সেন্ট্রাল হাসপাতালে আবারও ভুল চিকিৎসায় শিশুর মৃত্যুর অভিযোগ

রাজধানীর গ্রিনরোডের সেন্ট্রাল হাসপাতালের বিরুদ্ধে আবারও ভুল চিকিৎসা ও অবহেলায় রোগীর মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। এবার মাত্র ১৯ মাসের শিশু। পরিবারের অভিযোগ, চিকিৎসায় অবহেলা ও অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ প্রয়োগে শিশু আরিয়ানের মৃত্যু হয়েছে। ঘটনার পর হাসপাতালে কর্মকর্তাদের উপর চড়াও ও ভাঙচুর করেন বিক্ষুব্ধ স্বজনরা।

জানা গেছে, আরিয়ানের (১৯ মাস) বাবার নাম সাহাদাত হোসেন। বাড়ি নোয়াখালী। ঢাকার ধানমন্ডি থানাধীন ২৯/৩২ হাতিরপুলে স্বপরিবারে বসবাস করেন। পেশায় ব্যবসায়ী সাহাদাতের একমাত্র সন্তান ছিল আরিয়ান।

আরিয়ানের বাবা সাহাদাতের ছোটভাই শহীদ এলাহী জানান, গত বুধবার থেকে জ্বর ছিল আরিয়ানের। জ্বর না কমায় পরদিন বৃহস্পতিবার রাতে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শিশু বিশেষজ্ঞ সুজিত কুমার রায়ের অধীনে পেডিয়াট্রিক ইউনিটের শিশু ওয়ার্ডে তাকে চিকিৎসা দেয়া হয়।

আরিয়ানের রক্ত পরীক্ষা করে দেখা যায়, প্লাটিলেটের উপস্থিতি ৭৬ হাজার। চিকিৎসা চলাকালীন সেটি দাঁড়ায় ১ লাখ ২২ হাজার। শনিবার সকাল থেকে শিশু আরিয়ানের অবস্থার অবনতি হতে থাকে। দুপুরে অবস্থা আরও খারাপ হয়। ওই সময় চিকিৎসকদের ডাকাডাকি করলে কেউ সাড়া দেননি বলে জানান শহীদ এলাহি। বিকেলের দিকে মারা যায় আরিয়ান।

নিহতের চাচা বলেন, রাতে আরিয়ানকে ২৫০ মিলিগ্রামের সাপোজিটার দেয়া হয়। এরপর থেকে অস্বস্তি শুরু হয় আরিয়ানের। চোখমুখ কালো বর্ণ ধারণ করে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলে তার ডেঙ্গু হয়েছে। কিন্তু ডেঙ্গুর জন্য যে ধরনের চিকিৎসা দরকার ছিল তা তাকে দেয়া হয়নি। অবস্থার অবনতির বিষয়টি বারবার জানানোর পরও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ গুরুত্ব দেয়নি। বরং মারা যাওয়ার পর আরিয়ানকে এনআইসিইউ বিভাগে নেয়া হয়।

আরিয়ানের বাবা সাহাদাত হোসেন  বলেন, ‘এখন ভাই কথা বলার মতো অবস্থায় আমি নেই। আমার আরিয়ানকে জীবিত এনে মৃত অবস্থায় বাসায় নিয়ে যাচ্ছি। শুধু বলে রাখছি, ওরা আমার আরিয়ানকে মেরে ফেলেছে।’

আরিয়ানের আকস্মিক মৃত্যুর সংবাদে পরিবারের মাঝে শোকের ছায়া নেমে আসে। হাসপাতাল ও ধানমন্ডি থানার সামনে আহাজারি করেন আরিয়ানের স্বজনরা। ঘটনার পর হাসপাতালের পঞ্চম তলার ৬০৯ নং ডাক্তারদের বসার কক্ষের গ্লাস ভাঙচুর করেন বিক্ষুব্ধ স্বজনরা। পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দুটি গেট আটকে দেয়। খবর পেয়ে ধানমন্ডি থানা পুলিশ সদস্যরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন।

ধানমন্ডির থানার ওসি আব্দুল লতিফ বলেন, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। পরে আরিয়ানের পরিবার মরদেহ নিয়ে চলে যায়। তারা অভিযোগ দিলে মামলা হবে।

এদিকে কর্তব্যে অবহেলা বা ভুল চিকিৎসার অভিযোগ অস্বীকার করেছে সেন্ট্রাল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। সেন্ট্রাল হাসপাতালের উপ-পরিচালক (এডমিন) ডাক্তার মোজাহের হোসেন  বলেন, ‌আরিয়ানের মৃত্যু কর্তব্য অবহেলা কিংবা ভুল চিকিৎসায় হয়নি। ডাক্তাররা দেখেছে, অবস্থার অবনতি হওয়ায় এনআইসিইউতে নেয়া হয়েছে। সেখানেই রোববার বিকেল সাড়ে ৫টায় মারা যায় আরিয়ান।

তিনি আরও বলেন, আরিয়ানের ডেঙ্গু জ্বর হয়েছিল। ক্লাসিকেল ডেঙ্গুর চিকিৎসায় যে ব্যবস্থা নেয়া দরকার, চিকিৎসকরা তা নিয়েছিলেন।

গত বছরের ২৪ জুন ভুল চিকিৎসায় শিশুর মৃত্যুর অভিযোগ ওঠে সেন্ট্রাল হাসপাতালের বিরুদ্ধে। বিষয়টি নিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে রোগীর স্বজনদের হাতাহাতিও হয়। জন্ডিস রোগে শিশুটির চিকিৎসা চললেও ডেথ সার্টিফিকেটে বলা হয়, সে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত ছিল। পাশাপাশি তার হার্টের একটি এক্সরে রিপোর্টও সংযুক্ত করা হয়।

এছাড়া গত বছরের ১৮ মে সেন্ট্রাল হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় মারা যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্রী আফিয়া জাইন চৈতি। ওই ঘটনায় হাসপাতালে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ভাঙচুর চালায়। পরে অভিযুক্ত তিন চিকিৎসককে আটক করে ধানমন্ডি থানা পুলিশ।

ডেঙ্গু জ্বর নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলেও চৈতিকে দেয়া হয় ক্যান্সারের চিকিৎসা। ডাক্তাররা বলেছিলেন, আফিয়ার লিউকেমিয়া (ব্লাড ক্যান্সার) হয়েছে। সেই অনুযায়ীই তাকে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। তবে মৃত্যুর আগে জানানো হয় ক্যান্সার নয়, ডেঙ্গু হয়েছিল।

পরে সেন্ট্রাল হাসপাতালের বিরুদ্ধে অবহেলা ও ভুল চিকিৎসার অভিযোগ তুলে চিকিৎসকসহ সেন্ট্রাল হাসপাতালের ৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।