ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই নেয়া চমকপ্রদ ও অমূল্য যত তরবারি

ফুলকি ডেস্ক: সম্রাটের সম্মান ও বীরত্বের প্রতীক। কখনো বা সাম্রাজ্যের স্বাধীনতা, কখনো অলৌকিক বিজয়গাঁথা সকলের সাথে জড়িয়ে রয়েছে শমসের, তলোয়ার বা তরবারীর নাম। বিশেষ করে মধ্যযুগীয় সময়ে, তলোয়ারগুলি সম্মান ও সাহসিকতার প্রতীক রূপে উচ্চ স্থানে আসীন ছিলো। ইতিহাসের পাতায় বীরের যত বীরত্ব গাঁথা তা সময়ের কোরাল গ্রাসে মলীন হলেও , তলোয়ারগুলি ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক কাহিনী আজও ছড়িয়ে রয়েছে শত লোকগাঁথায়।

ইতিহাস ও পৌরাণিক জগতে কিছু তলোয়ার নিয়ে যেমন রয়েছে চমৎকার গল্প, তেমনি রয়েছে রহস্যের ঘনঘটা। আমাদের আজকের লেখাটি অমরত্ব প্রাপ্ত সেসব তলোয়ার নিয়ে।

সম্রাট আর্থার এর তলোয়ার- এক্সক্যালিবার

সম্রাট আর্থার ছিলেন মধ্যযুগের ব্রিটিশ কিংবদন্তী যিনি বহুবার স্যাক্সনদের যুদ্ধে পরাস্ত করেছেন। আর্থারিয়ান কিংবদন্তী অনুসারে, এক্সক্যালিবার তলোয়ারটি একটি পাথরে গাঁথা ছিল। শত শত সেরা বীর এই তলোয়ারের অলৌকিক ক্ষমতায় বিশ্বাসী ছিল। কিন্তু কেউ সেই তলোয়ারটি পাথর থেকে টেনে বের করতে পারেন নি।

সম্রাট আর্থার এর তলোয়ার- এক্সক্যালিবার

পেরেছিলেন একমাত্র সম্রাট আর্থার। কথিত রয়েছে আর্থার ছিলেন নিতান্তই ছিন্নমূল একজন মানুষ। কিন্তু যেদিন তিনি তলোয়ারটি পাথর থেকে উদ্ধার করেম সেইদিন হতে তার ক্ষমতার ও শক্তির উদ্ভব। এক্সক্যালিবার সম্রাট আর্থার কে কিংবদন্তীর রাজা বানিয়েছিলেন অলৌকিক। এই তলোয়ারটির বলে রয়েছে মৃত্যুঞ্জয়ী ক্ষমতা। সম্রাট আর্থার  যখন মৃত্যুসজ্জায়, তিনি স্যার বেইডভেরের হাতে তলোয়ার টি তুলে দিয়ে নাম না জানা হ্রদে ছুঁড়ে ফেলতে বলেছিলেন, যে দায়িত্ব স্যার বেইভের পালন করেন। কথিত রয়েছে হ্রদের তলদেশ হতে অজ্ঞাত নারীর হাত এক্সক্যালিবার কে অজানা থ্রদের তলদেশে নিয়ে যায়। কিংবদন্তি বলে সম্রাট আর্থার মৃত্যুর হাত ধরে শান্তিতে ঘুমাচ্ছেন এবং একদিন তিনি ঘুম থেকে উঠে আবারও  হাতে এক্সক্যালিবার তুলে নিয়ে হাজির হবেন দেশমাতৃকার টানে যেদিন সত্যি  তার দেশের তাকে প্রয়োজন হবে।

কোলাডা এবং তিজোনা

কোলাডা এবং তিজোনা হল স্পেনের এল সিড ক্যাম্পেডোরোর (মধ্যযুগীয় স্পেনের কাস্টিলিয়ান অভিজাত পুরুষ এবং সামরিক নেতা) তলোয়ার। স্পেনের উল্লেখ্য শাসক এল সিড ক্যাম্পেডোরো তরবারীদ্বয় এর আগের মালিক, ভ্যালেন্সিয়ার রাজা ইউসেফ, এবং কাউন্ট অব বার্সেলোনা কে যুদ্ধে পরাজিত করে বিজয় স্মারক স্বরূপ কোলাডা এবং তিজোনা দখল করে।

