জাবি’র সাবেক অধ্যাপককে প্রবীণ নিবাস ছাড়তে চিঠি

স্টাফ রিপোর্টার : রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘের একটি কক্ষে থাকেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের সাবেক শিক্ষক অধ্যাপক ড. এম আব্দুল আউয়াল। তিন সন্তানের জনক এই প্রবীণ প্রায় চার বছর ধরে এখানে বসবাস করে আসছেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষ হঠাৎ করে এক জরুরি চিঠি দিয়ে তাকে জানায়, জুলাই মাসের বকেয়া ভাড়া পরিশোধ করে কক্ষ ত্যাগ করতে হবে। আব্দুল আউয়ালের দাবি, কর্তৃপক্ষ এভাবে তাকে বের করে দিতে পারে না, এটা অন্যায়।

অধ্যাপক আব্দুল আউয়াল জানান, তিনি  প্রায় চার বছর ধরে এই প্রবীণ নিবাসের ৫০২ নম্বর কক্ষে বসবাস করছেন। তার পাশের কক্ষে (৫০৩) থাকা অন্য এক প্রবীণ দীর্ঘদিন ধরে তার সঙ্গে খারাপ আচরণ করে আসছেন। বিভিন্ন সময় তাকে ব্যঙ্গ এবং বিদ্রুপ করে কথা বলেন। এমনকি অধ্যাপক আব্দুল আউয়ালকে বিভিন্ন সময় মারধরের চেষ্টা করেছেন ওই প্রবীণ।  তার এমন আচরণে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। অধ্যাপক আউয়ালের ওপর এমন শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের বিচার চেয়ে কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেন তিনি। কিন্তু কর্তৃপক্ষ তার কোনও সুরাহা না করায়, তিনি শঙ্কিত হয়ে ৫০৩ নম্বর কক্ষে বসবাসকারী ব্যক্তির বিরুদ্ধে থানায় একটি জিডি করেন। একই সঙ্গে তিনি কর্তৃপক্ষকে নিবাস ছেড়ে দেওয়ারও সিদ্ধান্ত  জানান। যদিও পরে তিনি তার এ সিদ্ধান্ত বদলানোর কথাও কর্তৃপক্ষকে জানান। অথচ এর কয়েকদিনের মাথায় আব্দুল আউয়ালকে প্রবীণ নিবাস ত্যাগ করার জন্য চিঠি দেয় কর্তৃপক্ষ।

২০১৭ সালের ৪ নভেম্বর প্রবীণ নিবাসের সভাপতি বরাবর দেওয়া অধ্যাপক আব্দুল আউয়াল এক অভিযোগপত্রে তিনি উল্লেখ করেছেন, ঈদ কবে হবে এমন একটি টপিক নিয়ে ৫০৩ নম্বর কক্ষে বসবাসরত ব্যক্তির সঙ্গে আলোচনার এক পর্যায়ে ওই ব্যক্তি তাকে মারতে এগিয়ে যান এবং তাকে “ভ-, কীসের ডক্টর, সবই মিথ্যা” এসব বলে গালাগালি করেন। সে সময় জুনেদ আহম্মদ নামে অন্য এক প্রবীণ তাকে রক্ষা করেন। এছাড়া, একটি ঘটনার বর্ণনা দিয়ে ওই ব্যক্তি তাকে নানা সময় ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করেন বলেও উল্লেখ করা হয়েছে চিঠিতে। এছাড়া, প্রবীণ হিতৈষীর মহাসচিব বরাবরও তার বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি অভিযোগ দেন ওই ব্যক্তি।

অধ্যাপক আউয়ালের অভিযোগ, ‘ওই ব্যক্তির এমন আচরণের কারণে সবসময় আমি ভীত সন্ত্রস্ত থাকি। বাধ্য হয়ে আমাকে ষষ্ঠ তলায় স্থানান্তর করার অনুরোধ করি কর্তৃপক্ষকে। কর্তৃপক্ষ সেটাও করেনি। এসবের কারণে আমি এক পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নেইÍ এই নিবাস থেকে চলে যাবো। এ ব্যাপারে  কর্তৃপক্ষকে অভিমান করে একটি চিঠিও লিখি। কিন্তু যখন মনে হয়, আমি ন্যায়বিচার পাইনি, তখন সিদ্ধান্ত নিলাম যে, ন্যায়বিচার না পাওয়া পর্যন্ত আমি এখানেই থাকবো। তখনই  চিঠি দিয়ে বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানাই।’

