়সী ইমরান।

লন্ডনে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ক্রয় ও কর ফাঁকি দিয়ে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ-পাচার এবং বিদেশে কোম্পানি খোলার দায়ে অভিযুক্ত নওয়াজকে গত বছর দেশটির আদালত প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে বরখাস্ত করেন। ২০১৫ সালে পানামা পেপার্স কেলেঙ্কারিতে নওয়াজের নাম আসার পর দেশটির আদালত তদন্ত শুরু করে। এই তদন্তে অবৈধ সম্পত্তির খোঁজ পাওয়ার পর দেশটির দুর্নীতিবিরোধী আদালত সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীকে ১০ বছরের কারাদণ্ডাদেশ দেয়। কার্যত কোণঠাসা নওয়াজের দল যে এবারের নির্বাচনে জনগণের কাছে প্রত্যাখ্যাত হতে যাচ্ছে সেই ইঙ্গিতও মিলতে শুরু করেছে।

দুর্নীতি ও কেলেঙ্কারিতে জড়িত ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ইমরান খান ১৯৯৬ সালে তার রাজনৈতিক দল পিটিআই গঠন করেন। ২০১৩ সাল থেকে দেশটির জাতীয় পরিষদের নির্বাচিত সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন তিনি। বিভিন্ন সামাজিক অনাচারের বিরুদ্ধে পরিষ্কার প্রতিবাদ জানিয়ে দেশটিতে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান সাবেক এই ক্রিকেট তারকা।

সমালোচকরা বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে নেমে দেশটির সেনাবাহিনীর কাছে থেকে ব্যাপক সমর্থন পেয়েছেন ইমরান খান। ১৯৫২ সালের ৫ অক্টোবর লাহোরে জন্ম নেয়া ইমরান খান সিভিল ইঞ্জিনিয়ার ইকরামুল্লাহ খান নিয়াজি ও শওকত খানম দম্পতির একমাত্র ছেলে। অক্সফোর্ডের কেবলে কলেজে ভর্তির আগে ইংল্যান্ডের আইতচিশন কলেজে পড়াশোনা করেন তিনি।

মাত্র ১৮ বছর বয়সে পাকিস্তানের ক্রিকেটে তার অভিষেক হয় ১৯৭১ সালে। দূরন্ত এই অলরাউন্ডার ১৯৮২ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান জাতীয় দলের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। একেবারে ক্যারিয়ারের শেষের দিকে ১৯৯২ সালে দেশের জন্য বয়ে নিয়ে আসেন গৌরবোজ্জ্বল বিশ্বকাপ ট্রফি। দেশের হয়ে ৩৮০৭ রানের পাশাপাশি ৩৬২ উইকেট নিয়েছেন তার উজ্জ্বল ক্রিকেট ক্যারিয়ারে।

ইংলিশ কাউন্টিতে উস্টারশায়ারের হয়ে খেলা ইমরান খানের জায়গা হয়েছে আইসিসির হল অব ফেমে ২০১০ সালে। ইমরান খানের জীবনী নিয়ে নির্মিত ‘কাপ্তান : দ্য মেকিং অব অ্যা লিজেন্ড’ চলচ্চিত্র তৈরি হয় একই বছরে।

খেলা থেকে অবসর নেয়ার পর ইমরান খান সমাজের উন্নয়নে হাত বাড়িয়ে দেন। তার মায়ের নামে প্রতিষ্ঠিত শওকত খানম মেমোরিয়াল ট্রাস্টের নামে পাকিস্তান, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও থাইল্যান্ডে টিকাদান কর্মসূচি নিয়ে কাজ করেন তিনি।

১৯৯১ সালে পাকিস্তানের প্রথম ক্যান্সার হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করে এই ট্রাস্ট। লাইবেরিয়ার ফুটবলার জর্জ উয়িয়াহ, সেনেগালের সংগীত শিল্পী বাবা মালের মতো খেলোয়াড়ি খ্যাতিকে কাজে লাগিয়ে রাজনীতির ময়দানে নামেন ইমরান খান। ১৯৯৯ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত দেশটির ক্ষমতায় থাকা স্বৈরশাসক পারভেজ মুশাররফের ব্যাপক সমালোচনা করে দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমের শিরোনামে আসেন তিনি।

মৌলবাদী ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সুর নরম করে প্রগতিশীল নারীবাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক সমালোচনা করেন তিনি। এই মৌলবাদী ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে জঙ্গিগোষ্ঠী তালেবানও রয়েছে। মৌলবাদ ঘেঁষা দলগুলোর প্রতি তার নমনীয়তার কারণে অনেকেই তাকে ‘তালেবান খান’ বলেও ডাকেন। শুধু এখানেই থেমে নেই ইমরান খান, দেশটির কট্টরপন্থী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সুর মিলিয়ে ব্ল্যাসফেমি আইন বলবৎ করার অঙ্গীকার করেন তিনি। ব্ল্যাসফেমি আইনে ইসলামের সমালোচনাকারীদের মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে।

২০১৩ সালে দেশটির সাধারণ নির্বাচনে ভোট কারচুপির অভিযোগ এনে ব্যাপক প্রতিবাদের ডাক দেন ইমরান। মাত্র ১৯ শতাংশ ভোট পায় ইমরানের পিটিঅাই। এর কিছুদিন পরে পানামা পেপার্স কেলেঙ্কারিতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের নাম আসার পর দুর্নীতির মাধ্যমে গড়া পিএমএল-এনের এই নেতার অবৈধ সম্পত্তির ফৌজদারি তদন্ত দাবি করেন ইমরান।

এছাড়াও প্রতিবেশী আফগানিস্তানে মার্কিন সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপ ও ড্রোন ব্যবহারের বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ ইমরান খান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্দেশে তিনি বলেন, ট্রাম্প পাকিস্তানের ইতিহাস এমনকি আফগানিস্তানের জনগণের চরিত্র বোঝেন না।

ব্যক্তিগত জীবনে ইমরান খানের যশ রয়েছে প্লেবয় হিসেবে। ব্রিটিশ সাংবাদিক জেমিমা গোল্ডস্মিথ ১৯৯৫ সালে বিয়ে করার কারণেও ব্যাপক অালোচনায় ছিলেন তিনি। ধর্ম ত্যাগ করে জেমিমা ইসলাম গ্রহণ করলেও তাদের বিচ্ছেদ ঘটে ২০০৪ সালে। জেমিমা-ইমরানের সংসারে ছিল দুই সন্তান। ব্রিটিশ এক ট্যাবলয়েডে অভিনেতা হাগ গ্রান্ট ও রাসেল ব্র্যান্ডের সঙ্গে জেমিমার সম্পর্কে জড়িয়ে খবর প্রকাশ হওয়ার পর ইমরানের সংসারে টানাপড়েন শুরু হয়।

জেমিমা ছাড়াও ব্রিটেনের আরেক সাংবাদিক ও বিবিসির সাবেক উপস্থাপিতা রেহাম খানকে বিয়ে করেন তিনি। কিন্তু তাদের এই সংসার টিকে মাত্র ১০ মাস। পরবর্তীতে আধ্যাত্মিক গুরু ও পাঁচ সন্তানের জননী বুশরা মানিকাকে বিয়ে করেন চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে।