জাতীয় নির্বাচনের তফসিল নভেম্বরে?

স্টাফ রিপোর্টার : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল আগামী অক্টোবরে ঘোষণা করা হবে বলে নির্বাচন কমিশন (ইসি) একাধিক বার জানিয়েছে। তবে অক্টোবরের মধ্যে তফসিল ঘোষণার সম্ভাবনা কম। আর ওই মাসেই যদি তফসিল দিতে হয়, সেটা মাসের শেষ দিন ঘোষণা করতে হবে।

কারণ, ৩১ অক্টোবরই নির্বাচনের ঘোষণার সময় গণনা শুরু হবে। তফসিল নির্বাচনের অংশ হওয়ায় এর আগে তফসিল ঘোষণার সুযোগ নেই। সংবিধান অনুযায়ী বর্তমান সংসদের মেয়াদ শেষ হবে আগামী বছরের ২৮ জানুয়ারি। আর সংবিধান বহাল থাকা সাপেক্ষে এর পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে সংসদ নির্বাচন হবে। এ হিসাবে এ বছরের ৩১ অক্টোবর থেকে আগামী বছরের ২৮ জানুয়ারির মধ্যে ভোট হবে। আর তফসিল নির্বাচনের অংশ হওয়ায় ৩১ অক্টোবরের আগে তফসিল ঘোষণার কোনও সুযোগ নেই।

জানা গেছে, ডিসেম্বরের শেষভাগে সরকার সংসদ নির্বাচন করতে চায়। সুনির্দিষ্টভাবে সময় না জানালেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে একাদশ সংসদ নির্বাচন হবে বলে একাধিকবার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে জানিয়েছেন। সরকারি দলের একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ২৫ ডিসেম্বরের পরে যেকোনও দিন তারা ভোট চায়। ওই সময় ভোটের দিনক্ষণ হিসাব করে তফসিল ঘোষণা আর ভোট নেওয়ার মধ্যে ৪৫ দিনের ব্যবধান ধরলে তফসিল ঘোষণার সময় পড়ে নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহের দিকে। নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ৩১ অক্টোবর যেহেতু তফসিল ঘোষণার উপযোগী হবে, সেই বিবেচনায় কমিশন অক্টোবরে তফসিল ঘোষণার কথা জানিয়েছে।

তবে তফসিল ঘোষণা নভেম্বর মাসের প্রথম ভাগে হবে বলে কমিশনের কর্মকর্তারাও মনে করেন। এদিকে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা না থাকলেও নির্বাচনের সময়ের মধ্যে প্রবেশ করার সময় বর্তমান সরকারও তার আকার ছোট করে ‘নির্বাচনকালীন’ সরকারে রূপ নেবে। ওই সরকারটিও ৩১ অক্টোবর বা তার পরে দায়িত্ব পালন শুরু করবে। নির্বাচনকালীন ওই সরকারের দায়িত্ব পালন শুরুর আগে তফসিল ঘোষণার সম্ভাবনা কম বলে মনে করেন নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের কর্মকর্তারা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইসির যুগ্মসচিব পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, “কমিশন চাইলে ৩১ অক্টোবর তফসিল দিতে পারে। তবে যেকোনও ফরম্যাটে হোক সরকার তার আকার ছোট করে একটি ‘নির্বাচনকালীন’ সরকারে রূপ নেবে বলে তার আগে তফসিল হওয়ার সম্ভাবনা নেই।”

ইসি সচিবালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা থেকে ভোট নেওয়া পর্যন্ত সাধারণত ৪০-৫০ দিন সময় হাতে রেখে তারিখ নির্ধারণ করা হয়। এ ক্ষেত্রে মনোনয়ন দাখিল ১০-১২ দিন, যাচাই-বাছাই দুই দিন করে চার দিন, প্রত্যাহারের সময় সাত দিন এবং প্রচারণার জন্য ২০-২১ দিন সময় দেয় ইসি। আইন বা বিধিতে তফসিল থেকে ভোট নেওয়ার মধ্যে কতদিনের পার্থক্য থাকবেÍ সেটা স্পষ্ট করে কিছু বলা নেই।

তবে প্রার্থীদের প্রচারণার জন্য ন্যূনতম ১৫ দিন দেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া প্রার্থীরা যাতে সব প্রস্তুতি রেখে মনোনয়ন জমা দিতে পারেন এবং মনোনয়ন বাতিল হলে আপিল করতে পারেন সেটি বিবেচনা করে একটা যৌক্তিক সময় দেওয়া হয়।