অধ্যাপক আউয়াল বলেন,‘কর্তৃপক্ষ আমার অভিযোগের সুরাহা না করায় বাধ্য হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় ওই প্রবীণের এমন আচরণের জন্য জিডি করি। থানা থেকে পুলিশ এসে বিষয়টি মীমাংসা করার জন্য কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে গেলেও কর্তৃপক্ষ আমার অভিযোগের বিচার না করে উল্টো আমাকেই নিবাস থেকে চলে যেতে নোটিশ দিয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘এভাবে বের করে দেওয়া মানে আমাকে চরমভাবে অপমান অপদস্থ করা। আমি কীভাবে এটা মেনে নেবো? ওই ব্যক্তি আমার সঙ্গে যে ধরনের গালাগালি করেছেন, তার অডিও রেকর্ড আমার কাছে আছে। আমি কর্তৃপক্ষকেও তা অবহিত করেছি। কিন্তু কর্তৃপক্ষ কখনও এটার মীমাংসার চেষ্টাও করেনি।’ প্রবীণ হিতৈষী সংঘ ত্যাগ করার নোটিশের বিষয়ে জানতে চাইলে সংস্থাটির মহাসচিব অধ্যাপক ড. এএসএম আতিকুর রহমান  অভিযোগের  তীর তোলেন অধ্যাপক আউয়ালের দিকে।

তিনি বলেন, ‘দেখুন, বৃদ্ধ মানুষেরা বাচ্চাদের মতো হয়ে যান, অনেক কিছুই বুঝতে চান না।  আমি নিজেও বৃদ্ধ হয়ে যাচ্ছি, এক সময় আমিও তাদের মতো হয়ে যাবো। সমস্যা দু’জনেরই আছে। তারা বিভিন্ন সময় ঝগড়ায় লিপ্ত হন। অধ্যাপক আউয়ালেরও বেশ কিছু অন্যায় আছে। কিন্তু আমরা তো কিছু করতে পারি না। কারণ, এই বৃদ্ধদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেবো? আমরা চাই, শেষ বয়সে এখানে যারা থাকেন, তারা যেন ভালো থাকেন। কিন্তু তারা যদি সমস্যায় জড়িয়ে পড়েন, তাহলে কীভাবে ঠেকাবো? তারপরও অনেক চেষ্টা করেছি, তাদেরকে নিয়ে বসেছি। কিন্তু কোনও লাভ হয় না। অধ্যাপক আউয়াল হঠাৎ জানালেন যে, তিনি চলে যাবেন। এই নোটিশ পেয়ে আমরা রুম ভাড়াও দিয়েছি। কিন্তু তারপর তিনি আবার জানালেন, যাবেন না। কিন্তু আমরা তো বের করে দিতে পারি না। তাই তাকে আর কিছু বলিনি। কিন্তু তিনি হঠাৎ করেই থানায় জিডি করে বসলেন। পুলিশ আসলো, তখন আর কী বলার আছে। পুলিশের কাছে এমন অভিযোগ করায় এই নিবাসের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। এমন নানা কারণে পরে বাধ্য হয়ে তাকে চলে যাওয়ার নোটিশ দিলাম।’

দুই প্রবীণের মধ্যে কলহের সমাধান কি একজনকে বের করে দেওয়ার মাধ্যমে হবে? এ প্রশ্নে তিনি বলেন,‘তাকে নোটিশ দিয়েছি শোধরানোর জন্য। আসলে আমরা কাউকে যেতে দিতে পারি না। তাকেও দেবো না। এমন নোটিশ দিয়ে তাকে একটু ভয় দেখিয়েছি। দেখি, তিনি শোধরান কীনা।’