সড়কে গাড়ির গতি যেমনই থাকুক মৃত্যুর সব মামলা হয় বেপরোয়া গতির

সড়কে যেকোনও গাড়ির গতি যেমনই থাকুক, ওই গাড়িটির ধাক্কায় বা সেটির নিচে চাপা পড়ে অথবা অন্য যেকোনোভাবে কেউ মারা গেলে এ জন্য দায়ের করা সব মামলায় একটি অভিন্ন অভিযোগ আনা হয়— বেপরোয়া গতি। সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের ঘটনায় দণ্ডবিধির ৩০৪ (খ) ধারায় বেপরোয়া গতির কারণে মৃত্যুর কথা বলা হয়েছে। এই ধারাটিকে সংযুক্ত করতে দুর্ঘটনায় দায়ের করা সব মামলায়  আনা হয়। অথচ বেপরোয়া গতি ছাড়াও গাড়ির অন্যান্য মারাত্মক ত্রুটির কারণে সড়কে দুর্ঘটনা হয়। এসব দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যুকে অনেকেই ‘হত্যা’ বলে থাকেন। তবে কোনও মামলায় হত্যার অভিযোগের ধারা আনা হয় না। আইনজীবী ও পুলিশ সদস্যরা জানিয়েছেন, আইনের সীমাবদ্ধতার কারণে এই বেপরোয়া গতির অভিযোগ ছাড়া আর কিছু আনা যাচ্ছে না। প্রস্তাবিত সড়ক পরিবহন আইন বাস্তবায়ন হলে মানুষ সুবিচার পাবে বলে তাদের আশা।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাব অনুযায়ী, এ বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত প্রথম ছয় মাসে সারাদেশে সড়কে তিন হাজার ২৬ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। আহত হয়েছেন আট হাজার ৫২০ জন। এই ছয় মাসে দুই হাজার ৮৬০টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। আহতদের অনেকেরই অঙ্গহানি হয়েছে।

এসব দুর্ঘট্নার অনেকটিরই ক্ষেত্রে মামলা হয়েছে। তবে সবই হয়েছে  দুর্ঘটনাজনিত মামলা। তবে নিহতদের পরিবারের অনেকেই দাবি করেছেন, এগুলো হত্যাকাণ্ড। এসব ঘটনায় দায়ের মামলাগুলো হয়েছে দণ্ডবিধির ২৭৯, ৩০৪ (ক), ৩০৪ (খ) এবং ৩৩৭, ৩৩৮ ও ৩৩৮ (ক) ধারায়।

শনিবার (১৪ জুলাই) বিকেলে জাতীয় প্রেসক্লাবের বিপরীতে সেগুনবাগিচায় চলন্ত বাস থেকে নামতে গিয়ে নিহত হন আব্দুল মতিন নামে একজন বয়স্ক পথচারী। এই ঘটনায় শাহবাগ থানায় দুর্ঘটনাজনিত মামলা হয়েছে। সেখানেও এই ৩০৪ (খ) ও ২৭৯ ধারা দুটি রয়েছে বলে জানিয়েছেন ওই থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আকরাম হোসেন।

তিনি বলেন, ‘দণ্ডবিধির ২৭৯ ও ৩০৪ (খ) ধারায় নিহত আব্দুল মতিনের ছেলে ফয়সাল ইসলাম বাদী হয়ে মামলা করেছেন।’
এ ধারায় মামলার বিষয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এই সড়ক দুর্ঘটনার মামলা এই ধারায় হয়।’ অথচ নিহতের ছেলে ফয়সাল এটিকে হত্যাকাণ্ড বলে অভিযোগ করেছেন। তবে মামলায় হত্যার অভিযোগ আনা হয়নি।

দণ্ডবিধির ২৭৯ ধারায় (আহত করা সংক্রান্ত) শাস্তি প্রমাণিত হলে অভিযুক্ত ব্যক্তির তিন বছর পর্যন্ত  সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড কিংবা সর্বনিম্ন এক থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।
অন্যদিকে, সড়কে  দণ্ডবিধির ৩০৪ (ক) ধারায় অবহেলার মৃত্যুর কথা বলা হয়েছে। ৩০৪ (খ) ধারায় বলা হয়েছে, ‘কোনও ব্যক্তি বেপরোয়া যান চালিয়ে বা অবহেলাজনকভাবে জনপথে যান চালিয়ে কারও মৃত্যু ঘটায়। এজন্য দায়ী চালককে তিন বছর পর্যন্ত যেকোনও মেয়াদের কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে হবে।’

এছাড়া মোটরযান আইনেও সড়কে মৃত্যুর জন্য দায়ী চালকের শাস্তি কম। বিপজ্জনক গাড়ি চালানোর শাস্তি হচ্ছে ছয় মাসের কারাদণ্ড বা ৫০০ টাকা জরিমানা। এর সঙ্গে গাড়ি চালানোর লাইসেন্স ও নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত স্থগিত থাকবে। এই একই অপরাধ একই চালক তিন বছরের মধ্যে দ্বিতীয়বার করলে ছয় মাস কারাদণ্ড কিংবা এক হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা গুনতে হবে। সঙ্গে গাড়ি চালনার সনদও এক মাস পর্যন্ত স্থগিত থাকবে।

