বামপন্থী দল বেশি, ভোট কম

স্টাফ রিপোর্টার : বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক দলের পরই সমাজতান্ত্রিক ভাবধারার বামপন্থী রাজনৈতিক দলের সংখ্যা বেশি। এই দলগুলোর মধ্যে অর্ধেক নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত এবং নিবন্ধনের অপেক্ষায় আছে কয়েকটি দল। দলের সংখ্যার দিক থেকে ডান-গণতান্ত্রিক ধারার দলগুলোর চেয়ে সংখ্যায় বেশি হলেও বামদলগুলো ভোটে অনেক পিছিয়ে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে গৃহীত ৫৫ শতাংশ ভোটের ৩.২৩ শতাংশ ভোট পেলেও সর্বশেষ নবম সংসদ নির্বাচনে সে সংখ্যা আরও কমে যায়।

বামদলগুলোর নেতারা এ বিষয়টিকে নিজেদের ‘দুর্বলতা’ হিসেবেই দেখছেন। তাদের ভাষ্য, আদর্শগত রাজনীতি করতে গিয়ে বাম দলগুলোর মধ্যে অন্তর্গত কিছু সমস্যা তৈরি হয়েছে। আগামী দিনে এসব সমস্যাকে চিহ্নিত করে সমাধান করতে পারলেই একটি বিকাশমান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বাম জোট রাজনীতিতে নিয়ামক শক্তি হিসেবে দেখা দেবে।

বাসদের সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান বলেন, বামপন্থীদের শক্তি এখন দুর্বল এটা অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই। কিন্তু একটি বিকাশমান শক্তি হিসেবে আগামী ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে আবির্ভূত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বামদলগুলোর। যদি মিলিত ভাবে বাম দলগুলো তাদের লড়াই চালিয়ে যেতে পারে এবং কোন ধরনের ক্রটি-বিচ্যুতির মধ্যে না পড়ে তাহলে আগামীতে বামপন্থীরা জাতির সামনে একটি নিয়ামক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন তিনি।

গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি বলেন, বামপন্থীদের নানান সমস্যার মধ্যে দিয়ে যেতে হচ্ছে। শাসকশ্রেণির বাধা, লুটপাটের রাজনীতি, স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা বাম আন্দোলন বিকাশের প্রধান বাধা। পাশাপাশি বামপন্থীদের নিজেদের ভেতরে কিছু সমস্যা রয়েছে। এর ফলে  পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কীভাবে জনগণের কাছাকাছি যেতে হবে বামদের সেই ভাবনা-চিন্তায় এখনও যথেষ্ট পরিণতি আসেনি। তারপরও জনগণের কাছে বিকল্প শক্তি হিসেবে দাঁড়ানোর জন্য বামপন্থীরা ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে ধীরে ধীরে।

গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির সাধারণ সম্পাদক মোশরেফা মিশুও স্বীকার করেন, অন্যদলের তুলনায় বাংলাদেশে বামদের শক্তি ও সামর্থ্য কম। তিনি বলেন, বাম দলগুলোর একটা মতাদর্শিক রাজনৈতিক অবস্থা  থাকে। কিন্তু আমরা এখন পর্যন্ত জনগণের আস্থাভাজন সেই রকম সংগঠক বা নেতা তৈরি করতে পারিনি বা হয়নি। এটা একটা বড় ব্যর্থতা আমাদের। সে কারণে বাম দলগুলো জনগণের কথা বললেও তাদের আস্থার জায়গায় যেতে পারেনি। তবে যেভাবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বিভিন্ন নীতিহীন কর্মকা-ের জন্য দলগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা উঠে যাচ্ছে সেই জায়গাটায় যদি বামরা সঠিকভাবে কাজ করতে পারে তাহলে জনগণের দল হিসেবে গড়ে উঠবো আমরা।