কোলাডা এবং তিজোনা

এল সিড তলোয়ার দুইটি তার দুই মেয়ের জামাইকে উপহার হিসেবে প্রদান করে। কিন্তু পরে, ক্যান্টার ডি মিও সিড (ক্যাস্তিলিয়ান মহাকাব্যের কবিতা) অনুসারে জানা যায়, যখন তার জামাতারা তার মেয়েদের মারধর করে এবং পরবর্তীতে রাস্তার পাশে ছেড়ে দেয়, তখন এল সিড তার উপহার দেওয়া তরবাদ্বয় ফেরত চেয়েছিলেন । পরবর্তীতে, তিনি  মার্টিন অ্যান্টলিনেজ, তার নাইটদের একজন কে কোলাডা উপহার দেন। মাদ্রিদ এর রয়েল প্রাসাদ আজও তলোয়ার দুইটি সংরক্ষিত রয়েছে।

জুলফিকার

কিংবদন্তী অনুসারে ‘জুলফিকার’- তরবারিটি হযরত আলী ইবন আবু তালিব (মহানবী মুহাম্মদের চাচাতো ভাই ও জামাতা, কে মহানবী উপহার দিয়েছিলেন। মহানবী মুহাম্মাদ (সাঃ) এর দেওয়া তরবারিটি ছিল দোধারি তলোয়ার।

জুলফিকার

এই ইসলামী তরবারী প্রতিকী গহনা রূপে বা বিচার দন্ড হিসেবে ব্যবহৃত হতো। জুলফিকার ছিল বাঁকা ফলক বিশিষ্ট ছোট তলোয়ার যার শীর্ষ ভাগ দুটি তীক্ষ্ণ ভাগে সমাপ্ত।  যখনই কখনো ইসলামী তরবারীর নাম উল্লেখ করা হয় তবে জুলফিকারের নাম সবার আগে উচ্চারিত হয়।

কুসুনাগি নো সুরুগি

এটি একটি কিংবদন্তিতুল্য জাপানি তলোয়ার, যার খ্যাতি এক্সক্যালিবারের সমতুল্য এবং জাপানী রাজতন্ত্রের তিনটি পবিত্র সম্পদের একটি হিসেবে গণ্য করা হয়। প্রাথমিক ভাবে তরবারিটি আম-নূর-মুরাকুমো-না-সুরুগি (স্বর্গের সমাবেশের মেঘের স্রোত) নামে অভিহিত হলেও পরবর্তীতে আরো জনপ্রিয় নাম কুসনাগি-না-সুরুগি (“ঘাস কাটা তরবারি”) রূপে এটি রূপান্তরিত হয়। কোজিকি’র মতে, দেবতা সুসানু একটি দুঃখী পরিবারের সাহচর্যে আসেন, যারা তাদের আট কন্যার সাতজনকে কোশি থেকে পরিচালিত আট মাথা বিশিষ্ট সর্পের দংশনে নির্মমভাবে হারিয়ে ফেলেন।

কুসুনাগি নো সুরুগি

কথিত রয়েছে আট মাথা বিসিট সাপটির সাত মাথা সাতটি কন্যাকে হত্যা করার পর অষ্টম মাথাটি সর্বশেষ কন্যাকে হত্যা করতে উদ্যত হয়। সুসানু তখন এই ভয়াবহ সাপকে পরাজিত করে হত্যার পরিকল্পনা করে। শর্ত ছিল বেঁচে থাকা মেয়েটি সুসানুকে বিয়ে করবে। সুসানু আটটি বেড়ার গেট তৈরি করে তার পিছনে পৃথক পাটাতনের উপর আট ব্যারেল সাকে (ঐতিহ্যবাহী জাপানি ওয়াইন) রাখার নির্দেশ দিয়ে অপেক্ষায় লিপ্ত হয়। সাকের লোভে পরে আট মাথা বিশিষ্ট সাপটি আলাদা ভাবে ৮টি গেটে তার মাথা প্রবেশ করায়। সাসুকো তলোয়ার দিয়ে পৃথকভাবে আটটি মাথাই কেটে ফেলেন। এবং পরবর্তীতে লেজের দিকে ধাবিত হন। চতুর্থ লেজের কাছে তিনি কুসনাগি-না-সুরুগি নামের এই মহান তলোয়ার খুঁজে পান।