তবে বেপরোয়া গতিতে বাস চালিয়ে আহত করার ঘটনায় ২৭৯ ধারা অথবা  নিহত করার ঘটনায় ৩০৪ (খ) ধারায় মামলায় চালকের শাস্তি বা ভুক্তভোগী পরিবারের ক্ষতিপূরণ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
দুর্ঘটনায় আহত অনেকের চিকিৎসা করানোর মতো সামর্থ থাকে না। গত ১১ এপ্রিল রাজধানীর ফার্মগেটে বাসচাপায় ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অলটারনেটিভের (ইউডা) শিক্ষার্থী রুনী আক্তার (২৬) আহত হন।  তার ডান পা থেঁতলে যায়। একটি বেসরকারি হাসপাতালে তার চিকিৎসা করাতে হয়েছে নিজেদের খরচে। বাসমালিক তার কোনও খবর নেয়নি।

ঢাকা মহানগর পুলিশের দুজন কর্মকর্তা জানান, সম্প্রতি যেসব দুর্ঘটনা ঘটেছে এগুলো হত্যা বা হত্যাচেষ্টার মতো হলেও ওই সব ধারায় মামলা নেওয়া সম্ভব হয়নি। এর মূলে রয়েছে আইনের দুর্বলতা।
আইনের দুর্বলতা ছাড়াও পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের চাপ এবং অসুস্থ রাজনৈতিক প্রভাবে মানুষ সড়কে হত্যার বিচার পায় না বলে আইনজীবী মামুন চৌধুরী মনে করেন। তিনি বলেন, ‘পরিবহন শ্রমিকরা দেশ অচল করে দিতে পারে। তারা এমন হুমকি দেয়। তাদের বিরুদ্ধে কি করা যায়?’

গত ১৭ এপ্রিল ঢাকা ট্রিবিউন কর্মকর্তা নাজিম উদ্দিন হেলমেট পড়ে মোটরসাইকেল চালিয়ে যাচ্ছিলেন। পেছনে থাকা মঞ্জিল ও শ্রাবণ পরিবহনের বাসের চালক বেপরোয়াভাবে বাস চালাচ্ছিলেন। মঞ্জিল বাস এসে নাজিম উদ্দিনকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। পাশে থাকা শ্রাবণ বাসটি রাস্তায় পড়ে থাকা নাজিম উদ্দিনের বুকের ওপর দিয়ে চলে যায়। সঙ্গে সঙ্গে মারা যান নাজিম উদ্দিন। এটি হত্যার মতো ঘটনা। কিন্তু পুলিশ এ মামলাটি নিয়েছে ২৭৯ ও ৩০৪(খ) ধারায়। গাড়ি দুটির একজন চালক ও দুই সহকারী গ্রেফতার হয়েছে। তারা কারাগারে। তবে এখনও এক চালক পলাতক। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা যাত্রাবাড়ী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. ইকবাল হোসেন বলেন, ‘মামলার তদন্ত চলছে। এখনও একজন আসামি বাইরে। তাকে গ্রেফতার করা গেলেই মামলার চার্জশিট দেবো।’

নাজিম নিহতের ঘটনায় হত্যা মামলা করতে চাইলেও ব্যর্থ হয়েছেন বলে জানিয়েছেন তার বাবা আব্দুল হাই। গত ২ জুলাই রাজধানীর মিরপুরের বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজির (বিইউবিটি) শিক্ষার্থী সৈয়দ মো. মাসুদ রানা (২৩) বাসচাপায় নিহত হন। তার এ মৃত্যুকে পরিবারের পাশাপাশি বিইউবিটির ভাইস চ্যান্সেলর (ভিসি) প্রফেসর মো. আবু সালেহ হত্যাকাণ্ড বলে অভিযোগ করেন। হত্যার বিচার চান তারা। ঘটনার দুদিন পর দিশারী পরিবহনের ওই বাস চালক হামিদ ওরফে মুন্নাকে (৩৪) গ্রেফতার করে শাহ আলী থানার পুলিশ। এ ঘটনায়ও ২৭৯ ও ৩০৪ (খ) ধারায় মামলা হয়। মামলাটি তদন্ত করছেন শাহ আলী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) অনুজ কুমার।

তিনি বলেন, ‘মামলাটি এখনও তদন্ত চলছে। বিআরটিএ গাড়িটি পরীক্ষা করছে। তারা প্রতিবেদন দিলেই আমরা অভিযোগপত্র দেবো।’ এসআই অনুজ কুমার বলেন, ‘সড়কে মৃত্যুর ঘটনায় এই দুই ধারাই মামলা হয়। হত্যার অভিযোগ পরিবার করলেও মামলা এই ধারায় হয়।’ বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক  বলেন, ‘আইনের সীমাবদ্ধতার কারণেই হত্যার অভিযোগ আনা যাচ্ছে না। প্রস্তাবিত সড়ক পরিবহন আইনে আমরা এই বিষয়টি রাখার দাবি করেছি। সংসদের এই অধিবিশেনে আইনটি উন্থাপনের কথা ছিল, কিন্তু হয়নি।’ সড়কে মানুষের এমন মৃত্যুর সুবিচার চাওয়া নিয়ে তার সংগঠন কাজ করছে বলে বিভিন্ন জায়গা থেকে হুমকি পাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।