‘বাংলাদেশে বামপন্থী রাজনীতির গতিধারা’ গ্রন্থে বামপন্থী রাজনীতিকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে সমাজে পিছিয়ে পড়া মানুষদের জন্য রাজনীতি হিসেবে। গ্রন্থকার জগলুল আলমের ভাষ্য অনুযায়ী,‘বামপন্থী রাজনীতির অবস্থান বা কর্মকা- হচ্ছে সামাজিক অসাম্য ও সামাজিক ক্রমাধিকারতন্ত্রের বিরুদ্ধে সামাজিক সাম্যকে প্রতিষ্ঠা করা। এই রাজনীতি বিশেষভাবে জড়িত থাকে সমাজে যারা অন্যের তুলনায় কম পায় বা সুযোগহীন থাকে তাদের ব্যাপারে এবং পূর্বধারণা করে যে অসাম্যের অবিচার কমানো বা বিলুপ্ত করা উচিত।’ কিন্তু, বাংলাদেশের বাস্তবতা হচ্ছে নেতৃত্বগত কোন্দল এবং আদর্শগত দ্বন্দ্বের কারণে বারবার বামপন্থী দলগুলো হয়েছে দ্বিধাবিভক্ত।একটি দল ভেঙে কয়েকটি দল হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে ২১টি বাম রাজনৈতিক দল আছে। এর মধ্যে বেশিরভাগেরই সাংগঠনিক অবস্থা দুর্বল।  নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তথ্যানুযায়ী,বাংলাদেশে নিবন্ধিত সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক (বাম) দলের সংখ্যা ১০টি। এগুলো হচ্ছে বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল (এম.এল)- সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি- সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)- সভাপতি অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (বাংলাদেশ ন্যাপ)- চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গাণি, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি- সভাপতি রাশেদ খান মেনন, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি- সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)-সভাপতি হাসানুল হক ইনু, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)-সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান, প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দল (পিডিপি) চেয়ারম্যান ড. ফেরদৌস আহমদ কোরেশী। তবে এর বাইরেও অনিবন্ধিত রয়েছে আরও কমপক্ষে ১১টি দল। অনিবন্ধিত দলগুলো হচ্ছে গণতন্ত্রী পার্টি-সভাপতি ব্যারিস্টার মো.আরশ আলী,জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)-সভাপতি শরীফ নুরুল আম্বিয়া, বাসদ-আহ্বায়ক মবিনুল হায়দার চৌধুরী, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)- আহ্বায়ক রেজাউর রশীদ খান, গণতান্ত্রিক মজদুর পার্টি- সভাপতি জাকির হোসেন, গণসংহতি আন্দোলন-প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টি-সাধারণ সম্পাদক মোশরেফা মিশু, ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগ- দলীয় প্রধান প্রফেসর আবদুস সাত্তার, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন-আহ্বায়ক হামিদুল হক, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল-সভাপতি বদরুদ্দীন উমর, জাতীয় গণফ্রন্ট- সমন্বয়ক কমরেড টিপু বিশ্বাস, জাতীয় গণতান্ত্রিক গণমঞ্চ- আহ্বায়ক মাসুদ খান, কমিউনিস্ট কেন্দ্র- আহ্বায়ক ড. ওয়াজেদ ইসলাম খান। বাম দলগুলোর মধ্যে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বধীন ১৪ দলীয় জোটে আছে ১০টি দল। এই দলগুলো হলো- ওয়ার্কার্স পার্টি,জাসদ (ইনু), জাসদ (বাদল), ন্যাপ (মোজাফফর), গণতন্ত্রী পার্টি, গণআজাদী লীগ, বাসদ (রশীদ খান), কমিউনিস্ট কেন্দ্র, গণতান্ত্রিক মজদুর পার্টি, সাম্যবাদী দল। আর ২০ দলীয় জোটে রয়েছে বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (বাংলাদেশ ন্যাপ)- চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গাণি।

এর বাইরে বাম দলগুলোর আরও ২টি জোট রয়েছে। সিপিবি, বাসদ, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টি, ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগ, সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন, গণসংহতি আন্দোলন, বাসদ (মার্ক্সবাদী) মিলে গঠন করা হয়েছে বাম গণতান্ত্রিক জোট। আর জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল, জাতীয় গণফ্রন্ট, বাংলাদেশে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন এই তিন দল নিয়ে গঠিত হয়েছে জাতীয় মুক্তি জোট।

ভোট কমছে বাম দলগুলোর

বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাম দলগুলো ভোটের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে দেখা গেছে তাদের ভোট কমছে। ১৯৯১ সালের পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে বামদলগুলো সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছিল ৩.২৩ শতাংশ। সেখানে নবম সংসদে বাম দলগুলো সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছে ০.৯ শতাংশ। তবে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সরকারের সঙ্গে থাকা ২টি বাম দল ছাড়া অন্যরা নির্বাচনে অংশ নেয়নি। এই সংসদে দলগুলো ভোট পেয়েছে ৩.২৯ শতাংশ। এই সংসদে বিএনপিও অংশগ্রহণ করেনি।

দশম সংসদে ওয়ার্কাস পার্টির (মেনন) ৬ জন সংসদ সদস্য রয়েছেন। এরমধ্যে দু’জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত। দলটি ১৮ টি আসনে প্রার্থী দিয়ে ভোট পেয়েছে ২.১০ শতাংশ। আর জাসদ (ইনু)থেকে নির্বাচিত হন ৫ জন সংসদ সদস্য। এর মধ্যে ৩ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। দলটি ২৪ টি আসনে প্রার্থী দিয়ে ভোট পেয়েছে ১.১৯ শতাংশ । যদিও পরবর্তীতে দলটি ভেঙে যাওয়ায় জাসদ (ইনু) ও জাসদ (আম্বিয়া-বাদল) নামে পরিচিত হয়। সংসদ সদস্যরাও দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যান।

নবম সংসদে ওয়ার্কাস পার্টি ৫ টি আসনে প্রার্থী দিয়ে ২টি আসনে জয় পায়। দলটি ভোট পেয়েছে ০.৩ শতাংশ। আর জাসদ ৬ টি আসনে প্রার্থী দিয়ে ৩ টি আসনে জয়লাভ করে। ওই সংসদে দলটি ভোট পেয়েছে ০.৬ শতাংশ। এর আগে সপ্তম সংসদে জাসদ ৭৬ টি আসনে প্রার্থী দিয়ে ১ টি আসনে জয়লাভ করে। এ সংসদে দলটি ভোট পেয়েছে ০.২৩ শতাংশ।  তবে অষ্টম ও ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বামদলগুলো অংশে নেয়নি।

