সংস্থার অভ্যন্তরেই আবারও প্রশ্নবিদ্ধ রোহিঙ্গা সংকটে জাতিসংঘের ভূমিকা

মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পাদিত জাতিসংঘের প্রত্যাবাসন চুক্তির স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে খোদ সংস্থাটির অভ্যন্তরেই। রবিবার এক সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির মানবাধিকার বিষয়ক বিশেষ দূত ইয়াংহি লি জানিয়েছেন,  দুই পক্ষের কেউই স্বাক্ষরিত সমঝোতার কোনও অনুলিপি তাকে দেয়নি। জাতিসংঘের ইনফরমেশন সেন্টারে প্রকাশিত তার বিবৃতিতে একে অস্বচ্ছতা আখ্যা দিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন লি। এর আগে গত বছরের অক্টোবরে মিয়ানমারে জাতিসংঘের প্রধান কর্মকর্তার রোহিঙ্গাবিরোধী বিতর্কিত ভূমিকা আলোচনায় এলে তাকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। সংস্থাটির মানবাধিকার কমিশনের প্রধান রা’দ আল হোসেনও একাধিকবার জাতিসংঘের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

গত বছরের ২৫ আগস্ট রাখাইনের কয়েকটি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার পর পূর্ব-পরিকল্পিত ও কাঠামোবদ্ধ সহিংসতা জোরালো করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী।  হত্যা-ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধারার সহিংসতা ও নিপীড়ন থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রায় ৭ লাখ মানুষ। বিপুল পরিমাণ শরণার্থীকে মিয়ানমারে ফেরাতে বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের প্রত্যাবাসন চুক্তির ধারাবাহিকতায় জাতিসংঘের সঙ্গেও দেশটির সমঝোতা হয়। মিয়ানমার ও জাতিসংঘের দুইটি সংস্থা ‘ইউনাইটেড নেশনস ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম’ (ইউএনডিপি) ও ‘ইউনাইটেড নেশনস হাই কমিশনার ফর রিফিউজিসের’ (ইউএনএইচসিআর) মধ্যে সমঝোতা স্মারকটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল।

রোহিঙ্গা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে সপ্তাহব্যাপী বাংলাদেশ সফর শেষে রবিবার (৮ জুলাই) রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে হাজির হন লি। তিনি জানান, সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা জানার কয়েক সপ্তাহ পর থেকেই তিনি মিয়ানমার সরকারের কাছে ওই সমঝোতা স্মারকের অনুলিপি চাওয়া শুরু করেছিলেন। সেখান থেকে তাকে জাতিসংঘেরই একটি সংস্থার তৈরি সারসংক্ষেপ পাঠানো হয়েছে। লি বলেছেন, ‘গত তিন সপ্তাহ ধরে আমি জাতিসংঘের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে যাচ্ছি। তারা ওয়াদা করলেও শেষ পর্যন্ত সমঝোতা স্মারকটির কোনও অনুলিপি আমাকে দেয়নি।’ লি সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘সমঝোতা স্মারকের অস্বচ্ছতার বিষয়ে আমি ২৭ জুন হিউম্যান রাইটস কাউন্সিলে আমার হতাশার কথা জানিয়েছি। যদিও আমি ওই সমঝোতা স্মারকে ঠিক কি রয়েছে তা পড়ার সুযোগ পাইনি, কিন্তু যেহেতু এটি গোপন রাখা হয়েছে, সেহেতু আমি এটি নিয়ে চিন্তিত। খোদ জাতিসংঘের সংস্থাগুলোও সমঝোতা স্মারকের বিষয়ে জানতে দিতে চাইছে না।’

এর আগে গত বছর অক্টোবরে বিবিসির এক অনুসন্ধানে উঠে আসে সে সময় মিয়ানমারে জাতিসংঘের প্রধান কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত রেনেতা লোক ডেসালিয়েনের বিতর্কিত ভূমিকার কথা। মিয়ানমারে জাতিসংঘ এবং বিভিন্ন ত্রাণ সংস্থার সূত্রকে উদ্ধৃত করে এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বিবিসি সে সময় জানায়, রোহিঙ্গা অধ্যূষিত এলাকায় যেখানে নির্যাতন-নিপীড়ন হয়েছে, মানবাধিকার কর্মীদের সেখানে যেতে দিতেন না তিনি। এমনকি জাতিসংঘের মিয়ানমার কার্যালয়ে রোহিঙ্গা ইস্যুতে কোনও কথা বলতেও বারণ করেছিলেন রেনেতা। শরণার্থীদের অধিকারের বিষয় মিয়ানমার সরকারের কাছে উত্থাপনেও তিনি বাধা দিয়েছেন। বিতর্কিত ওই কর্মকর্তাকে এক পর্যায়ে সরিয়ে নিয়েছিল জাতিসংঘ। কাছাকাছি সময়ে সংস্থাটির মানবাধিকার কমিশনের প্রধান রা’দ আল হোসেন জাতিসংঘের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেছিলেন, তার কমিশন জাতিসংঘের কাজের ব্যাপারে অবগত নয়, এবং এ সংক্রান্ত কোনও দায়দায়িত্ব নিতে অপারগ।

