১৬ হাজার থেকে কমিয়ে ১২ হাজারের দাবি শ্রমিকদের, সেখানেও আপত্তি মালিকপক্ষের

বিশেষ প্রতিবেদন: বাংলাদেশে তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে নিজেদের আগের দাবী থেকে সরে এসেছেন শ্রমিকেরা। এখন তারা ন্যূনতম মজুরি হিসেবে ১২ হাজার ২০ টাকা দাবী করেছেন। এর আগে তাদের দাবি ছিল ১৬ থেকে ১৮ হাজার টাকা।

কিন্তু এতেও আপত্তি জানিয়েছে কিছু কিছু শ্রমিক সংগঠন। এছাড়া মজুরি বোর্ডের কাছে মালিকেরা ন্যূনতম মজুরি প্রস্তাব করছেন ৬,৩৬০ টাকা।

এ বছরের জানুয়ারিতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নতুন করে নির্ধারণের জন্য একটি মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়। সে বোর্ডের তৃতীয় বৈঠকে আজ মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিরা ন্যূনতম মজুরি হিসেবে নিজেদের প্রস্তাবনা তুলে ধরেন।

এতে দেখা যায় শ্রমিকদের প্রতিনিধি ১২ হাজার ২০ টাকা ন্যূনতম মজুরি হিসেবে প্রস্তাব করেছেন। মজুরি বোর্ডে নির্বাচিত শ্রমিক প্রতিনিধি বেগম শামসুন্নাহার ভুঁইয়া বলছেন, আগের মজুরি বোর্ডের অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে তিনি এ প্রস্তাব করেছেন।

তিনি বলেছেন, “শ্রমিক ফেডারেশনগুলোর ভিন্ন ভিন্ন মজুরির দাবি ছিল। কারো ছিল ১৬ হাজার টাকা, আবার কারো ১৮ হাজার টাকা। আমি সার্বিক বিষয় চিন্তা করে ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ২০ টাকা প্রস্তাব করেছি।”

তিনি আরো বলেন, “আমি হিসাব করেছি ২০১০ সালে শ্রমিকদের দাবী কত টাকা ছিল, আর কত টাকা পেয়েছে, আর ২০১৩ সালে দাবী কত টাকা ছিল আর কত টাকা পেয়েছে। এখন আমি ১৬ হাজার টাকা দাবি করলাম, কিন্তু পাওয়ার সময় যদি সেটা এক তৃতীয়াংশ হয়ে যায়, তাহলে সমস্যা হবে। সেজন্য আমি ১২ হাজার টাকা প্রস্তাব করেছি।”

মিসেস ভুঁইয়া জাতীয় শ্রমিক লীগের নারীবিষয়ক সম্পাদক। এই মূহুর্তে তৈরি পোশাক শিল্পে একজন নতুন শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি ৫,৩০০ টাকা, যা ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে কার্যকর হয়। এর মধ্যে মূল মজুরি ৩ হাজার টাকা, বাড়ি ভাড়া ১২০০ টাকা এবং চিকিৎসা, যাতায়াত ও খাদ্য ভাতা ১১০০ টাকা।

এদিকে, মিসেস ভুঁইয়ার ১২ হাজার ২০টাকা ন্যূনতম মজুরির প্রস্তাবের সাথে দ্বিমত করছে কিছু শ্রমিক সংগঠন।

এর আগে মজুরি বোর্ড গঠনের আগে থেকেই শ্রমিকদের একটি বড় অংশ ১৬ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরি দাবি করে আসছিলেন।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক জলি তালুকদার বলছেন, আজ শ্রমিক প্রতিনিধি যে প্রস্তাবনা তুলে ধরেছেন, তার সাথে পোশাক শ্রমিকদের বড় অংশ একমত হবে না। ফলে ১৬ হাজার টাকা মজুরির দাবিতে তারা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।

তিনি বলেন, “আমরা মনে করি শ্রমিকদের মজুরি এখন ১৬ হাজার টাকাও যথেষ্ঠ না, কারণ বাজারে সব জিনিসের দাম যেভাবে বেড়েছে, আর আইএলও কনভেনশন অনুযায়ী একজন শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি যা হওয়া উচিত কোনটাই শ্রমিকেরা পাচ্ছেন না। ফলে আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাব।”

এদিকে, পোশাক মালিকেরা আরো কম ন্যূনতম মজুরি দিতে চান।

মজুরি বোর্ডে মালিকদের প্রতিনিধি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ এর সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলছেন, তারা ন্যূনতম মজুরি ৬,৩৬০টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছেন।

তিনি দাবি করেছেন, শ্রমিকদের বর্তমান ন্যূনতম মজুরি এবং পোশাক শিল্পের বর্তমান অবস্থা বিবেচনায় নিয়েই তারা এমন প্রস্তাবনা দিয়েছেন, যা বাস্তবায়নযোগ্য।

তিনি বলেন, “আমরা ৬,৩৬০ টাকা প্রস্তাব করেছি। আমরা বিবেচনা করেছি গত পাঁচ বছরে মূল্যস্ফীতি কতটুকু হয়েছে। এখন তারা বেশি দাবি করেছে, দাবি করলেই তো হবে না, তাকে যুক্তি দিয়ে বোঝাতে হবে কেন তারা এমনটা চাচ্ছে।”

তিনি আরো বলেন, “তবে, তাদের প্রস্তাব তারা দিয়েছে, আমাদেরটা আমরা দিয়েছি। এখন মজুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান আছেন, নিরপেক্ষ সদস্য, স্থায়ী সদস্য আছেন, সবাই মিলে যেটা পারি, সেটাই নির্ধারণ করবো।”

এ বছরের জানুয়ারিতে আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থা অক্সফাম এক প্রতিবেদনে বলেছে, বিশ্বের সাতটি প্রধান তৈরি পোশাক উৎপাদনকারী দেশের মধ্যে বাংলাদেশের শ্রমিকদের মজুরিই সবচেয়ে কম।

অক্সফ্যামের রিপোর্টটিতে বলা হয়, বাংলাদেশে একজন সাধারণ মানুষের খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার জন্য নিম্নতম মজুরি প্রয়োজন ২৫২ মার্কিন ডলারের সমান অর্থ। কিন্তু এই মুহূর্তে বাংলাদেশের একজন শ্রমিক মজুরি পান প্রায় ৬৭ মার্কিন ডলারের সমান অর্থ।