এখনও অনিবন্ধিত হাজারো রোহিঙ্গা

ফুলকি ডেস্ক : মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে থেকে পালিয়ে কক্সবাজারের টেকনাফে আশ্রয় নেওয়া হাজারো রোহিঙ্গা এখনও অনিবন্ধিত রয়েছেন। সরেজমিনে টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে ঘুরে, দায়িত্বরত কর্মকর্তা ও রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে। জানা গেছে, টেকনাফের তিনটি রোহিঙ্গা শিবিরে হাজারো নতুন-পুরোনো রোহিঙ্গা এখনও নিবন্ধিত হননি। এর মধ্যে লেদা রোহিঙ্গা শিবিরে তিন শতাধিক ও নয়াপাড়া রোহিঙ্গা শিবিরের এক হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা অনিবন্ধিত রয়েছেন। তবে ঠিক কত রোহিঙ্গা এখনও নিবন্ধিত হয়নি সেবিষয়ে কোনও সংস্থা সুনির্দিষ্ট করে কিছু বলতে পারেনি।

বুধবার (১১ জুলাই) জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের উত্তরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, ‘বর্তমানে বাংলাদেশে কোনও অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা নেই। সবাইকে নিবন্ধিত করা হয়েছে।’ তবে বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন দেখা গেছে। টেকনাফের নয়াপাড়া রোহিঙ্গা শিবিরের চেয়ারম্যান আলী জোহার বলেন, ‘আমার দায়িত্বে ১৯ হাজার পরিবারের ৮৫ হাজার রোহিঙ্গা আছেন। এরা সবাই গত বছর আগস্টের পরে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে এসেছেন। এর মধ্যে এক হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা এখনও নিবন্ধিত হননি। বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।’

সাত মাস আগে রাখাইন রাজ্যের বুশিডং (বুথেডং) টাউনশিপ গ্রাম থেকে পালিয়ে এসে টেকনাফের লেদা শিবিরে এক আত্মীয়ের ঝুপড়ি ছাউনিতে আশ্রয় নেন আরফাত মাউছন (২৫) নামে এক রোহিঙ্গা যুবক। যার ছদ্দ নাম ম ম চৌ। অনেকের মতো এখনও নিবন্ধিত হতে পারেননি এই রোহিঙ্গা। বৃহস্পতিবার দুপুর ৩টার দিকে লেদা শিবিরে কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে প্রাণে বাঁচতে পালিয়ে এসেছি সাত মাস পেরিয়ে গেছে। তবে এখনও কোনও কার্ড (নিবন্ধিত) পাইনি। আমার সঙ্গে আসা অনেকই কার্ড পেয়েছেন, আবার অনেকে পাননি। নিবন্ধনের কার্ড না পাওয়ায় আমি কোনও ত্রাণের কার্ডও পাইনি। এপারে আসার পর থেকে কষ্টে দিন কাটাতে হচ্ছে।’

আরফাত মাউছন আরও বলেন, ‘আমার বাবা আমির হোসেন এক সময় রাখাইন সরকারের সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন। মিয়ানমার সেনারা তাকেও রেহাই দেয়নি। মিয়ানমারে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর লেখা-পড়া করার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা ছিল। আমার লেখাপড়ায় যাতে অসুবিধা না হয় সেজন্য পরিবার আমার নাম রেখেছিলেন ম ম চৌ (ছদ্দ নাম)। সেখানে আমাকে এই নামেই চিনে সবাই। সেনাদের অভিযানের মুখে এপারে পালিয়ে এসেছি। পরিবারের কে কোথায় তা জানি না। নিজ দেশে ফিরে যেতে চাই। তবে কবে ফিরে যেতে পারবো জানি না, সেই প্রতিক্ষায় দিন গুনছি।’

গত আট মাস ধরে রোহিঙ্গা শিবিরে বসবাস করছেন মো. ইয়াছিন (৩৫)। এই রোহিঙ্গা বলেন, ‘স্বজনদের হারিয়ে এপারে পালিয়ে এসেছি আট মাস হয়ে গেল। স্বজনদের কথা মনে করে এখনও কাঁদি। মিয়ানমার সেনারা সেখানে গণহত্যা করেছে। আমাদের সহায়-সম্বল লুট করে নিয়েছে। নিঃস্ব হয়ে এপারে এসেছি। রোহিঙ্গা হিসেবে বাংলাদেশ সরকারের তালিকায় এখন নিবন্ধিত হতে পারেনি। এজন্য কোনও ত্রাণের কার্ড পাইনি। ফলে কষ্টে দিন পার করছি।’

প্রায় দেড় যুগ ধরে বাংলাদেশে অবস্থান নেওয়া রোহিঙ্গা দুদু মিয়া (৪৭) ও মো. আইয়ুব (৪৮) বলেন, ‘গত ১৬ বছর আগে রাখাইনে সেনা সদস্য ও মগদের নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রাণে বাঁচতে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছি। তখন থেকে টেকনাফ রোহিঙ্গা শিবিরে রয়েছি। আমাদের নাম কেউ লিখে নেননি, ছবিও তোলেননি। সরকারি-বেসরকারি কোনও তালিকায় আমরা স্থান পাইনি। নতুন-পুরনো লাখ লাখ রোহিঙ্গা নিবন্ধিত হয়েছেন। আমরা হতে পারিনি। এখন আমাদের কী হবে?’

 এ বিষয়ে জানতে চাইলে টেকনাফের লেদা রোহিঙ্গা শিবিরের চেয়ারম্যান আবদুল মতলব বলেন, ‘এই শিবিরের তিন শতাধিক রোহিঙ্গা অনিবন্ধিত রয়েছেন। এর মধ্যে নতুন ও পুরনো অনেকেই আছেন। তাদের একটি তালিকা ক্যাম্প ইনচার্জকে দেওয়া হয়েছে।’

টেকনাফ লেদা রোহিঙ্গা শিবিরের সহকারি ইনচার্জ শাহাজান মিয়া বলেন, ‘এই রোহিঙ্গা শিবিরের নিবন্ধিত হয়নি এমন একটি তালিকা পেয়েছি। তবে এই তালিকা আমার কাছে সন্দেহপ্রবণ মনে হয়েছে। বিয়টি যাচাই-বাচাই করা হচ্ছে। যদি কোনও রোহিঙ্গা অনবন্ধিত হয়ে থাকেন তাদের নিবন্ধনের আওতায় আনা হবে।’

বাংলাদেশের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ আবুল কালাম বলেন, ‘কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া কিছু রোহিঙ্গা অনিবন্ধিত রয়েছেন, ‘এমন খবর আমরা পেয়েছি। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সব রোহিঙ্গাকে নিবন্ধের আওতায় আনা হবে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশকারী বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিকদের (রোহিঙ্গা) মধ্যে ১১ লাখ ১৮ হাজার ৫৭৬ জনকে বায়োমেট্রিক নিবন্ধন করা হয়েছে।’

প্রসঙ্গত, মিয়ানমারের রাখাইনে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের ওপর দেশটির সেনা নির্যাতনের ফলে গত বছরের ২৫ আগস্টের পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছেন। পুরোনোসহ উখিয়া ও টেকনাফের ৩০টি শিবিরে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছেন।