ভালোবাসা কি আসলেই কঠিন পাপ?

ফুলকি.কম: ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের মর্গ।

নাম-পরিচয়হীন একটা লাশের সঙ্গে সেল ফোনের ছবিটা মিলিয়ে দেখছি। ছবির মানুষটা ক্লিন শেভড। মাথায় কোকড়ানো চুল, স্যান্ডো গেঞ্জির ভেতর দিয়ে পেশীবহুল শরীর দেখা যায়।

কিন্তু হিমঘরে নি:স্প্রাণ শুয়ে থাকা মানুষটা একেবারেই হ্যাংলা-পাতলা, চুল ছোট করে ছাঁটা, মুখমন্ডল কাঁচা-পাকা দাঁড়িতে সয়লাব। মনে হলো, যাকে খুঁজছি, এ সে নয়।

অবশ্য ১৫ বছর অনেক সময়।

এতোগুলো বছরে নিশ্চয়ই মানুষটার শারীরিক আকৃতি বদলে গেছে। এই পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্তে পৌঁছুতে হলে আমাকে দু’জন মানুষের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। এদের একজন নিখোঁজ মানুষটার আত্মীয়। অন্যজন ঢাকা মেডিকেলের ইন্টার্ন ডাক্তার, যিনি মানুষটার খোঁজ দিয়েছেন।

খানিক বাদে দুজনই এলেন। আত্মীয় লোকটা লাশের চোখ আর মুখের আকৃতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে বললেন, এ লাশ বাবুর। তাকে সমর্থণ দিয়ে ইন্টার্ণ ডাক্তার বললেন, পনের দিন ধরে লোকটা হাসপাতালে ভর্তি। কথা বলতেন না। বহু চেষ্টা করেও আমরা নাম-ঠিকানা উদ্ধার করতে পারিনি। নিজের শরীরের সমস্যার কথাও বলতেন না। মৃত্যুর ঠিক দু’দিন আগে বহু অনুরোধ করে জানতে পারি, ১৫ বছর আগে তিনি ঘর ছেড়েছেন। পরিচয় বলতে নিজের নাম ‘বাবু’ আর খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত এক বোনের কথাই শুধু বললেন। ওইটুকু তথ্যের ভিত্তিতে আমি ফেসবুকে পোষ্ট দেই। এতে কাজও হয়। আত্মীয়দের খোঁজ পাওয়া যায়। কিন্তু এর মধ্যেই তিনি মারা গেলেন।

মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে ডাক্তার বললেন, রোগীর বুকে একটা ক্ষতের মতো ছিল, কিন্তু সেটাকে ঠিক মৃত্যুর কারণ বলা যায় না। উনি বোধহয় মানসিকভাবে খুব আঘাতপ্রাপ্ত ছিলেন।

আমি তরুণী এই ডাক্তারের মাহানুভবতায় বিস্মিত!

হয়তো সৃষ্টিকর্তাই পরিবারটিকে অনন্ত অপেক্ষায় রাখতে চাননি। না হলে সারা জীবন যেটা বলেননি, মৃত্যুর মাত্র দুদিন আগে সেই পরিবারের ঠিকানা বাবু কেন বলে দেবেন ডাক্তারকে?

আমার বন্ধুরা অপেক্ষায় রয়েছে, সত্যিই যদি মানুষটা বাবু হন, তবে ওরা খুলনা থেকে রওনা দেবে। আমি ফোন করে রওনা দিতে বললাম। ফোনের অপরপ্রান্ত থেকে হাউমাউ করে কান্নার আওয়াজ ভেসে এলো!

পনের বছর আগে ঠিক কী অভিমানে মানুষটা ঘর ছেড়েছিলেন তা জানার অদম্য এক কৌতুহলে আমি ঘন্টা খানেক পর ফোন দিলাম বন্ধুকে। ওরা তখোন ‌অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকার পথে।

থমথমে গলায় বন্ধুটি জানাল, নিখোঁজ মানুষটি তার মামা। ওর নানা ছিলেন ভীষণ কড়া মানুষ। প্রেমের সম্পর্কে জড়ানোয় মামাকে মারধর করেছিলেন। মনের কষ্টে সেই যে তিনি বাড়ি ছাড়লেন, আর ফিরলেন না। কতো ভাবে, কতো যায়গায় খোঁজ করা হয়েছে- কিছুতেই কিছু হলো না!

জানলাম, আমার বন্ধুর সেই নানাও মারা গেছেন বছর ছয়েক আগে। পরিবারের সবাই যখন হন্য হয়ে বাবুকে খুঁজতেন, নানা তখোন বলতেন, রাস্তা-ঘাটে মরে পড়ে থাক!

ভালোবাসার অপরাধে অপরাধী সন্তানকে তিনি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ক্ষমা করতে পারেননি!

ফোন রাখতেই মনটা বিষাদে ছেয়ে গেল।

ভালোবাসার অপরাধে ঘর ছাড়লেন মানুষটা, ঘুরলেন পথে পথে। পনের বছর ধরে ভিজলেন ঝড়-বৃষ্টিতে, খেয়ে-না খেয়ে অসহ্য এক জীবন কাটালেন, ভালোবাসা হারিয়ে যে অভিমানে ঘর ছেড়েছিলেন, সে অভিমান বুকে নিয়েই পৃথিবীও ছাড়লেন। তবু পিতার মন গলাতে পারলেন না। পিতার চোখে তিনি আজন্ম অপরাধীই থেকে গেলেন। ক্ষমাহীন ভয়ংকর এক অপরাধী!

খুন, ধর্ষণ, ডাকাতির মতো কতো বড় অপরাধে জড়িত ব্যক্তিকেও ক্ষমা পেতে দেখি, দেখি স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে। কিন্তু ভালোবেসে অপরাধী হওয়া মানুষগুলোকে আমরা ক্ষমা করতে পারি না। মমতাহীন, ভালোবাসাহীন তুমুল একাকিত্ত্বের এক জীবন হয় তাদের। তারা ধুকতে ধুকতে সমাজ থেকে বিচ্যুত হন, তলিয়ে যান, মরেও যান এক সময়। এই সমাজ তাদের খোঁজ রাখে না।

আহা, ভালোবাসার মতো কঠিন পাপ বুঝি আর একটাও নেই!

‍-আবদুল্লাহ আল ইমরান এর ফেসবুক থেকে