১৯৯১ সালে পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে ৭টি বাম দল অংশগ্রহণ করে। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল(জাসদ-ইনু) ৬৮  আসনে প্রার্থী দিলেও কোনও আসনে জয়লাভ করতে পারেনি। দলটি ভোট পায় ০.০৫ শতাংশ।  জাসদ (রব) ১৬১ টি আসনে প্রার্থী দিয়ে একটি আসনেও জয় পায়নি। তারা ভোট পায় ০.৭৯ শতাংশ। জাসদ (সিরাজ) ৩১ টি আসনে প্রার্থী দিয়ে একটি আসনে জয় পায়। তারা ভোট পায় ০.২৫ শতাংশ। বাংলাদেশে কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ৪৯ টি আসনে প্রার্থী দিয়ে ৫ টি আসনে জয়লাভ করে। তারা ভোট পায় ১.১৯ শতাংশ। ওয়ার্কার্স পার্টি ৩৫ টি আসনে প্রার্থী দিয়ে ১ টি আসনে জয়লাভ করে। দলটি ভোট পায় ০.১৯ শতাংশ। গণতন্ত্রী পার্টি ১৬ টি আসনে প্রার্থী দিয়ে ১টি আসনে জয়লাভ করে। এই দল ভোট পায় ০.৪৬ শতাংশ। ন্যাপ (মোজাফফর) ৩১ টি আসনে প্রার্থী দিয়ে ১ টি জয়লাভ করে। তারা ভোট পায় ০.৭৬ শতাংশ।

সংসদে বামদলগুলোর প্রতিনিধিত্বের সংখ্যা,জাতীয় নির্বাচনে দলগুলোর ভোট পাওয়ার হার এবং দলীয় কোন্দল ও ভাঙনের দিকে তাকালে সাধারণের চোখেই অনুমেয় দিন দিন শক্তি কমে যাচ্ছে বাম দলগুলোর। এর কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে গণ সংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি মনে করেন, প্রহসনের নির্বাচন, নির্বাচনে টাকার খেলা, পেশি শক্তি এবং প্রশাসনিক কারসাজির কারণে বাম দলগুলোর ভোট কমে যাচ্ছে। তিনি বলেন, বর্তমান নির্বাচনি ব্যবস্থায় দেশের মানুষ ভোট দিতে পারছেন না। ফলে ভোটের ফলাফলের সঙ্গে বাস্তবতার কোনও মিল নেই। এছাড়া যেখানে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির একেকজন প্রার্থী নির্বাচনে কোটি টাকা খরচ করে সেখানে একজন বামপন্থীর পক্ষে এতো টাকা খরচ করা সম্ভব হয় না। নির্বাচনের প্রার্থীদের ব্যয় নির্দিষ্ট থাকলেও এ নিয়ে নির্বাচন কমিশনও কিছু করে না। এই পরিস্থিতি বামপন্থীদের জন্য প্রতিকূল। খালেকুজ্জামান বলেন, একজন বামপন্থী শ্রমিককে মাটির ব্যাংকে টাকা জমিয়ে এবং মানুষের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে নির্বাচন করতে হয়। অন্যদিকে লুটপাটের টাকা দিয়ে মানুষের বিবেক ও ভোট ক্রয় করা হচ্ছে যা বামদের পক্ষে করা সম্ভব নয়। পেশি শক্তি, টাকার শক্তি এবং ভোট জালিয়াতি করে গোটা নির্বাচনি ব্যবস্থাকে বিকল করে দিয়েছে ক্ষমতায় থাকা দলগুলো। সেখানে ভোটের সঠিক চিত্র মানুষ দেখতে পায় না। এই রকম পরিস্থিতিতে মানুষের সমর্থন থাকলেও সেটাকে ভোটে প্রতিফলন করা সম্ভব হচ্ছে না। এটা ভোট কমার অন্যতম কারণ।

মোশরেফা মিশু বলেন, বামদের ভোট কমে যাওয়ার দুটি বড় কারণ রয়েছে। একটি হচ্ছে,এখন মানুষ মনে করে বামরা ভালো কথা বলে, কিন্তু তারা তো ক্ষমতায় যেতে পারে না। তাই বামদের ভোট দিতে চায় না তারা। আর নির্বাচনে এখন যেভাবে টাকা দিয়ে ভোট ক্রয় করা হয় সেখানে বামরা পিছিয়ে আছে। কারণ বামদের এতো টাকা নেই যে ভোট ক্রয় করবে। এছাড়া জোর করে, প্রশাসন দিয়ে মানুষের ভোটের অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। সেখানে আসলে কোন দল কত শতাংশ ভোট পেয়েছে তার সঠিক হিসাব আমরা পাচ্ছি না।