গত দশম নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার বিষয়টি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, নবম সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার ৭৮ দিন আগে ২০১৩ সালের ১৮ নভেম্বর শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন নির্বাচনকালীন সরকার দায়িত্ব নেয়। মেয়াদ শেষের ৯০ দিন আগে ওই দায়িত্ব নেওয়ার কথা থাকলেও ওই সময়ের বিরোধীদলকে সরকারে অন্তর্ভুক্ত করতে দেনদরবারে কিছু সময় দেরি হয়। পরে অবশ্য বিএনপি না এলে সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী অন্য দলগুলোকে ওই সরকারে স্থান দেওয়া হয়। ওই সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সপ্তাহখানেক পর ২৫ নভেম্বর কমিশন দশম সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে।

এ ছাড়া বিগত কয়েকটি সংসদ নির্বাচন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, তফশিল ঘোষণা থেকে ভোট নেওয়া পর্যন্ত ৪০ দিনের বেশি ও ৫০ দিনের কম সময়ের ব্যবধান রাখা হয়েছে। দশম সংসদ নির্বাচনে ৫ জানুয়ারি ২০১৪ ভোট নেওয়ার দিন ঠিক করে তফসিল ঘোষণা হয় আগের বছরের ২৫ নভেম্বর।

এই হিসাবে তফসিল ঘোষণা থেকে ভোট নেওয়ায় ব্যবধান ছিল ৪২ দিন। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর ভোট নেওয়ার দিন ঠিক করে তারও আগে ২৩ নভেম্বর যে তফসিল দেওয়া হয় তাতে ব্যবধান ছিল ৪৭ দিন। এর আগে পঞ্চম থেকে অষ্টম সংসদেও ৪২ থেকে ৪৭ দিনের মধ্যে ব্যবধান দেখা গেছে।

অবশ্য প্রথম সংসদ নির্বাচনসহ শুরুর দিকে কয়েকটি ৬০ থেকে ৭০ দিনের মতো সময় দেওয়ার রেকর্ড রয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক নির্বাচন কমিশনার সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘সংসদের মেয়াদের শেষ ৯০ দিনের মধ্যে ভোট হতে হবে। আর এই কাউন্টডাউন ৩০ বা ৩১ অক্টোবর শুরু হবে বিধায় কমিশন অক্টোবরে তফসিল ঘোষণার কথা বলেছে। তবে আমার মনে হয় না অক্টোবরেই তফসিল হবে। এটা হয় তো নভেম্বরের শুরুতে হতে পারে।’ এক প্রশ্নের জবাবে সাবেক এই নির্বাচন কমিশনার বলেন, ‘তফসিল ঘোষণা থেকে ভোট নেওয়ার মধ্যে মোটামুটি ৪৫ দিনের ব্যবধান হলেই যথেষ্ট।

কাজেই ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে যদি ভোট হয় তাহলে নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যে তফসিল ঘোষণা করলেই চলে।’ সাবেক নির্বাচন কমিশনার শাহ নেওয়াজ বলেন, ‘সংবিধান অনুযায়ী সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে ভোট করতে হবে। এখন কমিশন কবে তফসিল দেবে আর ভোট নেবে, এটা তাদের ব্যাপার। তারা চাইলে ৯০ দিনের কাউন্টডাউন শুরু হলেই তফসিল ঘোষণা করতে পারে। এটা অক্টোবরে শুরু হলে তারা সেই সময়ই তফসিল দিতে পারে।’ নির্বাচন কমিশন সচিব হেলালুদ্দীন  বলেন, ‘কমিশন হিসাব করে দেখেছে অক্টোবরের ৩০/৩১ তারিখে ৯০ দিনের হিসাব গণনা শুরু হবে।

ওই হিসাব থেকেই অক্টোবরের শেষে তফসিল দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। হিসাব গণনার দিন যে তফসিল হবে বিষয়টি এমন নয়, এটা কিছুটা পরেও হতে পারে। তবে ঠিক কবে তফসিল হবে সেটা কমিশন সিদ্ধান্ত নেবে।’ প্রসঙ্গত, গত ৩০ এপ্রিল নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম সংসদীয় সীমানা পুনর্বিন্যাসের চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশের দিন অক্টোবরে সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার কথা জানান।

এরপর গত ২৩ জুন টাঙ্গাইলের বাসাইলে একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে কমিশনের মুখপাত্র ও কমিশন সচিব হেলালুদ্দীন আহমেদও একই কথা বলেন। গত ১০ জুলাই কমিশন সভা শেষে ইসি সচিব অক্টোবরে জাতীয় নির্বাচনের তফশিল ঘোষণার সম্ভাবনার কথা জানান। সর্বশেষ ১২ জুলাই তিন সিটির নির্বাচন নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বৈঠকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদা বলেন, তারা অক্টোবরে জাতীয় নির্বাচনে অনুপ্রবেশ করবে।