ফেসবুককে ৫ লাখ পাউন্ড জরিমানা

ফুলকি ডেস্ক: তথ্য পাচারের দায়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুককে ৫ লাখ পাউন্ড জরিমানার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যুক্তরাজ্য। বাংলাদেশি অর্থমূল্যে যা ৫ কোটি ৫৬ লাখ টাকার সমান। দেশটির তথ্য সুরক্ষাব্যবস্থা পর্যবেক্ষণকারী কর্তৃপক্ষ দ্য ইনফরমেশন কমিশনার’স অফিস (আইসিও)ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকার গ্রাহকদের তথ্য চুরির ইস্যুতে এই জরিমানার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকার প্যারেন্ট কোম্পানি এসসিএল ইলেকশনস-এর বিরুদ্ধেও ফৌজদারি মামলা করার কথা ভাবছে আইসিও। ‘তথ্য পাচারকারী’দের কাছ থেকে রাজনৈতিক দলগুলো ব্যক্তিগত তথ্য কিনছে উল্লেখ করেও উদ্বেগ জানানো হয়েছে। মামলার ব্যাপারে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়ে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ বলেছে, এ ব্যাপারে অচিরেই নিজেদের অবস্থান জানাবে তারা।

আইসিও জনগণের তথ্য অধিকার ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার সুরক্ষায় নিয়োজিত স্বাধীন একটি প্রতিষ্ঠান। ডিজিটাল-কালচার-মিডিয়া অ্যান্ড স্পোর্টস বিভাগের পৃষ্ঠপোষকতায় কাজ করে। তাদের অভিযোগ, গ্রাহকদের চুরি হয়ে যাওয়া তথ্য ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকা পুরোপুরি মুছে দিয়েছে কিনা; তা নিশ্চিত করতে পারেনি ফেসবুক। রাজনৈতিক প্রচার-প্রচারণায় ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করা হচ্ছে অভিযোগ ওঠার পরই তদন্ত শুরু করেছিল আইসিও। লন্ডনভিত্তিক কনসাল্টিং ফার্ম ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকার সাবেক কর্মী ক্রিস্টোফার উইলি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য অবজারভার ও মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নিজের প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তথ্য চুরির অভিযোগ এনেছিলেন। উইলি অভিযোগ করেন, তার প্রতিষ্ঠান লাখ লাখ ফেসবুক ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য চুরি করছে। খবরটি ফাঁস হওয়ার পর তদন্ত শুরু করে আইসিও।

১৬ মাস আগে শুরু হওয়া ওই তদন্তে দেখা গেছে, ফেসবুক নিজেই নিজের নীতি লঙ্ঘন করেছে। ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকাসব ব্যক্তিগত তথ্য মুছে ফেলেছে কিনা তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমটি। তবে ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকার দাবি, ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে ফেসবুকের অনুরোধে তারা তথ্যগুলো ডিলিট করেছে। ১৬ মাসের তদন্ত শেষে ফেসবুকের বিরুদ্ধে জরিমানা করতে যাচ্ছে আইসিও। ইনফরমেশন কমিশনার এলিজাবেথ ডেনহাম বলেন, এটা কেবল জরিমানারই প্রশ্ন নয়, কোম্পানিগুলো তাদের ভাবমূর্তি নিয়েও উদ্বিগ্ন।

‘তথ্য দালাল’দের কাছ থেকে রাজনৈতিক দলগুলো মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য কিনছে উল্লেখ করেও উদ্বেগ জানিয়েছে আইসিও। প্রতিষ্ঠানটির আশঙ্কা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ‘তথ্য দালাল’দের কাছ থেকে জনগণের লাইফস্টাইলের তথ্য সংগ্রহ করে থাকে। এক্ষেত্রে নির্দিষ্ট করে লেবার পার্টি ব্যবহৃত একটি কোম্পানির নাম বলা হয়েছে। কোম্পানিটি হলো এমা’স ডায়েরি। এ কোম্পানি গর্ভবতী নারীদের চিকিৎসাসংক্রান্ত পরামর্শ দেয় এবং বাচ্চা হওয়ার পর উপহার পাঠিয়ে থাকে। লেবার পার্টিও এ কোম্পানিটি ব্যবহার করার কথা জানিয়েছে। তবে বিস্তারিত কিছু বলেনি। শুধু জানানো হয়েছে, কিছু নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে তারা। আইসিও বলছে, এগ্রিগেট আইকিউ নামের আরেকটি কোম্পানি ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে আলাদা হওয়ার প্রশ্নে আয়োজিত গণভোট পর্যন্ত ভোট লিভ ক্যাম্পেইনের (ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে আলাদা হওয়ার পক্ষের দল) সঙ্গে কাজ করেছে।

আইসিও’র প্রতিবেদনের ব্যাপারে ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকার সাবেক কর্মী ক্রিস্টোফার উইলি বলেন, ‘বেশ কয়েক মাস আগে আমি ফেসবুক ও ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকার ব্যাপারে যুক্তরাজ্য কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করেছিলাম। সেই প্রমাণের ওপর ভিত্তি ফেসবুক এখন ব্রিটিশ আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ জরিমানার মুখোমুখি। পরিচালকরাসহ ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকাকে বিচারের মুখোমুখি করা হবে।’ সংকট নিরসনে একটি নীতিমালা প্রণয়নের আহ্বান জানিয়েছেন ইনফরমেশন কমিশনার এলিজাবেথ ডেনহাম। তিনি বলেন, এ আচরণবিধির মধ্য দিয়ে এটা নিশ্চিত করতে হবে যে, ‘নির্বাচন সুষ্ঠু হচ্ছে এবং জনগণ বুঝতে পারবে তাদেরকে কিভাবে লক্ষবস্তু করা হচ্ছে।’

উল্লেখ্য, সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ফাঁস হয়, ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রচারণা দলের সঙ্গে যুক্ত যুক্তরাজ্যভিত্তিক রাজনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকা ফেসবুকের ৫ কোটি গ্রাহকের তথ্য সংগ্রহ করে ব্যবহার করেছে। খবরটি আটলান্টিক মহাসাগরের দুইপাড়েই আলোড়ন তোলে। ফেসবুক তথ্য বেহাত নিয়ে যে আলোচনার মূলে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. কোগানের একটি অ্যাপ, যার নাম ছিল ‘দিস ইজ ইওর ডিজিটাল লাইফ’। সরাসরি ২ লাখ ৭০ হাজার ফেসবুক ব্যবহারকারী ওই অ্যাপের ব্যবহারকারী হলেও অ্যাপটি ব্যবহারকারীদের বন্ধু তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের তথ্য সংগ্রহ করেছিল। অ্যাপ ব্যবহারকারীদের প্রায় ৯৭% যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী। মোট ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মধ্যে ১ কোটি ৬০ লাখ যুক্তরাষ্ট্রের বাইরের। এই কেলেঙ্কারি প্রকাশিত হওয়ার পর ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে ফেসবুক। কর্তৃপক্ষ জানতেন,যে ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকা লাখ লাখ ফেসবুক ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য নিয়ে কাজ করছে। কিন্তু লন্ডন ভিত্তিক সংস্থাটি সেসময় দাবি করে যে তারা সেসব তথ্য মুছে দিয়েছে।