শার্লিমেন্সের জোয়াইস

ফ্রান্সের আরদেচী নগরীর জয়ুস শহরের নামানুসারে দৃশ্যত এই তলোয়ার এর নামকরণ করা হয়। এছাড়াও, কিংবদন্তি অনুসারে, জয়িউস কোন একটি যুদ্ধে হারিয়ে যায় এবং শার্লিমেন্সের নাইট বা যোদ্ধার সহায়তায় উদ্ধার প্রাপ্ত হন। শার্লিমেন যোদ্ধাকে অভিনন্দিত করে তাকে খেতাব দেয়, একই সাথে জয়ুস শহরের দায়িত্ব ও যোদ্ধার হাতে অর্পণ করে। উপহার হিসেবে বীর যোদ্ধাকে তরবারী টি উপহার হিসেবে দেওয়া হয়। কথিত রয়েছে পবিত্র তলোয়ার  কার্টানা ও শার্লিমেন্সের জোয়াইস একই ধাতু হতে নির্মিত।

শার্লিমেন্সের জোয়াইস

ডুরান্ডাল

ডুরান্ডাল হল শার্লিমের এর প্যালাডিন (আর্থার এর নাইট সমতুল্য যোদ্ধা) রোল্যান্ড এর তলোয়ার। রোল্যান্ড এর গান অনুযায়ী, ডুরান্ডাল তলোয়ার টি এক দেবদূত দ্বারা শার্লিমেন কে দেওয়া হয়, এবং তিনি তা রোনাল্ড কে উপহার দেন।

ডুরান্ডাল

ডুরান্ডাল নির্মাণে সংযুক্ত ছিল সোনায় মুড়ানো হাত রাখার জায়গা, দেবদূত পিটার এর একটি দাঁত, দেবদূত ব্যাসিলl এর রক্ত, দেবদূত ডেনিসের চুল এবং কুমারী মেরির পোশাকের  অংশ। কথিত রয়েছে সৃষ্টির সমস্ত তলোয়ারগুলির মধ্যে ডুরান্ডালের ধার তীব্রতম।

লেগবাইটার

লেগবাইটার

‘লেগবাইটার’ ভাইকিং রাজা তৃতীয় ম্যাগনাস এর তলোয়ার। এই তলোয়ারটি একটি হাতির দাঁত দিয়ে তৈরি করা এবং সোনা দিয়ে ধরার জায়গাটি মুড়ানো। যখন রাজা উলস্টারের পাঠানো যোদ্ধাদের হাতে ম্যাগনাস  নিহত হয়, তখন তলোয়ার টি হারিয়ে গেছে বলে জানা যায়। পরবরতীতে তলোয়ারটি উদ্ধার করে  ম্যাগনাসের উত্তরাধিকারীর কাছে পাঠানো হয়।

শমসের-ই-জমুরুদনগর

এই তরবারিটির নাম জানা যায় ফার্সি কিংবদন্তি আমির আরসালান হতে। পৌরাণিক কাহিনীগুলি দাবি করে যে, এক শিং বিশিষ্ট ভয়াবহ দানব  ফৌলাদ-জেরহ কে এই তলোয়ার ছাড়া অন্য কোন অস্ত্র দিয়ে হত্যা করা সম্ভব নয়। এটি মূলত রাজা সোলায়মানের তলোয়ার ছিল যার পাহাড়ার দায়িত্ব ছিল ভয়াবহ দানব ফৌলাদ-জেরহ এর উপর। এই তলোয়ার যে কোন জাদুর প্রভাব হতে মুক্ত ছিল।

শমসের-ই-জমুরুদনগর

একমাত্র এই অস্ত্রের আঘাতে মৃত্যু হতে পারে এই ভয়ে ভীত দানব ফৌলাদ-জেরহ এর সুরক্ষায় নিজের সর্বোচ্চ ক্ষমতা প্রয়োগ করেছিলো। যদি কেউ এই তলোয়ারে  সামান্য হলেও আহত হয় তবে তাকে বাঁচানোর একমাত্র উপায় যে ঔষধি তা নির্মাণে ব্যবহৃত হতো নানা উপাদান। কিন্তু তাও পূর্ণাঙ্গ ঔষধি বানানো সম্ভব নয় কারণ এক মূল উপাদানের অভাব। সেই উপাদান হচ্ছে  মহাদানব ফৌলাদ-জেরহ এর মস্তিষ্কের অংশ বিশেষ। এই কিংবদন্তীর রহস্যময় তলোয়ারের অবস্থান অজানা।

ওয়ালেশের তলোয়ার

ওয়ালেশের তলোয়ার

এই তলোয়ার টি তেরো শতাব্দীর স্কটিশ নাইট উইলিয়াম ওয়ালেসের ব্যক্তিগত বলে দাবি করা হয়। উইলিয়াম স্কটিশ স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ইংরেজদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। ১২৯৭ সালে স্টার্লিংয়ের যুদ্ধে এবং ১২৯৮ সালে ফালকিরক যুদ্ধে এই তলোয়ারটি ব্যবহার করা হয়েছিল। এই দোধারি তীক্ষ্ণ তলোয়ারের বিশেষত্ব হচ্ছে তার আকার। বিশেষজ্ঞদের মতে ওয়ালেস অন্তত ৭ ফুট লম্বা ছিলেন। নাহলে যুদ্ধক্ষেত্রে এই তলোয়ার ব্যবহার করা রীতিমত অসম্ভব ঘটনা।

গৌজিয়ান

এই কিংবদন্তির তলোয়ারটি ১৯৬৫ সালে চীনে উন্মোচিত হয়েছিল। ২০০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কবর দেওয়া সত্ত্বেও, এই তলোয়ারটি নতুনের মত ভাল অবস্থায় খুঁজে পাওয়া যায়। তলোয়ারের হ্যান্ডেলের কাছাকাছি ফলকটিতে ৪ টি সীল কৃত অক্ষর রয়েছে যার অনুবাদটি এমন- ” এই তলোয়ার গৌজিয়ানের, যিনি ইউ রাজত্বের রাজা”।

গৌজিয়ান

গৌজিয়ান চীনের বিখ্যাত সম্রাট ছিলেন যিনি পুরাতাত্ত্বিক সময় বসন্ত এবং শরৎকালের রাজত্ব করেছিলেন ( খ্রিস্টপূর্ব ৭৭১ হতে ৪০৩ শতকে)। যদিও গৌজিয়ান সম্রাট, য়ু- সাম্রাজ্যের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন তবু সুদীর্ঘ দশ বছর পর বিজয় ছিনিয়েও এনেছিলেন। গৌজিয়ানের হাতে ছিলেন সেই একই নামক তলোয়ার।

কার্টানা, ক্ষমা প্রদর্শনের তলোয়ার

এটি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের রাজত্বকালে ব্যবহৃত একটি আনুষ্ঠানিক তলোয়ার। এটা যুক্তরাজ্যের ক্রাউন জুয়েলগুলোর একটি বলে বিবেচিত। কিংবদন্তির এই তলোয়ারের শীর্ষভাগটি ভোঁতা ও বর্গাকৃতির যা ক্ষমা প্রদর্শনের প্রতীক রূপে চিহ্নিত। ১২৩৬ সাল হতে ব্যবহৃত এই তরোয়ালটি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অনেক কিংবদন্তির সাথে সংযুক্ত।

হাজারো সাম্রাজ্য, হাজারো শাসক এর উত্থান-পতন এর সাক্ষী এসব তলোয়ারের সত্যি কি রয়েছে অলৌকিক ক্ষমতা? পাঠক তা আমার জানা নেই, খুঁজতে হবে সত্য-মিথ্যার অবিশ্বাস্য সব ইতিহাস। তবু উত্তর মেলবে কি !