সংবাদ সম্মেলনে লি জানিয়েছেন, মিয়ানমারের মানবাধিকার বিষয়ক বিশেষ দূত হিসেবে ভারতে থাকা রোহিঙ্গাদের অবস্থা সরেজমিনে দেখার জন্য তিনি ভারতে যেতে চাইলেও, ভারত তাতে সাড়া দেয়নি। বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির পরিদর্শনে আসার প্রসঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, মিয়ানমার সরকার ও সেনাবাহিনীর দ্বারা রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো নিপীড়নের ভয়াবহ সব ঘটনার কথা জেনেছেন তিনি। ওইইসব নিপীড়নের ঘটনা নিশ্চিতভাবেই রাখাইন রাজ্যে মানবাধিকারের লঙ্ঘনের প্রমাণ। তার পর্যবেক্ষণ, যদি  দোষীদের শাস্তি দেওয়ার ব্যবস্থা করা না যায়, তাহলে একই রকম নিপীড়নের পুনারাবৃত্তি ঘটবে সংখ্যালঘুদের ওপর।  লি জানিয়েছেন, মিয়ানমার সরকারের পক্ষ থেকে তাকে ২০১৭ সালের ডিসেম্বর থেকেই মিয়ানমারে যাওয়ার অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বাংলাদেশ সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেছেন, বাংলাদেশ সবসময় তার সফরকে স্বাগত জানিয়েছে।

বাংলাদেশসহ  সব পক্ষকে রোহিঙ্গাদের শরণার্থী হিসেবে আখ্যা দেওয়ার আবেদন জানিয়ে তিনি বলেছেন, ‘১৯৫১ সালের শরণার্থী সংক্রান্ত ঘোষণার ১ম ধারা মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের জন্যও প্রযোজ্য। মিয়ানমার থেকে যেসব রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন তারা তাদের নৃতাত্ত্বিক, জাতিগত ও ধর্মীয় পরিচয়ের জন্য ওই দেশটির সরকার ও সেনাবাহিনীর চলমান নির্যাতনের শিকার হয়েই বাংলাদেশে এসেছে। তিনি জানিয়েছেন, তার পর্যবেক্ষণের যেসব তথ্য সংবাদ সম্মেলনে তিনি উপস্থাপন করেছেন তা প্রাথমিক প্রতিবেদনের অংশ। আগামী অক্টোবরে জাতিসংঘের ৭৩তম সাধারণ অধিবেশনের তৃতীয় কমিটির কাছে তিনি তার পর্যবেক্ষণের বিস্তারিত তথ্য পেশ করবেন।

প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে রোহিঙ্গারা রাখাইনে থাকলেও মিয়ানমার তাদের নাগরিক বলে স্বীকার করে না। উগ্র বৌদ্ধবাদকে ব্যবহার করে সেখানকার সেনাবাহিনী ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে স্থাপন করেছে সাম্প্রদায়িক অবিশ্বাসের চিহ্ন। ছড়িয়েছে বিদ্বেষ। ৮২-তে প্রণীত নাগরিকত্ব আইনে পরিচয়হীনতার কাল শুরু হয় রোহিঙ্গাদের। এরপর কখনও মলিন হয়ে যাওয়া কোনও নিবন্ধনপত্র, কখনও নীলচে সবুজ রঙের রশিদ, কখনও ভোটার স্বীকৃতির হোয়াইট কার্ড, কখনও আবার ‘ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কার্ড’ কিংবা এনভিসি নামের রং-বেরঙের পরিচয়পত্র দেওয়া হয়েছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মানুষকে। ধাপে ধাপে মলিন হয়েছে তাদের পরিচয়। ক্রমশ তাদের রূপান্তরিত করা হয়েছে রাষ্ট্রহীন বেনাগরিকে। গত বছর ২৫ আগস্টের পর থেকে প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এলেও মিয়ানমার শুরু থেকেই তাদের বাঙালি মুসলিম আখ্যা দিয়ে নাগরিকত্ব অস্বীকার করে আসছে। তবে এবারের ঘটনায় আন্তর্জাতিক চাপ জোরালো হওয়ার এক পর্যায়ে বাংলাদেশ ও জাতিসংঘের সঙ্গে প্রত্যাবাসন চুক্তিতে বাধ্য হয় মিয়ানমার। তবে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, কথিত বৈধ কাগজপত্রের অজুহাতসহ নানা কারণে প্রক্রিয়াটি এখনও বিলম্বিত করে যাচ্ছে মিয়ানমার। একজন রোহিঙ্গাও ওই চুক্তির আওতায় রাখাইনে ফিরেছে বলে জানা যায়নি।

সংবাদ সম্মেলনে অধ্যাপক ইয়াংহি লি মন্তব্য করেছেন, ‘আমাদের শুধু রোহিঙ্গাদের রাষ্ট্রহীন নাগরিক হিসেবে দেখলেই হবে না, বরং তারা কীভাবে রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়লো তাও খুঁজে দেখা উচিত। ১৯৭০ সাল থেকেই রোহিঙ্গাদের  নাগরিকত্ব নিয়ে টালবাহানা করা হচ্ছে। আর ১৯৮২ সালে নাগরিকত্ব আইন পাসের পর থেকে তারা একেবারেই নাগরিকত্ব বঞ্চিত হয়ে উঠেছে।  মিয়ানমার সরকার তাদের অন্যায়ভাবে নাগরিকত্ব বঞ্চিত করেছে তখন এবং এখনও সেই বঞ্চনা চালিয়ে যাছে।’ ইয়াংহি লি মনে করেন, মিয়ানমার যে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দেওয়ার বিষয়ে ‘পাথওয়ে টু সিটিজেনশিপের’ কথা বলে আসছে তাতে বিভ্রান্ত নাহয়ে দেশটির কাছে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব বহাল করার জোর দাবি জানাতে হবে। লির ভাষ্য, মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের জন্য ‘পাথওয়ে টু সিটিজেনশিপ’ নিশ্চিতের ওয়াদা করলেও বছরের পর বছর ধরে তারা আসলে রোহিঙ্গাদের সেখান থেকে দূরেই ঠেলে রেখেছে।